অনলাইন ডেস্ক
বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬ প্রিন্ট ৬১ বার পঠিত
সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীদের জন্য আয়কর ব্যবস্থায় এসেছে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। এখন থেকে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে কেটে রাখা উৎসে কর আর চূড়ান্ত কর হিসেবে গণ্য হবে না। এটি বিবেচিত হবে অগ্রিম আয়কর হিসেবে। ফলে বছর শেষে প্রকৃত করের চেয়ে বেশি টাকা কেটে রাখা হলে সেই অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে যাঁদের আয় বেশি এবং যাঁরা উচ্চতর করহারের আওতায় পড়েন, তাঁদের বাড়তি করও পরিশোধ করতে হতে পারে।
নতুন এই নিয়মে একদিকে সীমিত আয়ের বিনিয়োগকারীরা স্বস্তি পেতে পারেন, অন্যদিকে মধ্যবিত্ত ও উচ্চ আয়ের কিছু বিনিয়োগকারীর করের দায় বাড়তে পারে। অর্থাৎ সঞ্চয়পত্রের মুনাফায় সবার জন্য একই ধরনের প্রভাব পড়বে না; ব্যক্তির মোট আয় ও প্রযোজ্য করহারের ওপর নির্ভর করবে চূড়ান্ত হিসাব।
এত দিন সঞ্চয়পত্রের মুনাফা দেওয়ার সময় নির্ধারিত হারে উৎসে কর কেটে রাখা হতো। সাধারণভাবে টিআইএনধারীদের ক্ষেত্রে মুনাফার ১০ শতাংশ এবং টিআইএন না থাকলে ১৫ শতাংশ কর কাটা হতো। এই অর্থকেই চূড়ান্ত কর হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ফলে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর আলাদা করে আর কোনো কর দিতে হতো না। একইভাবে বেশি কর কেটে রাখা হলেও তা ফেরত পাওয়ার সুযোগ ছিল না।
নতুন নিয়মে সেই ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। এখন সঞ্চয়পত্র থেকে পাওয়া মুনাফা করদাতার অন্যান্য আয়ের সঙ্গে যুক্ত হবে। এরপর তাঁর মোট আয়, প্রযোজ্য করমুক্ত সীমা এবং আয়কর স্ল্যাব অনুযায়ী বার্ষিক কর নির্ধারণ করা হবে।
সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে আগে যে উৎসে কর কেটে রাখা হয়েছে, তা বার্ষিক করের বিপরীতে অগ্রিম পরিশোধ হিসেবে সমন্বয় করা হবে। অর্থাৎ বছর শেষে প্রকৃত করের হিসাবই হবে চূড়ান্ত।
নতুন নিয়মে তুলনামূলক কম আয়ের সঞ্চয়পত্র বিনিয়োগকারীদের লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বিশেষ করে যাঁদের মোট করযোগ্য আয় কম এবং যাঁদের প্রকৃত করের হার ১০ শতাংশের নিচে, তাঁরা আগে কেটে রাখা অতিরিক্ত অর্থ ফেরত চাইতে পারবেন।
ধরা যাক, একজন ব্যক্তি সঞ্চয়পত্র থেকে বছরে এক লাখ টাকা মুনাফা পেয়েছেন। এ জন্য তাঁর কাছ থেকে ১০ শতাংশ হারে ১০ হাজার টাকা উৎসে কর কেটে রাখা হয়েছে। অন্যদিকে বেতন বা অন্যান্য উৎস থেকে তাঁর আয় হয়েছে সাড়ে তিন লাখ টাকা। সব মিলিয়ে তাঁর মোট আয় দাঁড়িয়েছে সাড়ে চার লাখ টাকা।
ধরা যাক, প্রযোজ্য করমুক্ত সীমা চার লাখ টাকা এবং পরবর্তী ৫০ হাজার টাকার ওপর করহার ১০ শতাংশ। সে হিসাবে তাঁর বার্ষিক করের পরিমাণ হবে পাঁচ হাজার টাকা।
কিন্তু সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে আগেই কেটে রাখা হয়েছে ১০ হাজার টাকা। ফলে প্রকৃত করের চেয়ে পাঁচ হাজার টাকা বেশি পরিশোধ করা হয়েছে। নতুন নিয়মে আয়কর রিটার্ন জমা দিয়ে তিনি এই অতিরিক্ত পাঁচ হাজার টাকা ফেরত দাবি করতে পারবেন।
এ কারণেই সীমিত আয়ের ব্যক্তি, অবসরপ্রাপ্ত মানুষ এবং সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর নির্ভরশীল অনেক ছোট বিনিয়োগকারীর জন্য নতুন নিয়মটি স্বস্তির কারণ হতে পারে।
নতুন ব্যবস্থায় বেশি আয়ের বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। আগে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে ১০ শতাংশ কর কেটে নেওয়ার পর সেই করদায় শেষ হয়ে যেত। কিন্তু এখন মুনাফাসহ মোট আয় হিসাব করে প্রযোজ্য করহার নির্ধারণ করা হবে।
