|

Advertisement
×

দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ অব্যাহত, ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু ১, হাসপাতালে ১,৩০০

শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬   প্রিন্ট   ১৬ বার পঠিত

দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ অব্যাহত, ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু ১, হাসপাতালে ১,৩০০

৯ দিনে ৫০ জনের মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ২৯৫; হাসপাতালে চিকিৎসাধীন প্রায় ৫,৮০০ রোগী

দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ও মৃত্যুর ধারা অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় মশাবাহিত এ রোগে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ৩০০ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯৫ জনে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) ৯ অক্টোবর প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত দেশে মোট ৯৫ হাজার ৪৫১ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৮৯ হাজার ৩৮০ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৫ হাজার ৭৭৬ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া রোগী খুলনা বিভাগের বাসিন্দা। নতুন রোগী শনাক্ত ও হাসপাতালে ভর্তির এই চিত্র ইঙ্গিত দিচ্ছে, অক্টোবরেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

অক্টোবরের প্রথম ৯ দিনেই ৫০ জনের মৃত্যু

চলতি বছরের মাসভিত্তিক মৃত্যুর হিসাব বিশ্লেষণ করলে পরিস্থিতির অবনতির চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছিল। জুনে মারা যান ১৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন এবং আগস্টে ৪৩ জন।

তবে সেপ্টেম্বরে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য অবনতি ঘটে। ওই মাসে ডেঙ্গুতে ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়, যা চলতি বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মাসিক প্রাণহানি।

অক্টোবরের প্রথম নয় দিনেই আরও ৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ, এ মাসের প্রথম নয় দিনের মৃত্যুসংখ্যা আগস্টের পুরো মাসের মৃত্যুর চেয়েও বেশি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, সেপ্টেম্বর মাসে ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। মাসটিতে মৃত্যুর পাশাপাশি রোগী ভর্তির সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল।

ঢাকার বাইরেও বাড়ছে রোগীর চাপ

সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৪১৪ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৩১৮ জন এবং খুলনা বিভাগে ২৭৪ জন রয়েছেন।

এ ছাড়া বরিশাল বিভাগে ১৪১ জন, রংপুরে ৮০ জন, ময়মনসিংহে ৬৯ জন এবং সিলেটে চারজন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

বিভাগভিত্তিক এই পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ডেঙ্গুর চাপ শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়; দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে রাজধানীর পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নজরদারি এবং দ্রুত রোগী শনাক্তের ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।

বৃষ্টি ও আবহাওয়ার পরিবর্তনে বাড়ছে ঝুঁকি

সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাত এবং আবহাওয়ার পরিবর্তন ডেঙ্গুর বিস্তার দীর্ঘায়িত করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

রয়টার্সের ১ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সেপ্টেম্বরে বৃষ্টিপাতের পরবর্তী প্রভাব অক্টোবরেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়িয়ে রাখতে পারে। বৃষ্টির পানি জমে থাকা বিভিন্ন পাত্র, ছাদ, পরিত্যক্ত টায়ার ও নির্মাণাধীন স্থানে এডিস মশার প্রজনন বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কীটনাশক ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করে ধ্বংস করা এবং নিয়মিতভাবে জমে থাকা পানি অপসারণ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মস্থল ও নির্মাণাধীন ভবনে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম নিশ্চিত না হলে মশার বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে।

চার ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাস নিয়ে উদ্বেগ

রয়টার্সের ৬ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত জানিয়েছেন, বাংলাদেশে ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপই শনাক্ত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে দেশে ডেঙ্গুর টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনার সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে।

ডেঙ্গু ভাইরাসের এক ধরনের সংক্রমণের পর অন্য ধরনের ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। বিশেষ করে পরবর্তী সংক্রমণে গুরুতর ডেঙ্গুর আশঙ্কা বাড়তে পারে।

তবে টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বিবেচনার অর্থ এই নয় যে দেশে টিকাদান কর্মসূচি চালুর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে, ৯ অক্টোবর প্রকাশিত দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রাকযোগ্যতা পাওয়া কিউডেঙ্গা (QDENGA) টিকা ব্যবহারের অনুমোদন বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। টিকার প্রাপ্যতা নিয়ে আলোচনা চললেও আপাতত সংক্রমণ প্রতিরোধ ও দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করাই জরুরি।

রোগীর চাপ বাড়লে হাসপাতালের প্রস্তুতিও জরুরি

ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে শয্যা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীর পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর জ্বর কমে গেলেই বিপদ কেটে গেছে—এমন ধারণা ঠিক নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অসুস্থতার তৃতীয় থেকে সপ্তম দিনের মধ্যে গুরুতর ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এ সময় বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।

তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাত, দ্রুত শ্বাস নেওয়া, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, অস্থিরতা কিংবা রক্তবমি হলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। এসব লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসা নিতে দেরি করা বিপজ্জনক হতে পারে।

ডেঙ্গু সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। জ্বর ও ব্যথার জন্য প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যেতে পারে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী; তবে অ্যাসপিরিন ও আইবুপ্রোফেনের মতো ওষুধ রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

প্রতিরোধে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ প্রয়োজন

ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বাড়ি ও আশপাশের জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করা, পানির পাত্র ঢেকে রাখা এবং মশারি ও মশা প্রতিরোধক ব্যবহার সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।

একই সঙ্গে আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত শনাক্তকরণ, হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালানো জরুরি।

সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছর দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা ২৯৫-এ পৌঁছেছে এবং হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৯৫ হাজার ছাড়িয়েছে। সেপ্টেম্বরে প্রাণহানির রেকর্ড এবং অক্টোবরে প্রথম নয় দিনের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

Facebook Comments Box

Posted ১১:২৭ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com