বিশেষ প্রতিবেদক
শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রিন্ট ৭৩ বার পঠিত
ব্যাংকে আমদানি ঋণপত্র বা এলসি খুলতে হলে বীমার কভার নোটের জন্য ইউনিক আইডি বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা নিয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় আইডিআরএ প্রদত্ত ইউনিক কভার নোট আইডি ছাড়া এলসি খোলা যাবে না। বীমা কোম্পানিগুলোর জাল বা ভুয়া কভার নোটের ব্যবহার বন্ধ করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করেছে আইডিআরএ। প্রাথমিকভাবে প্রতি সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এলসি-সংক্রান্ত তথ্য আইডিআরএকে সরবরাহ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সম্প্রতি দৈনিক ব্যাংক বীমা অর্থনীতিকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য জানিয়েছেন আইডিআরএ চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নাসির আহমাদ রাসেল।
সাক্ষাৎকারে তিনি দেশের বীমা খাতের বর্তমান সংকট, গ্রাহকদের আস্থাহীনতা দূর করার পরিকল্পনা, বকেয়া দাবি পরিশোধ, ১০০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা এবং ভবিষ্যতের আধুনিক ও ডিজিটাল বীমা খাত গড়ে তোলার রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেন।
আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, ব্যাংকিং খাতের মতো বীমা খাতেও প্রতিটি পলিসির জন্য পৃথক ইউনিক পলিসিহোল্ডার আইডি চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে কোনো পলিসি বা সংশ্লিষ্ট তথ্য হিসাবের বাইরে কিংবা আড়ালে রাখার সুযোগ থাকবে না।
মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, আমদানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বীমার কভার নোট ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে জাল বা ভুয়া কভার নোটের ব্যবহার বন্ধ করতে একটি কার্যকর ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, আইডিআরএ থেকে দেওয়া ইউনিক কভার নোট আইডি ছাড়া ভবিষ্যতে এলসি খোলা যাবে না-এমন একটি ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি সপ্তাহে এলসি-সংক্রান্ত তথ্য আইডিআরএকে সরবরাহ করবে বলে জানান তিনি। এতে কোন এলসির বিপরীতে কোন বীমা কোম্পানি কভার দিয়েছে, সেই তথ্য যাচাই করা সহজ হবে। একই সঙ্গে জাল কভার নোট শনাক্ত এবং অনিয়ম প্রতিরোধে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা বাড়বে।
প্রতিটি পলিসির জন্য ইউনিক আইডি:
গ্রাহক সুরক্ষায় বীমা খাতকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, ব্যাংকিং খাতের মতো বীমা খাতেও প্রতিটি পলিসির জন্য একটি নির্দিষ্ট ইউনিক আইডি চালুর চিন্তা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এর মাধ্যমে কোনো পলিসি হিসাবের বাইরে থাকবে না। একটি কেন্দ্রীয় ও ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় পলিসির তথ্য সংরক্ষণ করা গেলে গ্রাহক, কোম্পানি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা-সব পক্ষের জন্য তথ্য যাচাই করা সহজ হবে।
তার মতে, বীমা খাতে স্বচ্ছতা ও গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনতে প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি।
দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির তুলনায় বীমা খাতের অগ্রগতি কেমন-এমন প্রশ্নের জবাবে মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, দেশের অর্থনীতির আকার যেভাবে বাড়ছে, বীমা খাত সেই তুলনায় আশানুরূপ এগোতে পারেনি।
তিনি বলেন, “এই খাতের পিছিয়ে পড়ার পেছনে মূল কারণ হলো গ্রাহকদের আস্থার অভাব। দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও অস্বচ্ছতার কারণে সাধারণ মানুষ বীমার ওপর পুরোপুরি ভরসা রাখতে পারছেন না। এই আস্থার সংকট কাটানোই আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।”
বর্তমান সংকট মোকাবিলায় আইডিআরএ একটি সুনির্দিষ্ট ১০০ দিনের বিশেষ পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছে বলেও জানান চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, এই পরিকল্পনায় সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে গ্রাহকদের বকেয়া বীমা দাবি পরিশোধে। যেসব কোম্পানিতে বিপুল পরিমাণ দাবি দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে, তাদের মালিকপক্ষ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে ডেকে দ্রুত দাবি নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, “গ্রাহকের টাকা বা দাবি দীর্ঘদিন আটকে থাকবে, এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বীমা খাতের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে দাবি পরিশোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।”
