|

Advertisement
×

আগাম রিটার্নে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা ছাড়, জমা বেড়েছে ৭৭%

শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬   প্রিন্ট   ২২ বার পঠিত

আগাম রিটার্নে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা ছাড়, জমা বেড়েছে ৭৭%

উৎসে কর কর্তন ও অগ্রিম আয়কর পরিশোধকারীরা রেয়াতের বাইরে, নীতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন

আগাম আয়কর রিটার্ন জমায় কর রেয়াতের প্রভাবে চলতি ২০২৬-২৭ করবর্ষের প্রথম তিন মাসে ব্যক্তিশ্রেণির রিটার্ন জমা বেড়েছে ৭৭ শতাংশ। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১২ লাখ ৫৩ হাজার রিটার্ন জমা পড়লেও বিশেষ এ সুবিধা নিয়েছেন প্রায় ৩ লাখ করদাতা। ফলে রিটার্ন জমায় উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হলেও করদাতাদের বড় একটি অংশ প্রণোদনার বাইরে থেকে গেছেন।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সূত্র অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ে ৭ লাখ ৯ হাজার আয়কর রিটার্ন জমা পড়েছিল। এবার তা বেড়ে ১২ লাখ ৫৩ হাজারে দাঁড়িয়েছে।

আগাম রিটার্ন জমায় উৎসাহ দিতে গত ২ আগস্ট প্রণোদনাভিত্তিক এ কাঠামো ঘোষণা করে এনবিআর। নতুন ব্যবস্থায় ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে প্রদেয় করের ওপর ৫ শতাংশ রেয়াত পাওয়ার সুযোগ রয়েছে, যার সর্বোচ্চ সীমা ২৫ হাজার টাকা। ১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে এ প্রণোদনা পাওয়া যাবে না।

অন্যদিকে, নির্ধারিত সময়ের পর রিটার্ন জমা দিলে জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে প্রদেয় করের ২ শতাংশ অথবা ৩ হাজার টাকা—যেটি বেশি, সেই পরিমাণ জরিমানা দিতে হবে। ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুনের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে জরিমানার পরিমাণ বেড়ে প্রদেয় করের ৫ শতাংশ অথবা ৫ হাজার টাকা হবে—যেটি বেশি।

ছোট করদাতাদের আগাম রিটার্নে উৎসাহ

প্রণোদনার কারণে ছোট করদাতাদের কেউ কেউ নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই রিটার্ন জমা দিতে উৎসাহিত হয়েছেন। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইসমাইল ৩০ সেপ্টেম্বর রিটার্ন জমা দিয়ে ২০ হাজার টাকা করের বিপরীতে প্রায় এক হাজার টাকা রেয়াত পেয়েছেন।

তিনি বলেন, সরকার প্রণোদনা দেওয়ায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দিতে উৎসাহ পেয়েছেন। টাকার পরিমাণ কম হলেও এ সুবিধা পেয়ে আনন্দিত হয়েছেন তিনি।

তবে কর বিশেষজ্ঞদের মতে, আগাম রিটার্ন জমায় প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও সামগ্রিক করদাতা কাঠামোর তুলনায় প্রণোদনা গ্রহণকারীর সংখ্যা এখনো কম।

করদাতার তুলনায় প্রণোদনা গ্রহণ কম

এসএমএসি অ্যাডভাইজরি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, ২০২৫-২৬ করবর্ষে প্রায় ৪৯ লাখ ই-টিআইএনধারী রিটার্ন জমা দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৩২ লাখ করদাতা কর পরিশোধ করেছেন।

তাঁর মতে, এ হিসাব অনুযায়ী চলতি করবর্ষে প্রায় ৩২ লাখ করদাতা সম্ভাব্যভাবে এ প্রণোদনার আওতায় আসতে পারতেন। কিন্তু প্রকৃত সুবিধাভোগীর সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ হওয়ায় নীতিটির কার্যকারিতা নিয়ে আরও পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে।

স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, রিটার্ন জমার উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি থেকে বোঝা যায়, নীতিটি সঠিক দিকে এগোচ্ছে। তবে যাঁরা বাস্তবে কর রেয়াত পেয়েছেন, তাঁদের সংখ্যা এখনো তুলনামূলকভাবে কম।

উৎসে কর কর্তনই বড় বাধা

কর বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রণোদনা কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা হলো উৎসে কর কর্তন (টিডিএস) ও অগ্রিম আয়কর (এআইটি) পরিশোধকারীদের রেয়াতের বাইরে রাখা। ফলে অনেক করদাতার করের দায় আগেই পরিশোধ হয়ে যাওয়ায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দিয়ে বাড়তি সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকছে না।

স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মোট কর রাজস্বের ৮৫ শতাংশের বেশি আসে উৎসে কর কর্তন ও অগ্রিম আয়কর থেকে। বিপুলসংখ্যক করদাতার কর আগে থেকেই পরিশোধিত থাকায় তাঁরা আগাম রিটার্ন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য আর্থিক প্রণোদনা পাচ্ছেন না।

এ কারণে কর সংগ্রহের পদ্ধতি যা-ই হোক, নিয়ম মেনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা দেওয়া সব করদাতার জন্য প্রণোদনা নিশ্চিত করতে নীতিটি পুনর্বিন্যাসের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

নারায়ণগঞ্জের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জ্যেষ্ঠ হিসাব কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুনও একই সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর বেতন থেকে প্রতি মাসে উৎসে আয়কর কেটে নেওয়া হয়।

তিনি বলেন, রেয়াত পাওয়ার সুযোগ না থাকায় সেপ্টেম্বরের সময়সীমার আগেই রিটার্ন জমা দেওয়ার বিষয়ে তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল না।

ই-টিআইএনধারী ও সক্রিয় করদাতার ব্যবধান কমানোর তাগিদ

বাংলাদেশে নিবন্ধিত ই-টিআইএনধারীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ হলেও নিয়মিত রিটার্ন জমা দেন তুলনামূলক কমসংখ্যক করদাতা। এ ব্যবধান কমাতে দুটি ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন স্নেহাশীষ বড়ুয়া।

প্রথমত, মাঠপর্যায়ে রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র বা পিএসআর (প্রুফ অব সাবমিশন অব রিটার্ন) সংক্রান্ত বিধান আরও কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অর্থ আইন ২০২৬-এর আওতায় চালু করা বিভিন্ন ব্যবস্থার মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সংযোগ বাড়িয়ে প্রকৃত আয় ও সম্পদের তথ্য শনাক্ত করতে হবে, যাতে করের আওতা সম্প্রসারণ করা যায়।

কর বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আগাম রিটার্ন জমায় প্রণোদনা দেওয়াই যথেষ্ট নয়। করদাতাদের জন্য ন্যায্য ও কার্যকর সুবিধা নিশ্চিত করা, বিদ্যমান বিধান বাস্তবায়ন এবং করের আওতার বাইরে থাকা প্রকৃত আয় শনাক্ত করার উদ্যোগ একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। তবেই রিটার্ন জমার প্রবৃদ্ধিকে দীর্ঘমেয়াদে কর-অনুবর্তিতা ও রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধিতে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে।

Facebook Comments Box

Posted ০৫:১২ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com