সজল সরকার
শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬ প্রিন্ট ১১ বার পঠিত
যুদ্ধের ক্ষতি শুধু প্রাণহানি, ঘরবাড়ি ধ্বংস কিংবা সামরিক স্থাপনা হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব পড়ে একটি দেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো, শিল্পকারখানা, জ্বালানি সরবরাহ, কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থায়। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বিনিয়োগ কমে যায়, কর্মসংস্থান সংকুচিত হয় এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়ে। কোনো কোনো দেশে পুনর্গঠনে কয়েক দশক লেগে যেতে পারে।
নিম্নে ক্ষতিগ্রস্থ শীর্ষ ১০ দেশের তালিকা দেওয়া হলো:
১. ইউক্রেন (পুনর্গঠনে প্রায় ৫৮৮ বিলিয়ন ডলার): রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণের পর ইউক্রেনের আবাসন, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও শিল্প অবকাঠামো ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে। বিশ্বব্যাংক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘ ও ইউক্রেন সরকারের ২০২৬ সালের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরাসরি ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৯৫.১ বিলিয়ন ডলার। আর আগামী ১০ বছরে পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনে প্রয়োজন হবে আনুমানিক ৫৮৭.৭ বিলিয়ন ডলার। দেশটির প্রায় ১৪ শতাংশ আবাসন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
২. সিরিয়া (অবকাঠামো পুনর্গঠনে ২১৬ বিলিয়ন ডলার): ২০১১ সালে শুরু হওয়া সংঘাত সিরিয়ার অর্থনীতি ও জনজীবনকে বিপর্যস্ত করেছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের মূল্যায়নে ২০১১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সংঘাতে দেশটির অবকাঠামো, আবাসিক ও অনাবাসিক ভবনের সরাসরি ক্ষতি ১০৮ বিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা পুনর্র্নিমাণে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২১৬ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে অবকাঠামো খাতে প্রায় ৮২ বিলিয়ন, আবাসিক ভবনে ৭৫ বিলিয়ন এবং অন্যান্য ভবনে ৫৯ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে।
৩. গাজা (ক্ষতি ও পুনর্গঠনে ৭১.৪ বিলিয়ন ডলার): ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে দুই বছর ধরে চলা সংঘাতে গাজার আবাসন, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মূল্যায়ন অনুযায়ী, গাজায় সরাসরি অবকাঠামোগত ক্ষতি ৩৫.২ বিলিয়ন ডলার এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি ২২.৭ বিলিয়ন ডলার। সব মিলিয়ে সংঘাতের প্রভাবের পরিমাণ ৫৭.৯ বিলিয়ন ডলার। আগামী ১০ বছরে পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনে প্রয়োজন হবে প্রায় ৭১.৪ বিলিয়ন ডলার।
৪. লিবিয়া (সংঘাতের অর্থনৈতিক ব্যয় ৫৭৬ বিলিয়ন ডলার): ২০১১ সাল থেকে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সশস্ত্র সংঘাত লিবিয়ার তেলনির্ভর অর্থনীতিকে বারবার বিপর্যস্ত করেছে। জাতিসংঘের পশ্চিম এশিয়াবিষয়ক অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের ২০২০ সালের হিসাব অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সংঘাতের মোট অর্থনৈতিক ব্যয় প্রায় ৫৭৬ বিলিয়ন ডলার। এ হিসাব কেবল ভবন বা অবকাঠামোর ক্ষতি নয়; উৎপাদন, বিনিয়োগ, আয় ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিও এতে অন্তর্ভুক্ত। তেল উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যাহত হওয়ায় সরকারের রাজস্ব এবং কর্মসংস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
৫. ইরাক (পুনর্গঠনে ৮৮.২ বিলিয়ন ডলার): ইসলামিক স্টেটের উত্থান এবং পরবর্তী সামরিক অভিযানে ইরাকের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে সংঘাতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত সাতটি প্রদেশে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪৫.৭ বিলিয়ন ডলার। ২০১৭ সাল পর্যন্ত তেলবহির্ভূত অর্থনীতিতে উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধির সম্ভাব্য ক্ষতি ছিল প্রায় ১০৭ বিলিয়ন ডলার। আর পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনে প্রয়োজন নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় ৮৮.২ বিলিয়ন ডলার। আবাসন, বিদ্যুৎ, তেল-গ্যাস, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত পুনর্গঠনের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
