|

Advertisement
×

শীতলক্ষ্যার তীর থেকে হসপিটালিটি নেতৃত্বে: স্বপ্ন, সংগ্রাম ও এগিয়ে যাওয়ার গল্প

রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬   প্রিন্ট   ১১২ বার পঠিত

শীতলক্ষ্যার তীর থেকে হসপিটালিটি নেতৃত্বে: স্বপ্ন, সংগ্রাম ও এগিয়ে যাওয়ার গল্প

শৈশব কেটেছে নরসিংদীর পলাশে, শীতলক্ষ্যা নদীর তীরের একটি জুট মিলের অফিসার্স কলোনিতে। প্রকৃতি, নদী, খেলাধুলা, বইপড়া, নৌকায় ঘোরাঘুরি আর মাছ ধরার মধ্য দিয়েই বেড়ে ওঠা। তখন হয়তো বুঝতে পারেননি, কিন্তু শৈশবের সেই অভিজ্ঞতাগুলোই ধীরে ধীরে মানুষের সঙ্গে মেশা, নতুন জায়গা দেখা এবং চারপাশকে অনুভব করার প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি করেছিল। পরবর্তী সময়ে ট্যুরিজম ও হসপিটালিটি খাতে যুক্ত হয়ে ফিরে তাকালে সেই শৈশবের সঙ্গে নিজের পেশাজীবনের একটি গভীর যোগসূত্র খুঁজে পান তিনি।

তাঁর সময়ে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর স্বপ্ন ছিল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা, চিকিৎসক বা প্রকৌশলী হওয়া কিংবা সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়া। তিনিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মৃত্তিকাবিজ্ঞান এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। তবে তাঁর মনে প্রশ্ন ছিল—শুধু একটি ডিগ্রি অর্জন করাই কি জীবনের লক্ষ্য? এমন একটি বিষয় পড়তে চেয়েছিলেন, যার সঙ্গে ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের সরাসরি সম্পর্ক থাকবে এবং নিজেকে অন্যভাবে তৈরি করার সুযোগও থাকবে।

সেই অনুসন্ধান থেকেই পরিচয় হয় ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজির (আইইউবিএটি) ট্যুরিজম ও হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সঙ্গে। সে সময় বাংলাদেশে এ বিষয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল তুলনামূলক সীমিত। প্রয়োজনীয় বই খুঁজতে নীলক্ষেতের আনাচকানাচ ঘুরতে হতো। তবে সীমাবদ্ধতাই তাঁদের শেখার আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।

যা পাওয়া যেত, তার বাইরেও নিজেরা খুঁজতেন, পড়তেন এবং বোঝার চেষ্টা করতেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ইন্ডাস্ট্রি থেকে আসা খণ্ডকালীন ও অতিথি শিক্ষকদের বাস্তব অভিজ্ঞতাও ছিল তাঁদের শেখার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আইইউবিএটির প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক এম আলিমউল্যা মিয়ানের শিক্ষাদর্শনও তাঁকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল। মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং পেশাভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে সক্ষমতা তৈরির ওপর তাঁর যে গুরুত্বারোপ, তা শিক্ষাজীবনে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসায় প্রশাসনের পাশাপাশি লজিং, ফ্রন্ট অফিস, ফুড অ্যান্ড বেভারেজ ম্যানেজমেন্ট, রেস্টুরেন্ট ম্যানেজমেন্ট, কালিনারি, ফুড হাইজিন, ট্যুরিজম মার্কেটিং, হসপিটালিটি ল এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল লসহ নানা বিষয়ে পড়াশোনার সুযোগ ছিল। তবে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, সেবাদান ও ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলোই তাঁকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছিল।

সেখান থেকেই উপলব্ধি তৈরি হয়—হসপিটালিটি কেবল একটি হোটেল পরিচালনার বিষয় নয়; এর কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ, তাঁদের প্রত্যাশা এবং তাঁদের অভিজ্ঞতা।

শ্রেণিকক্ষ থেকে বাস্তব কর্মক্ষেত্রে

বিশ্ববিদ্যালয়ে টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবেও কাজ করার সুযোগ হয়েছিল তাঁর। চাইলে শিক্ষকতার পথেও এগোতে পারতেন। কিন্তু তিনি বেছে নেন ভিন্ন পথ। সিদ্ধান্ত নেন, আগে ইন্ডাস্ট্রিতে গিয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন।

তাঁর যুক্তি ছিল, শ্রেণিকক্ষে শেখা জ্ঞানকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করে না দেখলে কোনো পেশাকে পুরোপুরি বোঝা কঠিন। সেই ভাবনা থেকেই কর্মজীবনের শুরু একেবারে প্রাথমিক পর্যায় থেকে।

২০০৭ সালে দ্য ওয়েস্টিন ঢাকায় ‘হেলথ ক্লাব রিসেপশনিস্ট’ হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। কোনো কাজকেই ছোট করে না দেখার মানসিকতা ছিল তাঁর। মাত্র এক বছরের মধ্যেই, ২০০৮ সালে, ফ্রন্ট অফিস বিভাগের টিম লিডার হিসেবে দায়িত্ব পান।

