নিজস্ব প্রতিবেদক
শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রিন্ট ১১০ বার পঠিত
অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয়, প্রিমিয়াম আয়ে ধ্বস ও ব্যাপক অনিয়ম এর কারণে ডুবছে সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স। মালিকানা পরিবর্তন হলেও গ্রাহকদের বীমা দাবীর টাকা পরিশোধ করছে না কোম্পানিটি। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কতৃপক্ষের অফিসের সামনে মানব বন্ধন করছে ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা। প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
২০২৪-২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন তুলনামূলক চিত্র ২০২৫ সাল গ্রাহক তথ্য বিশ্লেষণ

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বরাবরে দাখিলকৃত ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে সকল সূচকেই নেতিবাচক চিত্র ফুঁটে উঠেছে সান লাইফের। কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সিএফও স্বাক্ষরিত ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখ পর্যন্ত দাখিলকৃত বার্ষিক প্রতিবেদনে গত বছরের তুলনায় প্রিমিয়াম আয় হ্রাস পেয়েছে ২১.৩৪ শতাংশ। কোম্পানিটি নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয় করেছে ১৭৬.৪৯ শতাংশ। আর লাইফ ফান্ড কমেছে ৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। নির্ধারিত সীমার চেয়ে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয় ও লাইফ ফান্ড কমে যাওয়ায় উচ্চমাত্রার ঝুঁকিতে আছে বীমা গ্রাহকদের কষ্টার্জিত আমানত। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষে দাখিলকৃত প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোম্পানিটি ২০২৫ সালে পলিসি হোল্ডারদের কাছ থেকে ১ম বর্ষ প্রিমিয়াম সংগ্রহ করে ১০ কোটি ৪১ লাখ টাকা এবং নবায়ন প্রিমিয়াম সংগ্রহ করে ৮ কোটি ৩১ লাখ টাকা। মোট প্রিমিয়াম অর্জিত হয় ১৮ কোটি ৭২ লাখ টাকা। ২০২৪ সালে কোম্পানিটির মোট অর্জিত প্রিমিয়াম ছিল ২৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রিমিয়াম আয় হ্রাস পেয়েছে ২১.৩৪ শতাংশ, যা একটি বীমা কোম্পানির জন্য যথেষ্ট উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালে কোম্পানিটি ব্যবস্থাপনা ব্যায়ের অনুমোদিত সীমার ১৭৬.৪৯ শতাংশ বেশি ব্যয় করেছে। আগের বছর ২০২৪ সালে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের হার ছিল ১৩৩.৭৬ শতাংশ। যা বীমা আইন ২০১০ এর ৬২ এর সুস্পষ্ট লংঘন এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
২০২৫ সালের বছর শেষে লাইফ ফান্ডে আছে ৪৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা। আগের বছর লাইফ ফান্ডে ছিল ৫৬ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। এক বছরে লাইফ ফান্ড কমেছে ৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। কিন্তু গ্রাহকদের দাবী পরিশোধের হার খুবই নগণ্য। সানলাইফ মাত্র ৬টি মৃত্যুদাবী পরিশোধ করেছে ২০২৫ সালে। লাইফ ফান্ড হলো এমন একটি ফান্ড যেখানে জীবন বীমা কোম্পানিগুলো অর্থ জমা রাখে ও বিনিয়োগ করে। কোনো বীমা গ্রাহকের মৃত্যু হলে বা অন্য কোনো বীমা দাবী এই ফান্ড থেকে প্রদান করা হয়। জীবন বীমা কোম্পানির লাইফ ফান্ড দূর্বল হলে ওই কোম্পানির পক্ষে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে বীমা গ্রাহকদের অর্থ ফেরত পাওয়া মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সানলাইফ এর ২০২৫ সালে মোট বিনিয়োগ ৩৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা। আগের বছর ২০২৪ সালে যা ছিল ৩৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ বিনিয়োগ এর পরিমাণও কমে গেছে। ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সার্বিকভাবে কোম্পানিটির বীমা দাবী পরিশোধের সক্ষমতা চরম ঝুকিপূর্ণ এবং এর আর্থিক অবস্থা তলানিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
এদিকে মেয়াদোত্তীর্ণ বীমার টাকা না পাওয়া, ব্যাংকে চেক বাউন্স হওয়া এবং গ্রাহকের অনুমতি ছাড়া পাওনা অর্থ থেকে ৩০-৫০% এফডিআর বাবদ কেটে নেওয়ার অভিযোগে সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন গ্রাহক ও মাঠকর্মীরা। কোটি কোটি টাকা বকেয়া দ্রুত পরিশোধের দাবিতে বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কার্যালয়ের সামনে শতাধিক ভুক্তভোগী গ্রাহক মানববন্ধন করেন এবং আইডিআরএ চেয়ারম্যানের কাছে স্মারকলিপি দেন। স্মারকলিপিতে তাঁরা জানান, অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো দাবি মেটালেও সানলাইফ সাধারণ গ্রাহকদের বকেয়া দিচ্ছে না। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ২৪৩ জনের দাবি মেটানো হলেও তা মামলা বা বিশেষ সুপারিশের ভিত্তিতে করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। বর্তমানে প্রায় ৬ কোটি টাকার মেয়াদোত্তীর্ণ চেক নিয়ে ব্যাংকে ঘুরেও টাকা পাচ্ছেন না সাধারণ গ্রাহকরা।
সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স বর্তমানে চরম আর্থিক ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলাহীনতায় ভুগছে। অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনা ব্যয়, দুর্বল লাইফ ফান্ড এবং ভঙ্গুর আর্থিক অবকাঠামো কোম্পানিকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে। প্রিমিয়াম আয় হ্রাস পাওয়া প্রমাণ করে গ্রাহকের আস্থাও তলানিতে ঠেকেছে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে, গ্রাহকদের বীমা দাবী পরিশোধে মালিকপক্ষের অনীহা। নতুন মালিকরা দয়িত্ব নেয়ার পরে কোম্পানির লোগো পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু গ্রাহকদের ভাগ্য পরিবর্তন ঘটেনি। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ায় কোম্পানিটি যে আর্থিক সংকটে পড়েছে, তা শুধু তাদের নিজেদের নয়, বীমা খাতের সার্বিক ভাবমূর্তির জন্যও হুমকিস্বরূপ। নিয়ন্ত্রক সংস্থা অবিলম্বে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে সাধারণ বীমা গ্রাহকদের কষ্টার্জিত আমানত ফেরত পাওয়ার শঙ্কা দীর্ঘ মেয়াদী হবে।
Posted ০৫:২০ অপরাহ্ণ | শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com