ফলে কোনো ব্যক্তির আয় ১৫, ২০, ২৫ বা ৩০ শতাংশের করস্ল্যাবে পড়লে সংশ্লিষ্ট আয় অনুযায়ী তাঁকে কর দিতে হবে। আগে কেটে রাখা ১০ শতাংশ উৎসে কর শুধু অগ্রিম কর হিসেবে সমন্বয় হবে। অতিরিক্ত করের পরিমাণ থাকলে তা পরিশোধ করতে হবে।
একটি উদাহরণ বিষয়টি পরিষ্কার করবে।
ধরা যাক, একজন বিনিয়োগকারী বছরে সঞ্চয়পত্র থেকে পাঁচ লাখ টাকা মুনাফা পেয়েছেন। এই মুনাফার বিপরীতে ১০ শতাংশ হারে ৫০ হাজার টাকা উৎসে কর কেটে রাখা হয়েছে। এর বাইরে বেতন ও অন্যান্য উৎস থেকে তাঁর আয় চার লাখ টাকা।
সব মিলিয়ে তাঁর মোট আয় দাঁড়াল নয় লাখ টাকা।
উদাহরণে দেওয়া করসীমা অনুযায়ী, প্রথম চার লাখ টাকা করমুক্ত। পরবর্তী তিন লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ হারে কর হবে ৩০ হাজার টাকা। আর পরের দুই লাখ টাকার ওপর ১৫ শতাংশ হারে কর হবে আরও ৩০ হাজার টাকা।
অর্থাৎ তাঁর মোট বার্ষিক করের পরিমাণ দাঁড়াবে ৬০ হাজার টাকা। অথচ সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে আগেই পরিশোধ করেছেন ৫০ হাজার টাকা।
ফলে রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় তাঁকে আরও ১০ হাজার টাকা কর দিতে হবে।
আগের নিয়মে যেখানে ৫০ হাজার টাকা কর পরিশোধ করেই দায় শেষ হতো, নতুন নিয়মে সেখানে তাঁকে অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে।
নতুন নিয়মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে কেটে রাখা অগ্রিম কর বেশি হলে তা ফেরত পাওয়ার সুযোগ।
ধরা যাক, একজন বিনিয়োগকারীর সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে সারা বছরে ৩০ হাজার টাকা উৎসে কর কাটা হয়েছে। কিন্তু বছর শেষে বিভিন্ন করছাড় ও প্রযোজ্য হিসাব সমন্বয়ের পর তাঁর প্রকৃত করের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার টাকা।
সে ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা তিনি ফেরত দাবি করতে পারবেন।
তবে এই অর্থ ফেরত পেতে হলে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ শুধু সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে কর কেটে নেওয়া হয়েছে বলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে টাকা ফেরত পাওয়া যাবে না। করদাতাকে নিয়ম মেনে রিটার্ন দাখিল করে অতিরিক্ত অর্থ ফেরতের আবেদন করতে হবে।
অগ্রিম কর ফেরত পাওয়ার জন্য করদাতাকে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে।
এরপর কর বিভাগ প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করে প্রাপ্য অর্থ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করবে। সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী, এ ক্ষেত্রে ১২০ দিনের মধ্যে ব্যাংক হিসাবে টাকা ফেরতের কথা বলা হয়েছে।
সঞ্চয়পত্রের মুনাফায় উৎসে করকে অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করার ফলে কর ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। এর ফলে যাঁদের প্রকৃত করের পরিমাণ আগে কেটে রাখা অর্থের চেয়ে কম, তাঁরা অতিরিক্ত টাকা ফেরত পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
অন্যদিকে যাঁদের মোট আয় বেশি এবং যাঁদের প্রযোজ্য করহার ১০ শতাংশের ওপরে, তাঁদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত করের দায় তৈরি হতে পারে।
তাই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুধু মুনাফার ওপর কত শতাংশ উৎসে কর কাটা হয়েছে, তা দেখা নয়; বরং সারা বছরের মোট আয়, করমুক্ত সীমা, প্রযোজ্য করহার এবং করছাড় বিবেচনায় নিয়ে নিজের প্রকৃত করের হিসাব করা।
কারণ নতুন নিয়মে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর কেটে রাখা কর আর শেষ হিসাব নয়, বরং সেটিই হবে বছর শেষে কর সমন্বয়ের প্রথম ধাপ।
Posted ১০:২৬ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | Animator Alif
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com
✎ মন্তব্য করুন