|

Advertisement
×

বিশ্বের জ্বালানি তেল মজুদকারী শীর্ষ ১০ দেশ

শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬   প্রিন্ট   ১৭ বার পঠিত

বিশ্বের জ্বালানি তেল মজুদকারী শীর্ষ ১০ দেশ

বিশ্ব অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে জ্বালানি তেলের গুরুত্ব এখনো অপরিসীম। পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, পেট্রোকেমিক্যাল এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তেলের ওপর নির্ভরশীল। ফলে কোন দেশের ভূগর্ভে কত তেল রয়েছে, তা শুধু জ্বালানি সম্পদের হিসাব নয়; বরং অর্থনৈতিক সক্ষমতা, ভূরাজনৈতিক প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তারও গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক।

প্রমাণিত অপরিশোধিত তেলের মজুদের হিসাবে বিশ্বের শীর্ষে রয়েছে ভেনেজুয়েলা। এরপর সৌদি আরব, ইরান, কানাডা ও ইরাক। ২০২৫ সালের দেশভিত্তিক বহুল ব্যবহৃত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ ছাড়াও রয়েছে উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও আফ্রিকার রাষ্ট্র। তবে বিপুল মজুদ থাকলেই যে কোনো দেশ সবচেয়ে বেশি তেল উৎপাদন বা রপ্তানি করে, তা নয়। তেলের ধরন, উত্তোলন ব্যয়, প্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি উৎপাদন নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।

১. ভেনেজুয়েলা: বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলের ভান্ডার:
প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের মজুদ নিয়ে তালিকার প্রথম স্থানে রয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা। বিশ্বের মোট প্রমাণিত তেলের মজুদের প্রায় ১৭ শতাংশের সমপরিমাণ সম্পদ রয়েছে দেশটিতে। দেশটির প্রধান তেলসম্পদ কেন্দ্রীভূত অরিনোকো বেল্ট অঞ্চলে, যেখানে বিপুল পরিমাণ ভারী ও অতিভারী অপরিশোধিত তেল রয়েছে।

এত বড় মজুদ থাকা সত্ত্বেও ভেনেজুয়েলা উৎপাদনের দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। ভারী তেল উত্তোলন ও পরিশোধনে বেশি ব্যয়, পুরোনো অবকাঠামো, বিনিয়োগের ঘাটতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা দেশটির তেলশিল্পকে দীর্ঘদিন চাপে রেখেছে। পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির উন্নয়ন ঘটলে এই সম্পদ দেশটির অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

২. সৌদি আরব: তেলবাজারের অন্যতম নিয়ন্ত্রক:
প্রায় ২৬৭ বিলিয়ন ব্যারেল প্রমাণিত তেলের মজুদ নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে সৌদি আরব। দেশটির বিশাল তেলক্ষেত্র, উন্নত উত্তোলনব্যবস্থা এবং তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয় একে বিশ্ব জ্বালানিবাজারের অন্যতম প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত করেছে।

সৌদি আরব পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপেকের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। উৎপাদন বাড়ানো বা কমানোর সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দেশটি আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ও দামের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তেল আয়ের ওপর নির্ভরতা কমাতে সৌদি আরব এখন পর্যটন, প্রযুক্তি, শিল্প ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। দেশটির অর্থনৈতিক রূপান্তরের কেন্দ্রেও রয়েছে এই বিশাল জ্বালানি সম্পদ।

৩. ইরান: নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও বিপুল তেলসম্পদ:
প্রায় ২০৯ বিলিয়ন ব্যারেল প্রমাণিত তেলের মজুদ নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ইরান। দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এবং পারস্য উপসাগরসংলগ্ন এলাকায় বড় বড় তেলক্ষেত্র রয়েছে। তেল ইরানের বৈদেশিক আয় ও সরকারি রাজস্বের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

