নিজস্ব প্রতিবেদক
শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬ প্রিন্ট ৬০ বার পঠিত
বাংলাদেশের অর্থনীতি গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেও বীমা খাত সেই গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারেনি। দেশে বর্তমানে লাইফ ও নন লাইফ মিলিয়ে ৮২টি বীমা কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করলেও মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) বীমা খাতের অবদান এবং বীমা সেবার বিস্তার এখনো দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। ফলে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত হিসেবে বীমা শিল্প তার পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারছে না।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৩৬টি জীবন বীমা এবং ৪৬টি সাধারণ বীমা খাতের কোম্পানি রয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে বীমা খাত অন্যতম বড় খাত, যেখানে ৫০টির বেশি কোম্পানি তালিকাভুক্ত। কিন্তু বাজারমূলধন ও লেনদেনে এ খাতের অবদান তুলনামূলকভাবে সীমিত।
২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে দেশের জীবন বীমা খাতের কোম্পানিগুলোর মোট গ্রস প্রিমিয়াম দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৯১৫ দশমিক ৬০ কোটি টাকা। একই সময়ে লাইফ ফান্ড বেড়ে ৩৮ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অন্যদিকে সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলোর মোট গ্রস প্রিমিয়াম ছিল ১ হাজার ৪৮৫ দশমিক ৮০ কোটি টাকা। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, একই সময়ে মোট ৩ হাজার ৭৯৭ দশমিক ৯১ কোটি টাকার দাবির বিপরীতে পরিশোধ করা হয়েছে মাত্র ৪২৯ দশমিক ২০ কোটি টাকা, অর্থাৎ দাবি নিষ্পত্তির হার ছিল ১১.৩ শতাংশ। এই চিত্র গ্রাহকের আস্থা পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনীয়তাকেই সামনে নিয়ে আসে।
আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানও বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কোঅপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট -ওইসিডি এর গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স মার্কেট ট্রেন্ড-২০২৫ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সদস্য দেশগুলোতে গড় বীমা প্রবেশহার ছিল ৬.২ শতাংশ। অন্যদিকে অ্যালিয়ান্জ গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স রিপোর্ট ২০২৫ বলছে, ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী বীমা শিল্পের মোট প্রিমিয়াম প্রায় ৭ ট্রিলিয়ন ইউরো অতিক্রম করেছে এবং বৈশ্বিক বীমা বাজার ধারাবাহিকভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে। এই প্রবৃদ্ধির পেছনে ডিজিটাল প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যবীমার চাহিদা বৃদ্ধি, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা এবং দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়ভিত্তিক বীমা পণ্যের বিস্তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের বীমা শিল্প দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বেসরকারি ও সরকারি উভয় খাতের বিনিয়োগ, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্কারের ফলে দেশটির বীমা বাজার বিশ্বে দ্রুত বর্ধনশীল বাজারগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সময়ে বাংলাদেশেও ডিজিটাল বীমা, মাইক্রোইনস্যুরেন্স, কৃষিবীমা ও স্বাস্থ্যবীমার সম্ভাবনা বাড়ছে, তবে এর জন্য নীতিগত ধারাবাহিকতা ও কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশের বীমা শিল্প অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সাথে ক্রমান্বয়ে বিকশিত হয়েছে, কিন্তু এর পরিধি সীমিতই রয়ে গেছে। প্রতিবেশী দেশ এবং অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় এর অনুপ্রবেশের হার ০.৪ থেকে ০.৫ শতাংশ যা অত্যন্ত কম। উদাহরণস্বরূপ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় এই হার ১% ছাড়িয়ে গেছে, যেখানে ভারতের বীমা অনুপ্রবেশের হার ৩.৮–৪.২%। পাকিস্তানে এই হার প্রায় ০.৯–১.১%, যা মূলত নন-লাইফ বীমা-নির্ভর, অন্যদিকে মালদ্বীপে পর্যটন-সম্পর্কিত চাহিদার কারণে এই হার ২–২.৫%। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতিগুলোতে এই অনুপ্রবেশের হার বেশি: থাইল্যান্ডে ৫–৫.৫%, মালয়েশিয়ায় ৪.৫–৪.৮%, ইন্দোনেশিয়ায় ২.৮–৩.১%, ভিয়েতনামে ৩–৩.৪% এবং ফিলিপাইনে ১.৮–২.২%। সিঙ্গাপুর, একটি সম্পূর্ণ পরিণত বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে, এই হার ১০.৫–১১.৫%-এ পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের বীমা খাতের সামনে এখন তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে-গ্রাহকের আস্থা পুনর্গঠন, দাবি নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণ। একই সঙ্গে করপোরেট গভর্ন্যান্স শক্তিশালী করা, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি চালু করা, বীমা সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে পারলে খাতটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
Posted ০৮:৪১ অপরাহ্ণ | শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com