অনলাইন ডেস্ক
মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬ প্রিন্ট ৪১ বার পঠিত
কসময় রাজধানীর অভিজাত কেনাকাটার গন্তব্য, ২৮ বছরের মাথায় থামল বাণিজ্যিক কার্যক্রম | ক্রেতাসংকট, অনলাইন কেনাকাটা ও পরিচালন ব্যয়ের চাপে হার মানল শান্তিনগরের পরিচিত বিপণিবিতান
একসময় ছিল নামী ব্র্যান্ডের শোরুম, পোশাক-জুতা, প্রসাধনী আর উপহারসামগ্রীর দোকানে জমজমাট কেনাকাটা। ক্রেতাদের আনাগোনা ছিল নিয়মিত, ছিল ফুড কোর্ট ও বাগান। রাজধানীর শান্তিনগর-কাকরাইল মোড়ের কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি তখন ছিল অভিজাত বিপণিবিতানগুলোর একটি। অথচ সময়ের ব্যবধানে সেই পরিচিত চিত্র বদলে গেছে। ১৯৮টি দোকান নিয়ে যাত্রা শুরু করা বিপণিবিতানটিতে শেষ পর্যন্ত চালু ছিল মাত্র ১৭টি। লোকসান, ক্রেতাসংকট ও বাড়তে থাকা পরিচালন ব্যয়ের চাপে চলতি মাসের ১ তারিখ থেকে বন্ধ হয়ে গেছে এর বাণিজ্যিক কার্যক্রম।
১৯৯৮ সালে চালু হওয়া কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির এই পরিণতি শুধু একটি বিপণিবিতান বন্ধ হওয়ার ঘটনা নয়; বরং রাজধানীর খুচরা ব্যবসার পরিবর্তিত বাস্তবতা এবং ক্রেতাদের কেনাকাটার অভ্যাস বদলে যাওয়ারও একটি দৃষ্টান্ত।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির ব্যবসায়িক গুরুত্ব কমতে শুরু করে এক দশকেরও বেশি আগে। শান্তিনগর ফ্লাইওভার নির্মাণের সময় আশপাশের সড়কে যানজট, ধুলাবালি ও চলাচলের ভোগান্তি তৈরি হলে ক্রেতাদের যাতায়াত কমে যায়। এ সময় কয়েকজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী অন্য বিপণিবিতানে চলে যান। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও তাঁদের অনেকেই আর ফেরেননি।
এরপর করোনাভাইরাস মহামারির ধাক্কায় ব্যবসা আরও সংকুচিত হয়। অনেক পুরোনো ব্যবসায়ী দোকান বন্ধ করে দেন। একই সময়ে অনলাইন কেনাকাটার বিস্তার এবং নতুন, বড় শপিং মলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা বিপণিবিতানটির অবস্থান আরও দুর্বল করে তোলে।
কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি দোকান মালিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাকী বিল্লাহ ওসমানী বলেন, ফ্লাইওভার নির্মাণের সময় থেকেই বিপণিবিতানটির পতন শুরু হয়। পরে করোনা মহামারির কারণে ব্যবসায় বড় ধস নামে। প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীরা চলে যাওয়ায় দোকানের সংখ্যা কমে যায়, আর ক্রেতারাও আগের মতো আসতে থাকেননি।
বিপণিবিতানটি চালু রাখার আর্থিক চাপ শেষ পর্যন্ত অসহনীয় হয়ে ওঠে। বাকী বিল্লাহ ওসমানীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনায় প্রতি মাসে প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয় হতো। অথচ বন্ধ হওয়ার আগের ছয় মাসে সার্ভিস চার্জ বাবদ মাসে আদায় করা সম্ভব হয়েছে মাত্র এক থেকে দেড় লাখ টাকার বেশি নয়।
আয় ও ব্যয়ের এই বিশাল ব্যবধান সামাল দিতে সমিতির কর্মকর্তা এবং কয়েকজন দোকানমালিক ঋণ নিয়ে ছয় থেকে আট মাস বিপণিবিতানটি চালু রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু বিদ্যুৎ বিলসহ অন্যান্য খরচের বকেয়া বাড়তে থাকায় সেই উদ্যোগও শেষ পর্যন্ত টেকেনি।
বাকী বিল্লাহ ওসমানীর তথ্য অনুযায়ী, বিপণিবিতানটির বিদ্যুৎ বিলের বকেয়া ৬০ লাখ টাকার বেশি। দীর্ঘদিনের লোকসান এবং পরিচালন ব্যয় মেটানোর সামর্থ্য না থাকায় দোকানমালিকেরা সম্মিলিতভাবে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত নেন।
