|

Advertisement
×

আসছে কৃষি বীমা নীতিমালা, খসড়া প্রণয়নে কমিটি

মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬   প্রিন্ট   ৪৫৬ বার পঠিত

আসছে কৃষি বীমা নীতিমালা, খসড়া প্রণয়নে কমিটি

প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষকের ক্ষতি কমানো এবং দেশের কৃষি উৎপাদনে স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে কৃষি বীমা (শস্য বীমা) নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণে কৃষি বীমা চালু ও সম্প্রসারণে খসড়া নীতিমালা প্রণয়নের জন্য ইতিমধ্যে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটিও গঠন করেছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি)।

কমিটিতে কৃষি অর্থনীতি, গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান, পল্লী উন্নয়ন এবং বীমা খাতের বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

কমিটির সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থসংস্থান ও ব্যাংকিং বিভাগের অধ্যাপক এএসএম গোলাম হাফিজ, গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এম. ওয়াকিলুর রহমান, বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমির মহাপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. মো. আব্দুল মজিদ প্রামানিক, সাসটেইনেবল এগ্রিকালচার ফাউন্ডেশন (এসএএফ) বাংলাদেশের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ফরহাদ জামিল ও গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও মুখ্য নির্বাহী ফারজানাহ চৌধুরী।

গত ১২ মে বিএআরসি’র নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুছ ছালাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ কমিটি গঠনের কথা জানানো হয়েছে। এই কমিটি শস্য বীমা নীতিমালার খসড়া প্রণয়ন করবে, যা ভবিষ্যতে কৃষি খাতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো হিসেবে কাজ করবে।

বিএআরসি সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত নীতিমালাটি চূড়ান্ত হলে তা সরকারের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে এবং পরবর্তীতে জাতীয় পর্যায়ে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

কৃষকদের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ফসলহানির আর্থিক ক্ষতি থেকে সুরক্ষার জন্য ‘শস্য বীমা’ বা ‘কৃষি বীমা’ নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নীতিমালায় আকস্মিক বন্যা, খরা, শিলাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট ক্ষতি মোকাবিলার ওপর জোর দেওয়া হবে। প্রচলিত বীমার মতো মাঠ পর্যায়ে গিয়ে ক্ষতির পরিমাণ পরিমাপ না করে, আবহাওয়া সূচকের (যেমন- বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা) ওপর ভিত্তি করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের ব্যবস্থা থাকবে কৃষি বীমায়।

থাকবে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের প্রিমিয়াম পরিশোধ সহজতর করতে ভর্তুকি ও বিশেষ প্রণোদনার রূপরেখা।

এর আগে গত মার্চে কুমিল্লায় এক অনুষ্ঠানে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতির ঝুঁকি থেকে কৃষকদের সুরক্ষা দিতে দেশে ফসল বীমা (ইন্স্যুরেন্স) চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান খাদ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশীদ।

তিনি জানান, বন্যা বা অন্য কোনো দুর্যোগে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হলে বীমার আওতায় কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে, যাতে তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন।
মন্ত্রী বলেন, কৃষি দেশের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি এবং বিপুল জনগোষ্ঠী সরাসরি এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। তাই কৃষকের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। তিনি জানান, ফসল বীমা চালু হলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি অনেকাংশে কমে আসবে এবং কৃষকরা উৎপাদনে আরও উৎসাহিত হবেন।
সূত্র বলছে, দেশে প্রায় দেড় কোটি পরিবার কোনো না কোনোভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। সাধারণ বীমা করপোরেশন ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশে প্রথম শস্য বীমার প্রচলন করে। ২০১৪-১৮ সাল পর্যন্ত এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সহায়তায় সাধারণ বীমা করপোরেশন তিনটি জেলায় বন্যা, খরা ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি মোকাবিলায় বীমা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের প্রায় অর্ধেক জনগণ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে জড়িত। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, শিলাবৃষ্টি ও পোকামাকড়ের আক্রমণের কারণে কৃষকরা প্রতিনিয়ত ফসল উৎপাদনে ঝুঁকির মুখে পড়েন। এই ঝুঁকি শুধু কৃষকের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, তা সরাসরি দেশের খাদ্যনিরাপত্তাকেও হুমকির মধ্যে ফেলে। বহুবার দেখা গেছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর কৃষকরা তাদের মৌসুমি ফসল হারান এবং অনেক সময় ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। জীবিকা অনিশ্চিত হওয়ায় নতুন ফসল রোপণ ও কৃষি প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের আগ্রহও কমে যায়। এই পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে আর্থিক সুরক্ষা দিতে এবং খাদ্য উৎপাদন টিকিয়ে রাখতে শস্যবীমা (ক্রপ ইন্স্যুরেন্স) হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কৃষিঝুঁকি মোকাবিলায় এটি কার্যকরভাবে চালু রয়েছে এবং কৃষক, অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। যুক্তরাষ্ট্রে মার্কিন কৃষি বিভাগ-এর অধীনে ‘ফেডারেল ক্রপ ইন্স্যুরেন্স প্রোগ্রাম’ পরিচালিত হয়, যা সরকারি ভর্তুকি এবং বেসরকারি কো¤পানির মাধ্যমে কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়। এই ব্যবস্থায় কৃষকরা খরা, অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, ঝড় বা বাজারমূল্য পতনের জন্য ক্ষতিপূরণ পান, ফলে তাদের আয় অনেকটা স্থিতিশীল থাকে এবং বিনিয়োগ ও চাষাবাদে ঝুঁকি নিতে তারা সাহসী হন। চীনের সরকারও কৃষকদের শস্যবীমার জন্য উল্লেখযোগ্য ভর্তুকি প্রদান করে, বিশেষ করে ধান, গম, ভুট্টা ইত্যাদির ক্ষেত্রে বীমা অত্যন্ত জনপ্রিয়। জাপানে ‘ন্যাশনাল অ্যাগ্রিকালচার ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের’ অধীনে বাধ্যতামূলক শস্যবীমা ব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ হওয়ায় কৃষকরা নিয়মিত ক্ষতিপূরণ পান। কানাডায় প্রোডাকশন ইন্স্যুরেন্স প্রোগ্রাম সরকার ও প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে পরিচালনা করে, যা শস্য উৎপাদনের ঝুঁকি কমায় এবং কৃষক সহজে ব্যাংক ঋণ পেতে পারেন। ভারতে জাতীয় শস্যবীমা কর্মসূচি সারাদেশে কার্যকরভাবে চলছে। এ ছাড়া আফ্রিকার কিছু দেশে যেমন কেনিয়া, ইথিওপিয়া, ঘানা ইত্যাদিতে আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন বিশ্বব্যাংক, আইএফএডি, এফএও এবং বিভিন্ন এনজিওর সহায়তায় আবহাওয়াভিত্তিক শস্যবীমা চালু হয়েছে, যা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের জন্য বিশেষভাবে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

 

Facebook Comments Box

Posted ০২:৪৮ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com