|

Advertisement
×

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে আমানত ৫১ হাজার কোটি, ঋণপ্রবাহে ঘাটতি

শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬   প্রিন্ট   ৩৩ বার পঠিত

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে আমানত ৫১ হাজার কোটি, ঋণপ্রবাহে ঘাটতি

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে হিসাব ২ কোটি ৭২ লাখ, প্রবাসী আয় বিতরণে বড় ভূমিকা; তবে গ্রামীণ ঋণ ও নারী উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে রয়ে গেছে ঘাটতি

ব্যাংকের শাখায় না গিয়েও এখন গ্রামের হাটবাজার, স্থানীয় দোকান কিংবা ইউনিয়ন পর্যায়ের এজেন্ট আউটলেট থেকে মিলছে বিভিন্ন ব্যাংকিং সেবা। একসময় আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিংয়ের বাইরে থাকা লাখো মানুষের কাছে পৌঁছানোর এ মাধ্যম এখন দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। আমানত সংগ্রহ, প্রবাসী আয় বিতরণ ও ব্যাংক হিসাব খোলায় এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বিস্তার ঘটলেও ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে এখনো পুরোপুরি সমতা আসেনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ এপ্রিল-জুন ২০২৬ প্রান্তিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৩০টি ব্যাংক ১৫ হাজার ৪২৪ জন এজেন্টের মাধ্যমে ২০ হাজার ৫৯৭টি আউটলেটে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা দিচ্ছে। এ ব্যবস্থায় খোলা হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৭২ লাখ ২৪ হাজারের বেশি। একই সময়ে এজেন্ট ব্যাংকিং হিসাবে জমা আমানতের পরিমাণ হয়েছে ৫১ হাজার ৯০৭ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের মার্চে এজেন্ট ব্যাংকিং হিসাবের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ। পাঁচ বছরের কিছু বেশি সময়ে তা বেড়ে প্রায় আড়াই গুণ হয়েছে। একই সময়ে আউটলেটের সংখ্যা ১৬ হাজার ৪২১ থেকে বেড়ে ২০ হাজার ৫৯৭ হয়েছে। এসব পরিসংখ্যান এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বিস্তার এবং মানুষের মধ্যে এ সেবার ব্যবহার বাড়ার চিত্র তুলে ধরে। [সূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং প্রতিবেদন, এপ্রিল-জুন ২০২৬]

আমানত ও প্রবাসী আয় বিতরণে বড় ভূমিকা

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো গ্রামীণ এলাকায় এর বিস্তৃতি। জুন ২০২৬ শেষে মোট আউটলেটের ৮৫ দশমিক ৪৫ শতাংশই গ্রামীণ এলাকায় অবস্থিত। এ ব্যবস্থায় খোলা হিসাবের প্রায় ৮৫ শতাংশ গ্রামীণ গ্রাহকদের।

মোট আমানতের ৮১ দশমিক ৪০ শতাংশ এসেছে গ্রামীণ এলাকা থেকে। অন্যদিকে, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিতরণ করা প্রবাসী আয়ের ৯০ দশমিক ৪৪ শতাংশ পেয়েছেন গ্রামের সুবিধাভোগীরা। ফলে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থ প্রত্যন্ত অঞ্চলের পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছে দিতে এ ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

জুন ২০২৬ শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিতরণ করা প্রবাসী আয়ের ক্রমপুঞ্জিত পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ১৪ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৬ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আমানত ও প্রবাসী আয় বিতরণে প্রবৃদ্ধি দেখালেও এ সেবা এখনো ব্যাংকিং খাতের বিকল্প নয়, বরং প্রচলিত ব্যাংকিং নেটওয়ার্কের পরিপূরক। প্রত্যন্ত অঞ্চলে শাখা স্থাপনের তুলনায় এজেন্ট আউটলেট পরিচালনার ব্যয় কম হওয়ায় ব্যাংকগুলো তুলনামূলক কম খরচে নতুন গ্রাহকের কাছে পৌঁছাতে পারছে।

ঋণ বিতরণ বাড়লেও গ্রাম-শহরে ব্যবধান

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ঋণ বিতরণেও অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন ২০২৬ শেষে এ ব্যবস্থায় ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা। মার্চ প্রান্তিকের তুলনায় তা বেড়েছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ, আর এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ৪০ দশমিক ৮৯ শতাংশ।

তবে আমানত ও ঋণ বিতরণের ভৌগোলিক বণ্টনে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। মোট আমানতের ৮১ দশমিক ৪০ শতাংশ গ্রামীণ এলাকা থেকে এলেও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিতরণ করা ঋণের ৬৪ দশমিক ১৭ শতাংশ পেয়েছেন গ্রামীণ গ্রাহকেরা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, গ্রামীণ এলাকায় আমানতের বিপরীতে ঋণের অনুপাত ৬২ শতাংশ, যেখানে সামগ্রিক এজেন্ট ব্যাংকিং খাতে এ অনুপাত ৭৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। অর্থাৎ, গ্রাম থেকে সংগৃহীত আমানতের তুলনায় গ্রামীণ অর্থনীতিতে ঋণপ্রবাহ এখনো কম।