শুধু যোগাযোগের সমস্যা কিংবা অনলাইন কেনাকাটার প্রসার নয়, বিপণিবিতানটির ব্যবসায়িক দুরবস্থার পেছনে ক্রেতাদের আস্থার সংকটও কাজ করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তাঁদের অভিযোগ, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী নিম্নমানের পণ্যকে বিদেশি বা নামী ব্র্যান্ডের পণ্য হিসেবে বিক্রি করতেন। এতে পণ্যের মান ও সত্যতা নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়। ধীরে ধীরে বিপণিবিতানটির প্রতি আস্থা কমতে থাকে।
পাশাপাশি পণ্যের বৈচিত্র্য সীমিত থাকায় এক জায়গায় প্রয়োজনীয় সব পণ্য কেনার সুযোগও ছিল কম। ক্রেতাদের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে বিপণিবিতানটি।
অন্যদিকে, ই-কমার্স ও ফেসবুকভিত্তিক কেনাকাটা ক্রেতাদের সামনে ঘরে বসে পণ্য কেনার বিকল্প তৈরি করেছে। বসুন্ধরা সিটি ও যমুনা ফিউচার পার্কের মতো বড় বিপণিবিতানও ক্রেতাদের আকর্ষণে এগিয়ে গেছে। এই প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি।
কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি ২০ তলা ভবনের একটি অংশজুড়ে পরিচালিত হতো। নিচতলা থেকে তৃতীয় তলা পর্যন্ত ছিল দোকান ও অন্যান্য বাণিজ্যিক কার্যক্রম; ওপরের তলাগুলো ব্যবহৃত হয় আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট হিসেবে।
কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ হলেও ভবনটির আবাসিক অংশ চালু রয়েছে। অর্থাৎ, পুরো ভবনটি বন্ধ হয়নি; বন্ধ হয়েছে বিপণিবিতানের ব্যবসায়িক কার্যক্রম।
কর্ণফুলী গ্রুপের উদ্যোগে নির্মিত এই বিপণিবিতানের অধিকাংশ দোকান পরে ব্যক্তিমালিকানায় নিবন্ধন করে বিক্রি করা হয়েছিল। এখন ভবনটি বিক্রি অথবা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছেন মালিকেরা। গত দুই বছর ধরে উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান খোঁজার চেষ্টা চললেও এখন পর্যন্ত সফলতা আসেনি।
কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির উত্থান ও পতনের গল্প রাজধানীর খুচরা ব্যবসার সামনে থাকা বড় চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরে। একসময় পরিচিতি ও অবস্থানের কারণে ক্রেতা টানতে পারলেও সময়ের সঙ্গে সেই সুবিধা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। যোগাযোগব্যবস্থার বিঘ্ন, মহামারির ক্ষতি, ব্যবসায়ীদের প্রস্থান, পণ্যের বৈচিত্র্যের অভাব, আস্থার সংকট এবং অনলাইন কেনাকাটার সঙ্গে প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে দুর্বল হয়েছে এর ব্যবসায়িক ভিত্তি।
এর সঙ্গে পরিচালন ব্যয়ের তুলনায় আয় কমে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
রাজধানীর পরিবর্তিত নগরজীবনে ক্রেতারা এখন শুধু পরিচিত নাম বা অবস্থানের ওপর নির্ভর করেন না; তাঁরা চান পণ্যের বৈচিত্র্য, নির্ভরযোগ্য মান, সুবিধাজনক কেনাকাটা এবং প্রতিযোগিতামূলক অভিজ্ঞতা। এসব চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে একসময় জনপ্রিয় থাকা বিপণিবিতানও ক্রেতা হারাতে পারে। কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির বন্ধ হয়ে যাওয়া সেই বাস্তবতারই স্পষ্ট প্রতিফলন।
Posted ১১:১৫ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | Animator Alif
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com
✎ মন্তব্য করুন