|

Advertisement
×

ছাদে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ, বিনিয়োগ বাড়াতে প্রথমবার সরকারি সোলার এক্সপো

সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬   প্রিন্ট   ৬ বার পঠিত

ছাদে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ, বিনিয়োগ বাড়াতে প্রথমবার সরকারি সোলার এক্সপো

দেশে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ও ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং এ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে প্রথমবারের মতো সরকারি উদ্যোগে আয়োজন করা হচ্ছে দুই দিনব্যাপী ‘সোলার এক্সপো ২০২৬’। আগামী ৩ ও ৪ নভেম্বর রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে এ প্রদর্শনী। এর মাধ্যমে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা ও আধুনিক প্রযুক্তি সম্পর্কে জনগণকে ধারণা দেওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে চায় সরকার।

গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এসব তথ্য জানান। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের (ইডকল) যৌথ উদ্যোগে এ এক্সপোর আয়োজন করা হচ্ছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের।

সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সময়ে সৌরবিদ্যুৎবিষয়ক প্রদর্শনীর আয়োজন করলেও সরকারি উদ্যোগে দেশে এবারই প্রথম এ ধরনের এক্সপো অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষের কাছে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের বার্তা পৌঁছে দিতে চায় সরকার।

তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ইতোমধ্যে অফগ্রিড ব্যবস্থায় নেওয়া হয়েছে। সেখানে প্রচলিত গ্রিডের বিদ্যুতের পরিবর্তে সম্পূর্ণ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই এ উদ্যোগের সূচনা করেছেন। জনগণের সহযোগিতা পাওয়া গেলে এ ধরনের উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।

বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে সৌরশক্তি ভবিষ্যতে কতটা ভূমিকা রাখতে পারবে, এমন প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান কমিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ একটি দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি হলেও তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হচ্ছে আগামী গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম নেওয়া হচ্ছে।

এবারের এক্সপোর প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘প্রতি ইঞ্চি ছাদ কাজে লাগাই, সৌরবিদ্যুতে আয় বাড়াই’। প্রদর্শনীতে সৌরপ্রযুক্তির সর্বশেষ উদ্ভাবন, সরকারি নীতিগত উদ্যোগ এবং বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরা হবে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের বিভিন্ন অংশীজনের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

এক্সপোতে সৌর প্যানেল, ইনভার্টার, স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তি এবং আধুনিক ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা প্রদর্শন করা হবে। পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থায়ন, সহজ শর্তে ঋণ এবং কারিগরি সহায়তার সুযোগ তুলে ধরবে দেশের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, প্রকল্প উন্নয়নকারী ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান। দুই দিনের আয়োজনের অংশ হিসেবে সৌরবিদ্যুৎ খাতের কৌশলগত উন্নয়ন, নীতিগত পরিবেশ এবং বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে একাধিক সেমিনারও অনুষ্ঠিত হবে।

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম, ইডকলের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম মনিরুল ইসলামসহ বিভিন্ন বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকার প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করেছে ১০ টাকা ৫০ পয়সা। এ দরে আগামী তিন বছর পর্যন্ত উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরকারের কাছে বিক্রি করতে পারবেন। তবে তিন বছর পর এ মূল্য কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, তা নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মিনারা মাহরুখ।

তিনি জানান, ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থার ব্যয় বিবেচনায় নিয়েই সৌরবিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যাটারি ছাড়া ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ইউনিট খরচ পড়ে ৩ থেকে ৪ টাকা। তবে বিদ্যুতের প্রয়োজন অনুযায়ী এক, দুই, ছয় কিংবা আট ঘণ্টার ব্যাটারি ব্যাকআপের ব্যবস্থা রাখা যায়। চার থেকে ছয় ঘণ্টার ব্যাটারি সংরক্ষণ সুবিধাসহ প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হয় প্রায় ৮ টাকা। এর সঙ্গে ২০ শতাংশ মুনাফা এবং ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রিমিয়াম যুক্ত করে বর্তমান মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

সচিব আরও জানান, নির্ধারিত এ মূল্য তিন বছরের জন্য কার্যকর থাকবে। বর্তমানে প্রতি ইউনিটের দাম ১০ টাকা ৯ পয়সা। তিন বছর পর তা পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। তবে সরকারের ধারণা, তখন দাম সাড়ে ১০ টাকার নিচে নামার সম্ভাবনা নেই; বরং বাড়তে পারে। এ কর্মসূচি অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেললে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকির চাপ কমবে। সে ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে সৌরবিদ্যুতের ক্রয়মূল্য বাড়ানোর সুযোগও থাকতে পারে।

সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে নীতিগত ও প্রশাসনিক বাধা কমাতেও বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এরই মধ্যে জারি করা হয়েছে ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ অধ্যাদেশ, ২০২৬’। নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন ও ব্যবহার বৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করতে প্রণয়ন করা হয়েছে ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৬-৩০’।

এ ছাড়া নেট মিটারিং ব্যবস্থার আওতায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে উৎপাদিত উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে কেনার বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে বাড়ি, বাণিজ্যিক ভবন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনে আগ্রহ বাড়বে বলে আশা করছে সরকার।

বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ছাদে নিজস্ব বিনিয়োগ ছাড়াই তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সৌর প্যানেল স্থাপনের অপারেশনাল এক্সপেন্ডিচার বা ওপেক্স মডেল উৎসাহিত করা হচ্ছে। এ ব্যবস্থায় তৃতীয় পক্ষ বিনিয়োগ করে সৌর প্যানেল স্থাপন ও পরিচালনা করবে।

পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারিসংশ্লিষ্ট পণ্যের আমদানি শুল্ক কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে। এসব পণ্যের ওপর মূল্য সংযোজন কর বা মূসকও পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানো, ছাদভিত্তিক প্রকল্প সম্প্রসারণ এবং বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণে একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে এসব পরিকল্পনার বাস্তব সুফল নির্ভর করবে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ, প্রযুক্তির সহজলভ্যতা, অর্থায়নের সুযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ কেনার নিশ্চয়তার ওপর।

Facebook Comments Box
✎ মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Posted ১২:০০ অপরাহ্ণ | সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com