নিজস্ব প্রতিবেদক
শনিবার, ০১ আগস্ট ২০২৬ প্রিন্ট ২৮ বার পঠিত
বাংলাদেশে মা ও শিশুর জন্য স্বাস্থ্যবীমা এখনও কার্যত অনুপস্থিত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) অনুযায়ী, দেশে মাত্র ১.৬ শতাংশ মা ও শিশু বীমার আওতায় থাকলেও ৯৮ দশমিক ৪ শতাংশই এর বাইরে রয়ে গেছে । যারা কোনো ধরনের স্বাস্থ্যবীমার আওতায় নেই। অন্যদিকে, এশিয়ার স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন-দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগ, দ্রুত বার্ধক্যের দিকে অগ্রসর জনসংখ্যা এবং লাগামহীন চিকিৎসা ব্যয় মোকাবিলায় এখনই প্রতিরোধভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা ও উদ্ভাবনী স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থা গড়ে না তুললে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের মাত্র ০.৮ শতাংশ স্বাস্থ্যবীমার আওতায় রয়েছেন। ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে এ হার ০.৪ শতাংশ এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। অর্থাৎ মা ও শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় বীমা এখনো ব্যতিক্রম, নিয়ম নয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সার্বজনীন স্বাস্থ্যসুরক্ষার অন্যতম ভিত্তি হলো কার্যকর স্বাস্থ্যবীমা। কিন্তু বাংলাদেশে মাতৃ ও শিশুর স্বাস্থ্যবীমা বাজার এখনো বিকশিত হয়নি। বেসরকারি বাণিজ্যিক বীমা কোম্পানিগুলো সাধারণত গর্ভবতী নারী, নবজাতক কিংবা শিশুদের স্বাস্থ্যবীমা দিতে আগ্রহী নয়। কারণ সিজারিয়ান অপারেশন, আইসিইউ ও এনআইসিইউ সেবার মতো উচ্চ ব্যয়ের চিকিৎসা তাদের জন্য বড় আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করে। ফলে এসব বীমার প্রিমিয়ামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থেকে যায়।
এদিকে, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে চিকিৎসা ব্যয়ের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করতে হয় বাংলাদেশের পরিবারগুলোকে। বর্তমানে দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৯.৩ শতাংশ রোগীদের নিজেদের পকেট থেকে পরিশোধ করতে হয়। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) মনে করে, এ হার ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশের মধ্যে থাকা উচিত।
স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের মতে, স্বাস্থ্যবীমার সীমিত বিস্তারের কারণে একটি পরিবারের একজন সদস্য গুরুতর অসুস্থ হলে পুরো পরিবারই আর্থিক সংকটে পড়ে। বিশেষ করে মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুচিকিৎসার ব্যয় অনেক ক্ষেত্রে মধ্যবিত্ত পরিবারকেও দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে ঠেলে দেয়।
এশিয়ার জন্য একই সতর্কবার্তা
সম্প্রতি ‘সিকিউরিং হেলথ থ্রু ইনোভেশন’ প্রতিপাদ্যে অনুষ্ঠিত তৃতীয় এলায়েঞ্জ এশিয়া হেলথ সামিটেও একই ধরনের উদ্বেগ উঠে এসেছে। সম্মেলনে বীমা খাত, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, নীতিনির্ধারক ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা বলেন, স্বাস্থ্যসেবার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে এককভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়; সমন্বিত উদ্যোগই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
এলায়েঞ্জ এশিয়ার আঞ্চলিক প্রধান নির্বাহী অনুশা থাভারাজাহ বলেন, এশিয়াজুড়ে স্থূলতা, ক্যানসার, হৃদরোগ, ডায়াবেটিসসহ অসংক্রামক রোগ দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে জনসংখ্যার বার্ধক্য স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে। অথচ এখনো অধিকাংশ বিনিয়োগ রোগ হওয়ার পর চিকিৎসায় ব্যয় হচ্ছে, রোগ প্রতিরোধে নয়।
তার ভাষায়, মানুষের শুধু দীর্ঘায়ু নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; সুস্থ ও কর্মক্ষম জীবনকাল বাড়ানোর দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। এজন্য বীমা কোম্পানি, হাসপাতাল, সরকার, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
প্রযুক্তিই হতে পারে বড় পরিবর্তনের চালিকাশক্তি
সম্মেলনে আলোচকরা মনে করেন, আগামী পাঁচ বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), পরিধানযোগ্য স্বাস্থ্য-প্রযুক্তি এবং বিপাকীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা স্বাস্থ্যবীমা শিল্পে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। তবে প্রযুক্তির চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ধীরগতি এবং বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই-নির্ভর স্বাস্থ্য বিশ্লেষণ, প্রাথমিক রোগ শনাক্তকরণ, অনলাইন চিকিৎসা পরামর্শ, হাসপাতাল নির্বাচন, অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুকিং এবং ওষুধ সংগ্রহের মতো সেবা ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করতে পারে।
স্থূলতা ও দীর্ঘমেয়াদি রোগকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান
সম্মেলনে আরও বলা হয়, স্থূলতাকে আর শুধু জীবনযাত্রাজনিত সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ। কারণ স্থূলতার সঙ্গে হৃদরোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ ও লিভারের জটিলতাসহ ২০০টিরও বেশি রোগের সম্পর্ক রয়েছে। তাই প্রতিরোধ, আগাম শনাক্তকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনাকে স্বাস্থ্যবীমার অংশ করার সুপারিশ করা হয়।
বাজেট বেড়েছে, তবে চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে
২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা জিডিপির ১.০১ শতাংশ এবং জাতীয় বাজেটের ৭.৪ শতাংশ। গত এক দশকে এটি সর্বোচ্চ স্বাস্থ্য বাজেট। এ বরাদ্দে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, টিকাদান, পুষ্টি এবং অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না। ব্যক্তিগত চিকিৎসা ব্যয় কমানো, স্বাস্থ্যবীমার পরিধি সম্প্রসারণ, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে প্রতিরোধভিত্তিক স্বাস্থ্যসুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। বাংলাদেশে মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যবীমা সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবা চালুর মাধ্যমে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসুরক্ষার লক্ষ্য অর্জনের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও তারা মনে করছেন।
Posted ০৮:৫৪ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০১ আগস্ট ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com