তবে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনে সীমাবদ্ধতা এবং বিনিয়োগের প্রতিবন্ধকতা দেশটির তেলশিল্পের সম্প্রসারণকে বাধাগ্রস্ত করেছে। বিপুল মজুদ থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন বাড়াতে আধুনিক প্রযুক্তি ও বিদেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের পরিস্থিতিও ইরানের তেল রপ্তানির পাশাপাশি বিশ্ববাজারকে প্রভাবিত করে।

৪. কানাডা: তেলবালুর ওপর দাঁড়িয়ে বিশাল সম্পদ:
প্রায় ১৬৩ বিলিয়ন ব্যারেল প্রমাণিত তেলের মজুদ নিয়ে কানাডা চতুর্থ স্থানে রয়েছে। দেশটির তেলসম্পদের বড় অংশ আলবার্টা প্রদেশের তেলবালু অঞ্চলে অবস্থিত। এই তেল উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাত করতে প্রচলিত তেলক্ষেত্রের তুলনায় বেশি শক্তি, প্রযুক্তি ও অর্থের প্রয়োজন হয়।

কানাডা উত্তর আমেরিকার জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাইপলাইন ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক দেশটির তেলশিল্পকে শক্তিশালী করেছে। তবে তেলবালু উত্তোলনে কার্বন নিঃসরণ ও পরিবেশগত ক্ষতির প্রশ্ন রয়েছে। ফলে উৎপাদন বাড়ানোর অর্থনৈতিক সুবিধার সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণের ভারসাম্য রক্ষা কানাডার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

৫. ইরাক: মধ্যপ্রাচ্যের আরেক তেলসমৃদ্ধ শক্তি:
প্রায় ১৪৫ বিলিয়ন ব্যারেল প্রমাণিত তেলের মজুদ নিয়ে পঞ্চম স্থানে রয়েছে ইরাক। দেশটির প্রধান তেলক্ষেত্রগুলোর বড় অংশ দক্ষিণাঞ্চলের বসরা এবং উত্তরাঞ্চলের কিরকুক এলাকায় অবস্থিত। তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয়ে তেল উত্তোলনের সুযোগ ইরাককে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান দিয়েছে।

তেল রপ্তানি দেশটির সরকারি আয়ের প্রধান উৎসগুলোর একটি। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, নিরাপত্তাঝুঁকি এবং বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা উৎপাদন বৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে তেলনির্ভরতা কমানোও ইরাকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

৬. সংযুক্ত আরব আমিরাত: তেল থেকে বহুমুখী অর্থনীতিতে:
প্রায় ১১৩ বিলিয়ন ব্যারেল প্রমাণিত তেলের মজুদ নিয়ে ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটির অধিকাংশ তেলসম্পদ আবুধাবিতে কেন্দ্রীভূত। আধুনিক উৎপাদনব্যবস্থা, রপ্তানি অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের কারণে দেশটি বিশ্ব জ্বালানিবাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে।
তেল আয়ের পাশাপাশি পর্যটন, বিমান পরিবহন, আর্থিক পরিষেবা ও বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে অর্থনীতির পরিধি বাড়িয়েছে আমিরাত। ভবিষ্যতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা থাকলেও তেল ও গ্যাস এখনো দেশটির অর্থনৈতিক সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

৭. কুয়েত: অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি তেল:
প্রায় ১০১.৫ বিলিয়ন ব্যারেল প্রমাণিত তেলের মজুদ নিয়ে সপ্তম স্থানে রয়েছে কুয়েত। দেশটির বৃহৎ বুরগান তেলক্ষেত্র বিশ্বের পরিচিত বড় তেলক্ষেত্রগুলোর একটি। তেল রপ্তানি থেকে পাওয়া আয় কুয়েতের সরকারি ব্যয়, অবকাঠামো উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে অর্থনীতির বড় অংশ তেলনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমে গেলে দেশটির রাজস্বেও চাপ তৈরি হয়। এ কারণে কুয়েত অর্থনীতির বহুমুখীকরণ এবং তেলবহির্ভূত খাতের বিকাশের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।

