নিজস্ব প্রতিবেদক
বুধবার, ০৯ জুলাই ২০২৫ প্রিন্ট ২৮৪ বার পঠিত
বাংলাদেশি পণ্যে ৩৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার নতুন শুল্ক হার ঘোষণা করে তিনি বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশকে চিঠি দিয়েছেন।
এতদিন বাংলাদেশের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কহার ছিল গড়ে ১৫ শতাংশ, এখন নতুন করে আরও ৩৫ শতাংশ শুল্ক বাড়ায় এটি দাঁড়াবে ৫০ শতাংশে।
তাতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খাবে বাংলাদেশি তৈরি পোশাক খাত, কারণ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্র। শুধু ২০২৪ সালেই বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ৮৫০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এ শুল্ক বৃদ্ধির বোঝা সরাসরি পোশাক উৎপাদকদের ওপর পড়বে। ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা।
রয়টার্স বলছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চলতি বছরের শুরুতে যে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করেন, তার নতুন পর্ব হিসেবে নতুন শুল্ক হার ঘোষণা দেওয়া হল, যা কার্যকর হবে আগামী ১ আগস্ট থেকে।
ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসার পর গত ২ এপ্রিল শতাধিক দেশের ওপর চড়া হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। বাংলাদেশের ওপর বাড়তি ৩৭ শতাংশ শুল্কের ঘোষণা আসে।
এ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে সম্পূরক শুল্ক পুনর্বিবেচনা করতে ডনাল্ড ট্রাম্পকে চিঠি পাঠান বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা তুলে ধরে শুল্কারোপের সিদ্ধান্ত তিন মাস স্থগিত রাখার অনুরোধ করা হয় সেখানে।
বাংলাদেশের মত অনেক দেশই শুল্ক কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেন দরবার শুরু করে। কোনো কোনো দেশ মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক হার শূন্যের ঘরে নামিয়ে আনার ঘোষণা দেয়।
পুরো বিশ্বকে অস্থির করে তোলার এক সপ্তাহের মাথায় বাড়তি শুল্ক ৯০ দিনের জন্য স্থগিতের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। শুল্ক বাড়িয়ে দেন কেবল চীনের ওপর।
এই তিন মাস সময় ট্রাম্প মূলত দিয়েছিলেন আলোচনার জন্য। বাংলাদেশের তরফ থেকেও সে বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এবং সংলাপের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ৬২৬টি পণ্যে শুল্ক ছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হয় বাজেটে। এর মধ্যে ১১০টি পণ্যের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়।
কিন্তু তাতে ট্রাম্পের মন গলেনি। যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ৬ বিলিয়ন ডলারের মত। সে কথা তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে লেখা চিঠিতে।
সেখানে বলা হয়, “বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য নিয়ে বহু বছরের আলোচনায় আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে বাংলাদেশের শুল্ক ও অশুল্ক, নীতি এবং বাণিজ্যিক বাধার কারণে যে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা থেকে আমাদের অবশ্যই সরে আসতে হবে। দুঃখজনকভাবে, আমাদের সম্পর্ক সমকক্ষ হওয়া থেকে অনেক দূরে। ২০২৫ সালের ১ আগস্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো বাংলাদেশের যে কোনো পণ্যের ওপর আমরা মাত্র ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করব।”
চিঠিতে ট্রাম্প বলেছেন, এই শুল্ক সব খাতভিত্তিক শুল্কের অতিরিক্ত হিসেবে প্রযোজ্য হবে। উচ্চ শুল্ক এড়াতে ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে পণ্য পাঠানো হলে তার ওপরও সেই উচ্চ শুল্ক আরোপ হবে।
চিঠিতে ট্রাম্প আরও বলেন, “দয়া করে এটা অনুধাবন করুন, আপনার দেশের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য বৈষম্য দূর করতে যা প্রয়োজন, তার থেকে ওই ৩৫ শতাংশ সংখ্যাটি অনেক কম।”
বাংলাদেশের সঙ্গে আর যেসব দেশে শুল্কের খড়্গে পড়েছে, তার মধ্যে রয়েছে- লাওস, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, সার্বিয়া, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, মালয়েশিয়া, তিউনিসিয়া, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ শুল্কের মুখে পড়েছে মিয়ানমার ও লাওস।
ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভি লিখেছে, নতুন শুল্ক হার ঘোষণা করলেও ডনাল্ড ট্রাম্প আলোচনার দুয়ার খোলা রাখার কথা বলেছেন। তাতে ১ আগস্টের আগে অনেক দেশের ক্ষেত্রে তিনি নমনীয় হতে পারেন। ট্রাম্প বলেছেন, ১ আগস্টের সময়সীমা একেবারে চূড়ান্ত নয়।
যেসব দেশ আরও ছাড় দিতে রাজি, তাদের প্রতি সদয় হবেন জানিয়ে তিনি বলেছেন, “পরিস্থিতি বুঝে কিছুটা সমন্বয় করা যেতে পারে… আমরা অবিচার করব না।”
তবে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, বাণিজ্যিক অংশীদাররা কোনো প্রতিশোধমূলক শুল্ক আরোপ করলে জবাবে সমপরিমাণ শুল্ক আরোপ করা হবে।
