অনলাইন ডেস্ক
শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬ প্রিন্ট ২৫ বার পঠিত
বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২% ও শিশু-কিশোরদের ৯৫% চিকিৎসা পায় না: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত ১০ জনের ৯ জনেরও বেশি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পায় না। সামাজিক stigma বা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, অপর্যাপ্ত সরকারি বরাদ্দ এবং বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার সীমিত সুযোগের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ চিকিৎসার বাইরে থেকে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।
সংস্থাটির ২০২৫ সালের প্রতিবেদন Prevention and management of mental health conditions in Bangladesh: A case for investment অনুযায়ী, দেশে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ৯২ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের ৯৫ শতাংশ চিকিৎসা পায় না।
২০১৮-১৯ সালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপের তথ্যের ভিত্তিতে এ হিসাব করা হয়েছে। এটি ২০২৬ সালে দেশের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতির নতুন কোনো জরিপ নয়।
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত এ তথ্য দেশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা এবং চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এনেছে। এ বছরের দিবসের প্রতিপাদ্য ‘অভিজ্ঞতার কথা শুনুন: বাস্তব কণ্ঠস্বর, বাস্তব পরিবর্তন’। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন ব্যক্তিদের মতামত নীতি ও সেবাব্যবস্থা তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে এতে।
২০১৮-১৯ সালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্কদের ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত ছিলেন। ৭ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং শিশু-কিশোরদের ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ কোনো চিকিৎসা নেননি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক stigma, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের স্বল্পতা, ওষুধ ও চিকিৎসাসেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার এবং খাতে অপর্যাপ্ত অর্থায়ন এ পরিস্থিতির প্রধান কারণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে বাংলাদেশের মোট স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশ ব্যয় করা হয়েছিল মানসিক স্বাস্থ্য খাতে।
এ ব্যয়ের ৬৭ শতাংশই গেছে মানসিক হাসপাতালে। অর্থাৎ, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার প্রতিরোধ, প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ এবং কমিউনিটিভিত্তিক চিকিৎসাসেবার পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসায় ব্যয়ের বড় অংশ কেন্দ্রীভূত ছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে মানসিক, স্নায়বিক ও মাদকদ্রব্য ব্যবহারজনিত সমস্যার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আনুমানিক ২১ হাজার ৫০ কোটি টাকার সমপরিমাণ ক্ষতি হয়েছে। এ পরিমাণ সে বছরের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় শূন্য দশমিক ৭৬ শতাংশ।
কর্মক্ষমতা হ্রাস, কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ কমে যাওয়া, প্রতিবন্ধিতা এবং অকালমৃত্যুর মতো বিষয় এ অর্থনৈতিক ক্ষতির অন্তর্ভুক্ত।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা ছিল ২৬০ জন। প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে এ হার প্রায় শূন্য দশমিক ১৬ জন।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও সাইকিয়াট্রিক নার্সদের অধিকাংশই ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় কেন্দ্রীভূত। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় এ এলাকায় তাঁদের উপস্থিতির হার প্রায় পাঁচ গুণ।
দেশজুড়ে ৬৯টি বহির্বিভাগীয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং ৭২টি আবাসিক সেবাকেন্দ্রের তথ্য দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তবে কমিউনিটিভিত্তিক ফলোআপ ও ডে-ট্রিটমেন্ট সুবিধার অভাবও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
ফলে বড় শহরের বাইরে বসবাসকারী মানুষের নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে যাঁদের বেসরকারি চিকিৎসার ব্যয় বহন করার সামর্থ্য নেই অথবা বিশেষজ্ঞের কাছে যেতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়, তাঁরা বেশি সমস্যায় পড়েন।
বাংলাদেশে ২০২৫ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় পরিচালিত একটি কর্মসূচির আওতায় ২০ হাজারের বেশি মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শসেবা দেওয়া হয়েছে। এ কর্মসূচিতে ৮৪৬ জন অ-বিশেষজ্ঞ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং ৮১টি সহায়ক তদারকি কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
তবে এ পরিসংখ্যান শুধু ডব্লিউএইচও-সমর্থিত ওই কর্মসূচির। এগুলোকে দেশের সামগ্রিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবার মোট পরিসংখ্যান হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা যুক্ত করা, কমিউনিটিভিত্তিক চিকিৎসা বাড়ানো, রোগী রেফার করার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং প্রশিক্ষিত জনবল বৃদ্ধি করা।
পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা প্রতিরোধ ও প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।
জাতিসংঘও এমন মানসিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে, যেখানে মানুষের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে এবং নিজের চিকিৎসাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের মতামত গুরুত্ব পাবে।
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬ উপলক্ষে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সরকারগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, যেন তারা মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার পরিবর্তে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে কাজ করে এবং কমিউনিকেন্দ্রিক সেবায় বিনিয়োগ বাড়ায়।
তিনি বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক stigma দূর করা এবং সবার জন্য মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করে এমন সেবাব্যবস্থা গড়ে তোলার অঙ্গীকার নতুন করে জোরদার করতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলেছে, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন ব্যক্তিদের কথা শুধু শুনলেই হবে না; নীতি প্রণয়ন, সেবার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নেও তাঁদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় অর্থায়ন বৃদ্ধি, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি পূরণ এবং ঢাকার বাইরে সহজলভ্য চিকিৎসা নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে সামাজিক stigma কমানো এবং প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ বাড়ানো গেলে বিপুলসংখ্যক মানুষের চিকিৎসার বাইরে থাকার পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব হতে পারে।
Posted ১০:৪৯ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | Animator Alif
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com