৮. যুক্তরাষ্ট্র: উৎপাদনে শীর্ষ, মজুদেও বড় শক্তি:
২০২৫ সালের একটি বহুল ব্যবহৃত আন্তর্জাতিক তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রমাণিত তেলের মজুদ প্রায় ৮৩.৭ বিলিয়ন ব্যারেল দেখানো হয়েছে। এই হিসাবে দেশটির অবস্থান অষ্টম। তবে বিভিন্ন সংস্থার হিসাবপদ্ধতি ও তেলের শ্রেণিবিন্যাসের পার্থক্যের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মজুদের পরিমাণ নিয়ে পরিসংখ্যানে ভিন্নতা দেখা যায়।

শেল তেল উত্তোলনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উৎপাদক দেশে পরিণত করেছে। টেক্সাস ও পারমিয়ান বেসিন অঞ্চল দেশটির উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার, উন্নত প্রযুক্তি, পাইপলাইন এবং শোধনাগারের সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রকে উৎপাদন ও জ্বালানি বাণিজ্যে বিশেষ সুবিধা দিয়েছে।

৯. রাশিয়া: জ্বালানি সম্পদে বৈশ্বিক প্রভাব:
প্রায় ৮০ বিলিয়ন ব্যারেল প্রমাণিত তেলের মজুদ নিয়ে নবম স্থানে রয়েছে রাশিয়া। সাইবেরিয়া ও অন্যান্য বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দেশটির তেলক্ষেত্র ছড়িয়ে রয়েছে। তেল ও গ্যাস রাশিয়ার অর্থনীতি, সরকারি রাজস্ব এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্যিক সীমাবদ্ধতার কারণে রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানির বাজারে পরিবর্তন এসেছে। দেশটি এশিয়ার বাজারে বিক্রি বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। তবে দীর্ঘ দূরত্বে পরিবহন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তেলশিল্পের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

১০. লিবিয়া: আফ্রিকার অন্যতম বড় তেলভান্ডার:
প্রায় ৪৮.৪ বিলিয়ন ব্যারেল প্রমাণিত তেলের মজুদ নিয়ে দশম স্থানে রয়েছে লিবিয়া। আফ্রিকার বৃহত্তম প্রমাণিত তেলের মজুদধারী দেশগুলোর মধ্যে লিবিয়া অন্যতম। দেশটির তেলক্ষেত্রের বড় অংশ সির্তে অববাহিকায় অবস্থিত এবং ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলের কাছাকাছি হওয়ায় ইউরোপের বাজারে তেল রপ্তানির ভৌগোলিক সুবিধা রয়েছে।

কিন্তু রাজনৈতিক বিভাজন, নিরাপত্তাসংকট এবং তেলক্ষেত্র ও বন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা দেশটির উৎপাদনে বারবার বিঘ্ন ঘটিয়েছে। স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে লিবিয়ার তেলশিল্প আরও বেশি আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।

মজুদই শেষ কথা নয়:
বিশ্বের শীর্ষ ১০ তেল মজুদকারী দেশের তালিকা দেখায়, ভূগর্ভস্থ সম্পদ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও রাজনীতিতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভেনেজুয়েলার বিপুল মজুদ এবং সৌদি আরবের উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতার মধ্যে পার্থক্যই প্রমাণ করে, তেলের সম্পদকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে শুধু মজুদ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, স্থিতিশীল নীতি, অবকাঠামো এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা।

একই সঙ্গে বিশ্ব যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক যান এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর দিকে এগোচ্ছে, তখন তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। ভবিষ্যতে যারা তেলসম্পদ থেকে অর্জিত আয়কে শিল্প, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ করতে পারবে, তারাই দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকবে।

সূত্র: ওপেক (বার্ষিক রিপোর্ট ২০২৫)

Facebook Comments Box

Posted ০৮:১৪ অপরাহ্ণ | শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com