প্রধান উপদেষ্টাকে লেখা চিঠিতে তিনি বলেছেন, “আপনি যদি কোনোভাবে শুল্ক বৃদ্ধি করেন, তাহলে আপনি যতটা বাড়াবেন, তা আমাদের আরোপিত ৩৫ শতাংশের ওপর যোগ হবে।”
বিবিসি লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত কেবল যুক্তরাজ্য ও ভিয়েতনামের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছাতে পেরেছে। ভারতও চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে।
ভিয়েতনামের পর ভারতও যদি ট্রাম্পের সঙ্গে চুক্তি সেরে ফেলতে পারে, সেক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশের পোশাক পণ্যের দাম বেশি বাড়বে। আর তাতে ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশ বেশি সুবিধা পাবে।
এখনো চুক্তির আশায় বাংলাদেশ
তবে বাংলাদেশ সমঝোতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। এ বিষয়ে আজ বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরেক দফা আলোচনা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার ফেইসবুকে শফিকুল আলম লিখেছেন, “ওয়াশিংটন ডিসির সঙ্গে একটি শুল্ক চুক্তির প্রত্যাশা করছে ঢাকা, যা উভয় দেশের জন্যই লাভজনক হবে বলে আমরা আশা করি।”
ফেইসবুক পোস্টে শফিকুল বলেন, বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে আছেন এবং তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য আলোচনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানও এই প্রতিনিধিদলের সদস্য।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কয়েক দফায় আলোচনা হয়েছে এবং সামনেও আলোচনার ‘সুযোগ আছে’ জানিয়ে তিনি লিখেছেন, “৯ জুলাই আরেক দফা আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এই আলোচনায় বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেবেন শেখ বশিরউদ্দিন।”
এদিকে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেছেন, ভিয়েতনাম ২৬ ভাগ শুল্ক আরোপ কমাতে পেরেছে নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে। বাংলাদেশ কেন পারেনি? এর জবাব আমাদেরও চেষ্টার কমতি ছিল না। শেষ পর্যন্ত যদি শুল্ক না কমায় তাহলে কিছু ক্ষেত্রে প্রভাব পড়বে। তবে আলোচনার পথ খোলা আছে এখনো, আশা করি ভালো কিছু হবে।
অর্থনীতিবিদ ও রপ্তানিকারকদের প্রতিক্রিয়া
বাংলাদেশি পণ্যে ট্রাম্প ৩৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়ায় প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন দেশের অর্থনীতিবিদ ও রপ্তানিকারকরা।
সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেছেন, বাংলাদেশি রপ্তানি পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ বড় ধরনের অর্থনৈতিক আঘাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য। আগে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কহার ছিল প্রায় ১৫ শতাংশ, এখন তা দ্বিগুণের বেশি। এ শুল্ক বৃদ্ধির বোঝা সরাসরি পোশাক উৎপাদকদের ওপর পড়বে। সেই সঙ্গে প্রভাব পড়বে লাখ লাখ শ্রমিকের ওপর, যাদের বেশির ভাগই নারী। ফলে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া, কর্মসংস্থান হ্রাস ও দারিদ্র্য বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হবে। এসব সমস্যা কেবল অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক প্রতিক্রিয়াও সৃষ্টি করবে।
৩৫ শতাংশ মার্কিন শুল্ক বহাল থাকলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত ভয়াবহ বিপদের মুখে পড়বে বলে সতর্ক করেছেন তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি রুবানা হক।
তিনি বলেন, ‘ভিয়েতনাম যখন ২০ শতাংশ শুল্কে পোশাক রপ্তানি করবে, তখন আমাদের দিতে হবে ৩৫ শতাংশ। আর আমরা এখনও নিশ্চিত না আগের যে ১৬ শতাংশ শুল্ক রয়েছে, সেটিও যুক্ত হবে কিনা। যদি সেটিও যুক্ত হয়, তাহলে তো পরিস্থিতি হবে ভয়াবহ।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট (আইবিএ)-এর পরিচালক মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বিভিন্ন দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করছে ট্রাম্প প্রশাসন। এই প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এমন সিদ্ধান্ত আসছে। তবে শুল্ক ইস্যুতে আলোচনাও চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ।’
তিনি জানান, বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধি দল বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছে। তাদের তৎপরতার উপর নির্ভর করছে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ও অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়েমা হক বিদিশা বলেন, ‘শুল্ক ইস্যুতে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে স্বস্তির জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানির ক্ষেত্রে পোশাকনির্ভরতা কমিয়ে বহুমুখীকরণে গুরুত্ব দিতে হবে।’
Posted ০২:২৪ অপরাহ্ণ | বুধবার, ০৯ জুলাই ২০২৫
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: ই-মেইল: bankbima1@gmail.com