৬. লেবানন (অর্থনৈতিক ক্ষতি ১৪ বিলিয়ন ডলার): ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সংঘাত লেবাননের অর্থনীতি, পর্যটন, আবাসন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় আঘাত হানে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের মূল্যায়ন অনুযায়ী, সংঘাতের মোট অর্থনৈতিক ব্যয় ১৪ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ভবন ও অন্যান্য ভৌত সম্পদের ক্ষতি ৬.৮ বিলিয়ন ডলার এবং উৎপাদন কমে যাওয়া, আয় হারানো ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি ৭.২ বিলিয়ন ডলার। পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনে প্রয়োজন প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার। আবাসন খাতে ক্ষতির পরিমাণই প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন ডলার।
৭. ইয়েমেন (পুনর্গঠনে ২০-২৫ বিলিয়ন ডলার): দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ইয়েমেনের আবাসন, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পানি সরবরাহব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২০ সালের মূল্যায়নে নির্দিষ্ট কয়েকটি শহর ও অঞ্চলের নির্বাচিত খাতে পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনের প্রয়োজন ২০ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলার বলে অনুমান করা হয়। শুধু আবাসন খাতেই ক্ষতির পরিমাণ ৫.১ থেকে ৬.২ বিলিয়ন ডলার। স্বাস্থ্য খাতে ক্ষতি ৬০৫ থেকে ৭৪০ মিলিয়ন ডলার এবং বিদ্যুৎ খাতে ৪২২ থেকে ৫১৬ মিলিয়ন ডলার বলে হিসাব করা হয়। তবে মূল্যায়নটি পুরো দেশকে অন্তর্ভুক্ত করেনি; তাই প্রকৃত ক্ষতি আরও বেশি হতে পারে।
৮. ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর (গাজার বাইরেও অর্থনৈতিক চাপ): গাজার পাশাপাশি পশ্চিম তীরের অর্থনীতিও সংঘাত ও চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২০২৫ সালের অন্তর্বর্তী মূল্যায়নে গাজা ও পশ্চিম তীরের সামগ্রিক পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনের প্রয়োজন ৫৩ বিলিয়ন ডলার ধরা হয়েছিল। এর মধ্যে গাজার সরাসরি অবকাঠামোগত ক্ষতি ছিল প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি ১৯ বিলিয়ন ডলার। এই অঙ্কটি ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সময়ের মূল্যায়ন; এটি শুধু পশ্চিম তীরের ক্ষতির হিসাব নয়।
৯. মিয়ানমার (সংঘাত ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সম্মিলিত চাপ): ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারে সশস্ত্র সংঘাত, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং বিনিয়োগ সংকট অর্থনীতিকে দুর্বল করেছে। তবে দেশটির যুদ্ধজনিত মোট ক্ষয়ক্ষতির একটি হালনাগাদ, সর্বাঙ্গীণ আর্থিক হিসাব নির্ভরযোগ্যভাবে নির্ধারণ করা কঠিন। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক দেশভিত্তিক মূল্যায়নে অর্থনৈতিক উৎপাদন দুর্বল থাকা এবং ২০২৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের প্রভাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ভূমিকম্পে সরাসরি ক্ষতি প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলার হলেও সেটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি—যুদ্ধের ক্ষতির সঙ্গে এক করে দেখা যাবে না। এ কারণে মিয়ানমারের যুদ্ধজনিত ক্ষতির নির্দিষ্ট অঙ্ক এখানে দেওয়া যাচ্ছে না।
১০. সুদান (যুদ্ধের ক্ষতি বহুমাত্রিক, নির্ভরযোগ্য মোট অঙ্ক অনিশ্চিত): ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে সুদানে সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনীর সংঘাতে আবাসন, হাসপাতাল, বাজার, সড়ক ও উৎপাদনব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লাখো মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে এবং খাদ্য ও স্বাস্থ্যসংকট আরও গভীর হয়েছে। তবে সরাসরি অবকাঠামোগত ক্ষতি, হারানো উৎপাদন এবং ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের ব্যয় মিলিয়ে দেশটির জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ, সর্বজনস্বীকৃত মোট হিসাব নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে অনুমানভিত্তিক অঙ্ক না দিয়ে বলা যায়, সুদানের ক্ষতি শুধু ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থাপনায় সীমিত নয়; দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন, জীবিকা ও মানবসম্পদ হারানোর মূল্যও বিপুল।
সার্বিক সমীক্ষায় দেখা যায়, ইউক্রেন ও সিরিয়ার মতো দেশে পুনর্গঠনের ব্যয় শত শত বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। গাজা, লেবানন ও ইয়েমেনেও পুনরুদ্ধারের জন্য বিপুল অর্থ প্রয়োজন। তবে এসব অঙ্ক একই সময়সীমা বা একই পদ্ধতিতে হিসাব করা হয়নি। কোনোটি সরাসরি ক্ষতি, কোনোটি অর্থনৈতিক ক্ষতি, আবার কোনোটি ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের প্রয়োজন। তাই এগুলোকে এক থেকে দশ পর্যন্ত নির্ভুল ক্ষয়ক্ষতির র্যাঙ্কিং না ধরে যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্য বোঝার একটি তুলনামূলক চিত্র হিসেবে দেখা উচিত।
তথ্যসূত্র: জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংক রিপোর্ট
Posted ০৮:০৫ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com
✎ মন্তব্য করুন