নিজস্ব প্রতিবেদক
মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬ প্রিন্ট ৩৩ বার পঠিত
লোকসান, ঋণের মানের অবনতি, মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি এবং অতীতের ঋণ কেলেঙ্কারি নিয়ে একের পর এক প্রশ্নের মুখে রয়েছে আইএফআইসি ব্যাংক পিএলসি। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকটির মনোনীত চেয়ারম্যান মো. মেহমুদ হুসেইনকে পুনর্নির্বাচিত করা ও দুদকের মামলার আসামি বর্তমান এমডি সৈয়দ মনসুর মোস্তফার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
চেয়ারম্যান মেহমুদ হুসেইনকে নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ:
ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান মেহমুদ হুসেইনের বিরুদ্ধে বিদেশ সফরে অতিরিক্ত ব্যয়, পরিচালকদের সম্মানী গ্রহণ এবং ব্যাংকের নির্বাহী কর্মকান্ডে হস্তক্ষেপের অভিযোগ নিয়ে গত জুলাইয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনের বরাতে বলা হয়, যুক্তরাজ্যভিত্তিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান আইএফআইসি মানি ট্রান্সফার (ইউকে) লিমিটেডের বোর্ড ও অন্যান্য সভায় অংশ নিতে ২০১১ সাল থেকে ব্যাংকের প্রায় ৯ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। অথচ প্রতিষ্ঠানটি ওই সময়ের মধ্যে দেশে কোনো লভ্যাংশ পাঠাতে পারেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া তদন্ত কমিটি ও নিয়োগ-সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়ার জন্য পরিচালকদের দেওয়া ৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা সম্মানী এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার বিপরীতে সম্মানী প্রদান নিয়েও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আপত্তির কথা উঠে আসে। ব্যাংকের দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনায় চেয়ারম্যানের ভূমিকা এবং কিছু নিয়োগের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মেহমুদ হুসেইন তার বিরুদ্ধে ওঠা বিষয়গুলো পুনঃতদন্তের জন্য গভর্নর বরাবর আবার আবেদন করেন ২০ আগস্ট। সেই পুনঃতদন্ত হওয়ার আগেই গত ১ অক্টোবর ব্যাংকটির ৯৮৬তম পরিচালনা পর্ষদ সভায় মেহমুদ হুসেইনকে চেয়ারম্যান হিসেবে পুনর্নির্রাচিত করা হয়। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মেহমুদ হুসেইনকে ফোন করলে তিনি ফোন ধরেননি এবং ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও তার কোনো উত্তর দেননি।
দুদকের মামলার আসামি বর্তমান এমডি সৈয়দ মনসুর মোস্তফা:
একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠানের নামে ৫৪৫ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন এবং সেই অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, তার ছেলে আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমানসহ ২৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), যা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, স্কাইমার্ক ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের নামে তিন দফায় ঋণ অনুমোদন করে এর মধ্যে ৫৩৮ কোটি ১৬ লাখ ২৪ হাজার ৪৮২ টাকা বিতরণ বা উত্তোলন করা হয়। ব্যাংকিং আইন অমান্য করে এক দিনেই সর্বোচ্চ ২৩০ কোটি টাকা উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে। এ আসামির তালিকায় রয়েছেন আইএফআইসি ব্যাংকের তৎকালীন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) ও বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সৈয়দ মনসুর মোস্তফা। এমন বিতর্কিত কর্মকান্ড নিয়েও তিনি এখন এমডি হিসেবে আছেন কোন খুঁটির জোরে, তা অনেকের কাছেই প্রশ্ন। এ বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য সৈয়দ মনসুর মোস্তফাকে ফোন ও এসএমএস করলেও কোনো সাড়া মেলেনি।