ফ্রন্ট অফিসে কাজ করতে করতেই সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং এবং ক্যাটারিংয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। তবে সরাসরি সেলস বিভাগে চলে যাওয়া সহজ ছিল না। নিজেকে প্রস্তুত করতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের সুযোগ নেন। কর্তৃপক্ষকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, নতুন দায়িত্ব নেওয়ার জন্য তিনি প্রস্তুত।

এই সময়ের অভিজ্ঞতা থেকেই তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি তৈরি হয়—শুধু সুযোগের অপেক্ষায় থাকলে হবে না; বরং নিজেকে এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে, যাতে সুযোগ এলে সেটি গ্রহণ করার মতো সক্ষমতা নিজের মধ্যে থাকে।

একেকটি কর্মস্থল, একেকটি শিক্ষা

পরবর্তী সময়ে প্রাইম ব্যাংক ও লো মেরিডিয়েনে কাজের মাধ্যমে ক্লায়েন্ট রিলেশনশিপ, বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ও সেলস সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা আরও বিস্তৃত হয়। এরপর যোগ দেন দ্য প্যালেস লাক্সারি রিসোর্টে। বর্তমানে তিনি প্রতিষ্ঠানটির সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

পেছনে ফিরে তাকালে তাঁর কাছে কর্মজীবনের প্রতিটি ধাপই যেন পরবর্তী ধাপের প্রস্তুতি।

দ্য ওয়েস্টিন তাঁকে শিখিয়েছে হসপিটালিটির মৌলিক ভিত্তি। ফ্রন্ট অফিসের কাজ শিখিয়েছে মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা। ব্যাংকিং খাত দিয়েছে ক্লায়েন্ট ও ব্যবসার ভিন্ন একটি দৃষ্টিভঙ্গি। আর লো মেরিডিয়েন ও দ্য প্যালেস তাঁকে সেলস অ্যান্ড মার্কেটিংয়ের নেতৃত্বের দিকে এগিয়ে দিয়েছে।

তাঁর দৃষ্টিতে, ট্যুরিজম ও হসপিটালিটি এমন একটি খাত, যেখানে মানুষের দক্ষতা, সৃজনশীলতা, প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক পরিসরের সঙ্গে পরিচিতি—সবকিছুর সমন্বয় করার সুযোগ রয়েছে।

তবে শুধু চাকরির সম্ভাবনা রয়েছে বলেই সবাইকে এই বিষয়ে পড়াশোনা করতে হবে—এমনটা মনে করেন না তিনি। তাঁর মতে, যাঁদের মানুষের সঙ্গে কাজ করতে ভালো লাগে, সেবা দেওয়ার মানসিকতা রয়েছে, যোগাযোগ ও নেতৃত্বের দক্ষতা তৈরি করতে আগ্রহী এবং নতুন কিছু শেখার মানসিকতা আছে, তাঁদের জন্য ট্যুরিজম ও হসপিটালিটি একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র।

প্রযুক্তির সঙ্গে বদলে যাচ্ছে হসপিটালিটি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অটোমেশন, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং ডেটানির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ দ্রুত বদলে দিচ্ছে হসপিটালিটি ইন্ডাস্ট্রিকে। ফলে ভবিষ্যতের একজন হসপিটালিটি প্রফেশনালের জন্য শুধু প্রচলিত দক্ষতা যথেষ্ট নয়।

প্রযুক্তি বোঝার সক্ষমতা, তথ্য বিশ্লেষণ ও ব্যবহারের দক্ষতা, পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতা এবং একই সঙ্গে মানুষের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার ক্ষমতা—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

তাঁর মতে, প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক, হসপিটালিটি খাতের মূল শক্তি থাকবে মানুষকেন্দ্রিক সেবায়। তাই প্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি অতিথির অভিজ্ঞতা, সম্পর্ক এবং ব্যক্তিগত সেবার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

বাংলাদেশের পর্যটনে অপার সম্ভাবনা

বাংলাদেশের ট্যুরিজম খাতের সম্ভাবনাকেও তিনি দেখেন অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক হিসেবে। দেশের প্রকৃতি, নদী, পাহাড়, সমুদ্র, ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে আরও পরিকল্পিতভাবে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।

তবে শক্তিশালী ট্যুরিজমশিল্প গড়ে তুলতে শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা, হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, ইন্ডাস্ট্রির বাস্তব অভিজ্ঞতা, দক্ষ জনশক্তি, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবাদানের সংস্কৃতি।

শীতলক্ষ্যার তীরের ছোট্ট এক জুট মিলের কলোনিতে বেড়ে ওঠা সেই শিশুর জীবন যেন আজ এসে মিশেছে বাংলাদেশের হসপিটালিটি ইন্ডাস্ট্রির বৃহত্তর সম্ভাবনার সঙ্গে। নদীর পাড়ে প্রকৃতিকে অনুভব করা, মানুষের সঙ্গে মেশা আর নতুন জায়গা দেখার যে কৌতূহল শৈশবে অজান্তেই তৈরি হয়েছিল, পেশাজীবনে এসে সেটিই যেন পেয়েছে নতুন অর্থ—মানুষকে সেবা দেওয়া, নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করা এবং একটি সম্ভাবনাময় শিল্পের ভবিষ্যৎ গঠনে ভূমিকা রাখা।

Facebook Comments Box
✎ মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Posted ১২:৫২ অপরাহ্ণ | রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com