বদলাচ্ছে তদারকির পদ্ধতি:
প্রচলিত কমপ্লায়েন্সভিত্তিক তদারকির পরিবর্তে বীমা কোম্পানিগুলোর ওপর ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি বা রিস্ক-বেইজড সুপারভিশন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান আইডিআরএ চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, বর্তমানে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে যেসব আর্থিক প্রতিবেদন আসে, সেগুলোর অনেকগুলোই পুরোনো তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। ফলে কোম্পানির প্রকৃত ও বর্তমান আর্থিক অবস্থা দ্রুত বোঝা যায় না।
নতুন পদ্ধতিতে নিয়মিত ও হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে বীমা কোম্পানিগুলোর ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হবে। এর ফলে কোনো কোম্পানির আর্থিক দুর্বলতা, অনিয়ম বা গ্রাহকস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
নন-লাইফ বীমা খাতে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ বকেয়া দাবি দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান মীর নাদিয়া নিভিন।
পাশাপাশি পুনর্বীমা খাতের বিদ্যমান দুর্বলতা কাটিয়ে একটি স্বাস্থ্যকর ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ গড়ে তোলার কাজ চলছে।
তিনি বলেন, “আমি মনে করি, রিইনস্যুরেন্স পুরোপুরি ওপেন হওয়া উচিত। ”
তার মতে, পুনর্বীমা ব্যবস্থায় আরও প্রতিযোগিতা ও সক্ষমতা বাড়ানো গেলে বীমা খাতের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি ও এনবিআরের সঙ্গে সমন্বয়:
বীমা খাতের সুশাসন নিশ্চিত করতে এককভাবে কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয় বলেও মনে করেন আইডিআরএ চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), আইডিআরএ এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মধ্যে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক সমন্বয় গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে।
তার মতে, আর্থিক খাতের বিভিন্ন অংশ পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। ফলে একটি শক্তিশালী ও সুশৃঙ্খল আর্থিক বাজার গড়ে তুলতে সব নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে নিয়মিত তথ্য বিনিময় ও সমন্বয় প্রয়োজন।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ উল্লেখ করে মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, ভবিষ্যতের জলবায়ুজনিত ক্ষতি মোকাবিলায় নতুন ধরনের বীমা পণ্য চালুর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্যারামেট্রিক বীমা, তাপপ্রবাহভিত্তিক বীমা চালুর বিষয়ে গবেষণা ও পাইলট প্রকল্প চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অতিবৃষ্টি ও তাপপ্রবাহের মতো দুর্যোগের অর্থনৈতিক ক্ষতি বাড়ছে। এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রচলিত বীমার পাশাপাশি দ্রুত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার উপযোগী নতুন বীমা পণ্য প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
দেশের প্রান্তিক ও নিম্নআয়ের মানুষের কাছে বীমা সেবা পৌঁছে দিতে ক্ষুদ্র বীমা বা মাইক্রো-ইনস্যুরেন্সকে জনপ্রিয় করার পরিকল্পনার কথাও জানান আইডিআরএ চেয়ারম্যান।
তার মতে, সাধারণ মানুষের জন্য বীমা সেবা সহজলভ্য, সাশ্রয়ী এবং জনবান্ধব করতে পারলে বীমার পরিধি বাড়বে। একই সঙ্গে বীমা খাত দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও সামাজিক সুরক্ষায় আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।
মীর নাদিয়া নিভিনের মতে, বীমা খাতের সবচেয়ে বড় কাজ এখন মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। আর সে লক্ষ্যেই দাবি পরিশোধ, ডিজিটালাইজেশন, ইউনিক আইডি ব্যবস্থা, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি এবং বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের মতো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তার ভাষায়, একটি স্বচ্ছ, আধুনিক ও গ্রাহকবান্ধব বীমা খাত গড়ে তোলাই এখন আইডিআরএর মূল লক্ষ্য।
Posted ০৯:০৪ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com