এ ব্যবধান কমাতে ক্ষুদ্র, অতিক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (সিএমএসএমই), নারী উদ্যোক্তা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ঋণ ও পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি মূল্যায়ন, গ্রাহকের আয় ও পরিশোধ সক্ষমতা যাচাই এবং ঋণ আদায়ের সক্ষমতাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

নারী হিসাব বাড়লেও ঋণপ্রাপ্তিতে পিছিয়ে

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে নারীদের অংশগ্রহণের চিত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। জুন ২০২৬ শেষে মোট হিসাবের প্রায় ৫০ শতাংশ নারী গ্রাহকদের নামে। মোট ২ কোটি ৭২ লাখ হিসাবের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৩৬ লাখ নারী গ্রাহকের।

কিন্তু ঋণ বিতরণে চিত্রটি ভিন্ন। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিতরণ করা ঋণের মাত্র ১২ দশমিক ৭২ শতাংশ পেয়েছেন নারী গ্রাহকেরা। বিপরীতে পুরুষ গ্রাহকদের অংশ ৮৪ দশমিক ২৫ শতাংশ।

অর্থাৎ, ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে নারীরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও ব্যবসা সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ ও আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছেন।

এদিকে, নারী উদ্যোক্তাদের পরিচালিত এজেন্ট আউটলেটের সংখ্যাও বাড়ছে। জুন ২০২৬ শেষে ২৮টি ব্যাংকের অধীনে নারী উদ্যোক্তাদের মালিকানায় ছিল ২ হাজার ১০৬টি আউটলেট, যা দেশের মোট এজেন্ট আউটলেটের ১০ দশমিক ২২ শতাংশ।

এসব আউটলেটের মাধ্যমে ২৩ লাখের বেশি ব্যাংক হিসাব পরিচালিত হচ্ছে। তবে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানো এবং নারী গ্রাহকদের ঋণপ্রাপ্তি সহজ করা এ খাতের অন্যতম চ্যালেঞ্জ।

কয়েকটি ব্যাংকের হাতে বড় বাজার

এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বিস্তার ঘটলেও বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে অল্প কয়েকটি ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন ২০২৬ শেষে ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের এজেন্ট আউটলেট ছিল ৫ হাজার ৬৪১টি, যা দেশের মোট আউটলেটের ২৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ।

হিসাবের সংখ্যায়ও শীর্ষে রয়েছে ব্যাংকটি। তাদের এজেন্ট ব্যাংকিং হিসাবের সংখ্যা ৮২ লাখ ৫১ হাজারের বেশি, যা মোট হিসাবের ৩০ দশমিক ৩১ শতাংশ।

অন্যদিকে, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সংগৃহীত আমানতে শীর্ষে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। মোট আমানতের ৩৮ দশমিক ৮০ শতাংশ এসেছে ব্যাংকটির মাধ্যমে। ঋণ বিতরণে শীর্ষে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক, যার অংশ ৭৩ দশমিক ৭৯ শতাংশ। আর এজেন্টের মাধ্যমে প্রবাসী আয় বিতরণে ইসলামী ব্যাংকের অংশ ৫৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

এ পরিসংখ্যান দেখায়, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের বিভিন্ন সেবা—আমানত, ঋণ ও প্রবাসী আয় বিতরণ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই ব্যাংকগুলোর অবস্থান এক নয়। একই সঙ্গে কয়েকটি ব্যাংকের ওপর উচ্চ নির্ভরতা প্রতিযোগিতা ও সেবার বিস্তার নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি করে।

সামনে যে চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এজেন্ট ব্যাংকিং চালুর উদ্যোগ নেয়। এর উদ্দেশ্য ছিল প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিংয়ের আওতায় আনা এবং প্রচলিত শাখার বাইরে সাশ্রয়ী উপায়ে আর্থিক সেবা পৌঁছে দেওয়া।

বর্তমানে এজেন্ট আউটলেট থেকে আমানত জমা, টাকা উত্তোলন, প্রবাসী আয় গ্রহণ, ঋণসংক্রান্ত সেবা, বিল পরিশোধ এবং সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থ গ্রহণের মতো সুবিধা পাওয়া যায়।

তবে এ ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে শুধু হিসাব ও আউটলেটের সংখ্যা বাড়ানোর ওপর নয়। গ্রামীণ আমানতকে স্থানীয় ব্যবসা ও উৎপাদনশীল খাতে ঋণ হিসেবে প্রবাহিত করা, নারীদের অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো, গ্রাহকের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি, এজেন্টদের নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনার ঝুঁকি কমানো এবং ডিজিটাল জালিয়াতি প্রতিরোধেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

সামগ্রিকভাবে, এজেন্ট ব্যাংকিং বাংলাদেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তবে এর পরবর্তী ধাপ হওয়া উচিত শুধু ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ বাড়ানো নয়, বরং সেই হিসাবকে সঞ্চয়, ঋণ, বিনিয়োগ ও আয়বর্ধক কর্মকাণ্ডের কার্যকর মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলা।

Facebook Comments Box

Posted ০৫:৩৩ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com