লোকসান বাড়ছেই, সম্পদের মান নিয়ে উদ্বেগ:
ব্যাংকটির প্রকাশিত আর্থিক তথ্যেও উদ্বেগের চিত্র পাওয়া যায়। ২০২৫ সালে নিট লোকসানের কারণে শেয়ারপ্রতি আয় ঋণাত্মক হয়ে পড়ে। একই বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীতে ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় সংস্থান, মূলধন পর্যাপ্ততা এবং অন্যান্য আর্থিক ঝুঁকি নিয়ে নিরীক্ষকের বিশেষ পর্যবেক্ষণ উঠে আসে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেও লোকসানের প্রবণতা অব্যাহত ছিল। ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি-জুন সময়ে সমন্বিত শেয়ারপ্রতি লোকসান দাঁড়ায় ৮ টাকা ৬৮ পয়সা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৫ টাকা ৮৭ পয়সা। অর্থাৎ লোকসান কমার পরিবর্তে বেড়েছে।
ব্যাংকটির ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ওই বছর সমন্বিত শেয়ারপ্রতি লোকসান ছিল ১৩ টাকা ৩২ পয়সা। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, সম্পদের মানের অবনতির কারণে নিট লোকসান হয়েছে। ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকেও লোকসান অব্যাহত থাকার তথ্য পাওয়া যায়। পাশাপাশি জুন শেষে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এসব সূচক ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি ও ভবিষ্যৎ মুনাফা অর্জনের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
ব্যাংকটির আর্থিক দুর্বলতার আরেকটি দিক হলো খেলাপি ঋণ ও ঋণের বিপরীতে সংস্থান ঘাটতি। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আইএফআইসি ব্যাংকের ঋণের ৬০ শতাংশের বেশি খেলাপি হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে ঋণ আদায়, নতুন ঋণ বিতরণ এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় ব্যাংকটির সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্য:
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, যেহেতু বর্তমান এমডি সৈয়দ মনসুর মোস্তফা পূর্বে ডিএমডি থাকাকালীন আর্থিক কেলেঙ্কারির দায়ে দুদকের মামলার আসামি, তাই এ দায় তিনি এড়াতে পারেন না, কারণ তখনও তিনি উচ্চ পদেই আসীন ছিলেন। প্রচলিত আইনেই তাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। চেয়ারম্যান মেহমুদ হুসেইনের বিরুদ্ধে বিদেশ সফরে অতিরিক্ত ব্যয়, পরিচালকদের সম্মানী গ্রহণ এবং ব্যাংকের নির্বাহী কর্মকান্ডে হস্তক্ষেপের অভিযোগ ও আবারও চেয়ারম্যান হিসেবে পুনর্নির্বাচিত করার বিষয়ে তিনি বলেন, বোর্ডই তাকে সব কর্মকাণ্ডের বৈধতা দিয়েছে, যেহেতু বোর্ডের অনুমোদন নিয়েই সব হয়েছে। যদি নিয়মবহির্ভূত কিছু হয়ে থাকে, তাহলে বোর্ড এর জন্য দায়ী হবে। তিনি আরও বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে আইএফআইসি ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ করা আছে। নিয়ম অনুযায়ী পর্যবেক্ষক অভ্যন্তরীণ বিষয়াদি দেখবেন এবং পর্যালোচনা করবেন। যদি কোনো ব্যবস্থা নিতে হয়, তাহলে পরবর্তীতে তা করা হতে পারে।
সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য আইএফআইসি ব্যাংকের জনসংযোগ বিভাগে যোগাযোগ করলে জনসংযোগ কর্মকর্তা এহতেসাম ইমাম এবং ব্র্যান্ডিং কমিউনিকেশনস এন্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স প্রধান খন্দকার আনোয়ার এহতেসাম লিখিত প্রশ্ন চান এবং তার উত্তর যত দ্রুত সম্ভব দেবেন বলে জানান। সে মোতাবেক ‘ব্যাংক বীমা অর্থনীতি’র প্রতিবেদক লিখিত প্রশ্ন পাঠানোর দুদিন অতিবাহিত হলেও তাঁরা কোনো উত্তর বা ব্যাখ্যা দেননি।
Posted ০৮:১০ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com