নিজস্ব প্রতিবেদক
রবিবার, ১১ জানুয়ারি ২০২৬ প্রিন্ট ৩৪৬ বার পঠিত
ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) পিএলসিতে দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি সংঘবদ্ধ ঋণ জালিয়াতি চক্রের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ভুয়া পরিচয়, অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠান এবং জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে প্রায় ৪৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাতটি পৃথক মামলায় মোট ৯৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। এই কেলেঙ্কারি দেশের ব্যাংকিং খাতে নজিরবিহীন অনিয়ম ও অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির আরেকটি ভয়ংকর উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দুদকের চট্টগ্রাম-১ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে দায়ের করা মামলার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, গ্রামের কৃষক, দিনমজুর ও দর্জিদের মতো সাধারণ মানুষদের জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে তাদের নাম ব্যবহার করা হয়েছে তথাকথিত ব্যবসায়ী হিসেবে। এসব ব্যক্তির নামে ব্যাংকে চলতি হিসাব খোলা হয় এবং পরে সেই হিসাবের বিপরীতে কাগুজে ও অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে মোটা অঙ্কের ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়। বাস্তবে এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো অফিস, ব্যবসা বা কার্যক্রম কিছুই ছিল না। পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল পরিকল্পিত প্রতারণা। এই অনিয়মের সঙ্গে ইউসিবির একাধিক শাখার কর্মকর্তা সরাসরি জড়িত ছিলেন বলে দুদকের অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। চট্টগ্রামের চকবাজার, পাহাড়তলী, পোর্ট ও বহদ্দারহাট শাখায় একই কায়দায় হোছন ট্রেডিং, কর্ণফুলী এম্পোরিয়াম, জহির ইন্টারন্যাশনাল, ক্যাটস আই করপোরেশন, শাহ ট্রেডিং, হারুন অ্যান্ড সন্স এবং মল্লিক অ্যান্ড ব্রাদার্সের মতো নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে হিসাব খুলে ঋণ বিতরণ করা হয়। পরে সেই অর্থ বিভিন্ন হিসাবে স্থানান্তর করে নগদ উত্তোলনের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়।
দুদকের তদন্তে আরও বলা হয়েছে, ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা, শাখা ব্যবস্থাপক এবং ক্রেডিট ও অপারেশন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছাড়া এই ধরনের জালিয়াতি সম্ভব ছিল না। ভুয়া ট্রেড লাইসেন্স, জাল দলিল এবং মিথ্যা যাচাই প্রতিবেদনের মাধ্যমে ঋণ অনুমোদনের পুরো প্রক্রিয়াকে বৈধ দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এতে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যে কতটা দুর্বল ছিল, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি পাহাড়তলী শাখাকে ঘিরে। ওই শাখায় ‘শাহ ট্রেডিং’-এর নামে ৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ইউসিবির সাবেক ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, একাধিক শাখা প্রধান এবং ক্রেডিট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আসামি করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, মামলার এজাহারে ব্যাংকের সাবেক পরিচালক ও এক্সিকিউটিভ কমিটির চেয়ারম্যান আনিসুজ্জামান চৌধুরী রনি এবং সাবেক পরিচালক বশির আহমেদের সংশ্লিষ্টতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, প্রভাবশালী এই ব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নির্দেশনায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা থেকে একই কৌশলে ঋণ গ্রহণ করে অর্থ আত্মসাৎ ও পাচার করেছে। এই চক্র বছরের পর বছর ধরে সক্রিয় ছিল, অথচ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অডিট কিংবা নিয়ন্ত্রক নজরদারি তা সময়মতো শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। মামলাগুলোতে দণ্ডবিধির বিশ্বাসভঙ্গ, জালিয়াতি, প্রতারণা ও জাল দলিল ব্যবহারের একাধিক ধারার পাশাপাশি দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের কঠোর ধারাও যুক্ত করা হয়েছে। এতে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে, এটি শুধু একটি ঋণ অনিয়ম নয় বরং সুপরিকল্পিত আর্থিক অপরাধ ও অর্থপাচারের ঘটনা।
এই কেলেঙ্কারি ইউসিবি’র সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং পরিচালনা পর্ষদের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণ মানুষের পরিচয় ব্যবহার করে ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা লুটের ঘটনা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা নয়; এটি দেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও রাজনৈতিক-প্রশাসনিক প্রভাবের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। যথাযথ বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে এমন অপরাধ ভবিষ্যতেও থামবে না এমন আশঙ্কাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে আর্থিক খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
Posted ০৭:২৭ অপরাহ্ণ | রবিবার, ১১ জানুয়ারি ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com