সোমবার ৪ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২১ বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Ad
x
ব্লক লেনদেনে অস্বাভাবিক গতি ও দুদকের তদন্তে নতুন মাত্রা

আল-আরাফাহ ব্যাংকের ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছেই

রবিবার, ০৩ মে ২০২৬   প্রিন্ট   ২৭ বার পঠিত

আল-আরাফাহ ব্যাংকের ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছেই

দেশের ব্যাংকিং খাতে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। শেয়ারবাজারে অস্বাভাবিক ব্লক লেনদেন, বিতর্কিত মালিকানার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন এবং বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাফাত উল্লাহসহ অন্যান্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের অভিযোগ তদন্ত সব মিলিয়ে ব্যাংকটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে জটিল ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি। একই সময়ে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোতে আমানত বাড়লেও নতুন আইনি পরিবর্তন গ্রাহক আস্থায় দোলাচল তৈরি করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ারবাজারের ব্লক মার্কেটে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের বড় অঙ্কের শেয়ার হাতবদল বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। বছরের শুরু থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় সাড়ে আট কোটি শেয়ার ব্লক মার্কেটে লেনদেন হয়েছে, যা মোট শেয়ারের উল্লেখযোগ্য অংশ। বিশ্লেষকদের মতে, এত অল্প সময়ে এ ধরনের বড় লেনদেন সাধারণ বাজার আচরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; বরং এটি পরিকল্পিত মালিকানা পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত বহন করে।

লেনদেনের ধরন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সীমিত সংখ্যক বিনিয়োগকারীর বিও হিসাবের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ শেয়ার ক্রয়-বিক্রয় হয়েছে। এতে ধারণা জোরালো হয়েছে যে, নির্দিষ্ট গোষ্ঠী ধীরে ধীরে শেয়ার সংগ্রহ করে ভবিষ্যৎ পরিচালনা পর্ষদে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। শেয়ারবাজারের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হতে হলে ন্যূনতম ২ শতাংশ শেয়ার ধারণ করতে হয়। সেই লক্ষ্য পূরণেই এই ব্লক লেনদেন হতে পারে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।

ব্যাংকটির অতীত প্রেক্ষাপট এই আশঙ্কাকে আরও গভীর করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যাংকের আগের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয় এবং বিতর্কিত উদ্যোক্তাদের শেয়ার স্থগিত করা হয়। এরপর থেকে ব্যাংকটি শেয়ারধারী পরিচালক ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। তবে সম্প্রতি ‘ব্যাংক রেজ্যুলেশন আইন, ২০২৬’-এর সংশোধনের মাধ্যমে নতুন করে এমন একটি বিধান যুক্ত হয়েছে, যা সংকটাপন্ন ব্যাংকের সাবেক মালিকদের পুনরায় নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এই আইনি পরিবর্তনের পর থেকেই বাজারে গুঞ্জন ছড়িয়েছে বিতর্কিত শিল্পগোষ্ঠীগুলো কি আবারও ব্যাংকিং খাতে নিজেদের অবস্থান ফিরে পেতে যাচ্ছে কিনা।

আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকটিকে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন মাত্রা পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত কার্যক্রমে। সংস্থাটি ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রাফাত উল্লাহসহ শতাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঋণ জালিয়াতি, অনিয়মিত নিয়োগ, সুদ মওকুফে অনিয়ম এবং ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ বিতরণের অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করেছে। এ সংক্রান্ত বিপুল পরিমাণ নথি ও তথ্য ইতোমধ্যে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে তলব করা হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘দুদকের তদন্তের বিষয়ে আমরা কোন মন্তব্য করতে পারি না। দুদক চাইলে আমরা সব ধরণের তথ্য দিয়ে সহায়তা করি।’

তদন্তের আওতায় রয়েছে বিভিন্ন পদে নিয়োগের বিস্তারিত প্রক্রিয়া, বোর্ডের সিদ্ধান্ত, ঋণ অনুমোদন ও বিতরণের তথ্য, সুদ মওকুফের তালিকা এবং এমনকি স্পন্সরশিপ কার্যক্রমের নথিও। বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে এজেন্ট ব্যাংকিং খাতে কর বাবদ জমা দেওয়া অর্থের উৎস এবং বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণের বৈধতা। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এসব নথি পর্যালোচনার পর অভিযোগের ভিত্তিতে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

ব্যাংকটির মালিকানা নিয়ে চলমান এই টানাপোড়েনের মধ্যেই দেখা গেছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। রাজধানীতে ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বড় ধরনের বিক্ষোভ কর্মসূচিতে শুধু চাকরিতে পুনর্বহালের দাবি নয়, বরং পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন এবং নির্দিষ্ট শিল্পগোষ্ঠীর হাতে মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিও উঠে এসেছে। এতে করে আন্দোলনের পেছনে সংগঠিত স্বার্থের ইঙ্গিত দেখছেন বিশ্লেষকরা।

অন্যদিকে সামগ্রিকভাবে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর চিত্র কিছুটা ভিন্ন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের ব্যাংকগুলোতে আমানত ধীরে ধীরে বাড়ছে। এক মাসের ব্যবধানে কয়েক হাজার কোটি টাকা নতুন আমানত যুক্ত হয়েছে, যা গ্রাহক আস্থা ফেরার একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এই আস্থার মাঝেও নতুন আইনি পরিবর্তন উদ্বেগ তৈরি করেছে। সংশোধিত আইনের একটি ধারা অনুযায়ী, তুলনামূলক কম অর্থ পরিশোধ করেই সাবেক মালিকরা পুনরায় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পারেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ব্যাংক সংস্কারের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং অতীতে জড়িত বিতর্কিত গোষ্ঠীগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে।

বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, অতীতে যেসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ রয়েছে, তারা যদি আবার ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ফিরে আসে, তাহলে পুরো ব্যাংকিং খাত নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সাধারণ আমানতকারীরা।

আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একদিকে শেয়ারবাজারে অস্বাভাবিক লেনদেন, অন্যদিকে দুর্নীতির তদন্ত এবং একই সঙ্গে আইনি পরিবর্তনের প্রভাবÑএই তিনটি বিষয় মিলে ভবিষ্যতে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ কাঠামোতে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

সার্বিক বিষয়ে মন্তব্য নেওয়ার জন্য আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলে কারো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

 

Facebook Comments Box
×

Posted ১১:২৫ অপরাহ্ণ | রবিবার, ০৩ মে ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

আর্কাইভ ক্য

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১১৩১৫
১৬১৯২০২১২২
২৩২৪২৫২৬২৭
৩০৩১  
সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: ই-মেইল: bankbima1@gmail.com