নিজস্ব প্রতিবেদক
বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬ প্রিন্ট ৩০ বার পঠিত
দেশের উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর পাশাপাশি রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে তফসিলি ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য থেকে ৪১ হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন অর্থায়ন প্যাকেজ গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ তহবিলের অর্থ বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত, সিএমএসএমই, কৃষি ও পল্লী অর্থনীতি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং উত্তরবঙ্গে কৃষিভিত্তিক বিশেষ অর্থনৈতিক কেন্দ্র গঠনে ব্যবহার করা হবে।
এই অর্থায়ন প্যাকেজ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রাথমিকভাবে সাতটি ব্যাংকের সঙ্গে অংশগ্রহণ চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদ ও মো. সরোয়ার হোসেন, নির্বাহী পরিচালক মো. এনামুল করিম খান, সংশ্লিষ্ট বিভাগের পরিচালক ও কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রাথমিক পর্যায়ে চুক্তিতে অংশ নেওয়া সাতটি ব্যাংক হলো—সোনালী ব্যাংক পিএলসি, ব্যাংক এশিয়া পিএলসি, ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি, সিটি ব্যাংক পিএলসি, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক পিএলসি, পূবালী ব্যাংক পিএলসি ও ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে সুপারভাইজরি ডেটা ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড অ্যানালিটিক্স বিভাগের পরিচালক মো. আবদুল মান্নান এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়িয়ে অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতে তারল্য ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং উৎপাদনশীল খাতে অর্থের প্রবাহ বাড়ানোর ধারাবাহিক উদ্যোগের অংশ হিসেবেই এই সমন্বিত অর্থায়ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার সমন্বিত অর্থায়ন উদ্যোগের মধ্যে তফসিলি ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্য থেকে ৪১ হাজার কোটি টাকা পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রবাহিত করা হবে। এর মাধ্যমে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পড়ে থাকা উদ্বৃত্ত অর্থকে উৎপাদনশীল ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হবে।
এই ৪১ হাজার কোটি টাকার মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ, ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত সহায়ক প্রাক-অর্থায়ন স্কিমে। বন্ধ হয়ে যাওয়া বা কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হওয়া শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় উৎপাদনে ফেরাতে এ অর্থায়ন ব্যবহার করা হবে। এর মাধ্যমে বিদ্যমান উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগানোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট খাতে কর্মসংস্থান ধরে রাখা ও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
সিএমএসএমই খাতের জন্য রাখা হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি মূলধনের সংকটে থাকা ক্ষুদ্র, কুটির, অতিক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড সচল রাখা এবং সম্প্রসারণে এ অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে উৎপাদন ও ব্যবসা পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় চলতি মূলধনের জোগান বাড়লে ছোট উদ্যোক্তাদের কার্যক্রমে গতি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রপ্তানি খাতের বহুমুখীকরণে বরাদ্দ করা হয়েছে ৩ হাজার কোটি টাকা। দেশের রপ্তানি আয় দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর বেশি নির্ভরশীল। নতুন এই পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের মাধ্যমে প্রচলিত রপ্তানি পণ্যের বাইরে সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে উৎসাহিত করা এবং নতুন বাজার ও পণ্য তৈরির সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
কৃষি ও পল্লী খাতের জন্য রাখা হয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকায় আয় ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এ অর্থ ব্যবহার করা হবে। কৃষি উৎপাদন, পল্লী অর্থনীতির বিভিন্ন কর্মকাণ্ড এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আয় উৎসারী কার্যক্রমে অর্থায়নের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া দেশের উত্তরাঞ্চলে কৃষিভিত্তিক বিশেষ অর্থনৈতিক কেন্দ্র বা কৃষি হাব গড়ে তুলতে আরও ৩ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিম রাখা হয়েছে। উত্তরবঙ্গের কৃষি উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়নে এ অর্থায়ন ব্যবহার করা হলে অঞ্চলটির কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য শুধু ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত অর্থ ব্যবহার করা নয়; বরং সেই অর্থকে সরাসরি উৎপাদনশীল ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতে প্রবাহিত করা। প্রাক-অর্থায়ন ও পুনঃঅর্থায়নের মাধ্যমে তুলনামূলক সাশ্রয়ী অর্থায়ন নিশ্চিত করে উদ্যোক্তা ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অর্থায়ন ব্যয়ের চাপ কমানোও এর অন্যতম লক্ষ্য।
বর্তমানে অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, কার্যকর মূলধনের সংকট এবং বিভিন্ন খাতে চাহিদার দুর্বলতার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারছে না। এ অবস্থায় উদ্বৃত্ত তারল্যকে নির্দিষ্ট খাতে পরিচালিত করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি তৈরির চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বিশেষ করে বন্ধ শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থায়নের আওতায় আনার উদ্যোগটি অর্থনীতিতে দ্রুত প্রভাব ফেলতে পারে। নতুন করে বড় বিনিয়োগ না করেও বিদ্যমান কারখানা ও প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় চালু করা গেলে উৎপাদন বাড়বে, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ফিরে আসবে এবং সরবরাহব্যবস্থায় অর্থের প্রবাহ বাড়বে।
অন্যদিকে সিএমএসএমই খাতে অর্থায়ন বাড়লে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবসা ও উৎপাদন কার্যক্রম সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে। এই খাতের উদ্যোক্তারা দেশের অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও ব্যাংকঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েন। নতুন তহবিল সেই ঘাটতি কিছুটা পূরণ করতে পারে।
কৃষি ও পল্লী খাতে ১০ হাজার কোটি টাকা এবং উত্তরবঙ্গে কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক কেন্দ্রের জন্য ৩ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিপণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণে বিনিয়োগ বাড়লে কৃষক ও উদ্যোক্তা উভয়ের জন্য নতুন আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অনুষ্ঠানে ডেপুটি গভর্নর ড. মো. কবির আহাম্মদ এই তহবিলের গুরুত্ব ও এর বহুমুখী ভূমিকা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোর উদ্বৃত্ত তারল্যকে উৎপাদনশীল ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতে প্রবাহিত করার মাধ্যমে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোকে সহায়তা করাই এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য। তুলনামূলক সাশ্রয়ী অর্থায়নের মাধ্যমে উদ্যোক্তা ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে গতি আনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আশা করছে, চুক্তিতে অংশ নেওয়া ব্যাংকগুলো এই অর্থায়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তবে তহবিলের প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে নির্ধারিত খাতে দ্রুত ও যথাযথভাবে অর্থ পৌঁছানো এবং ঋণের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর।
Posted ০৭:৩৮ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com