অনলাইন ডেস্ক
বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬ প্রিন্ট ১৩ বার পঠিত
ঢাকায় পানগাঁও ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনালে (পিআইসিটি) কনটেইনার পরিবহন বাড়তে থাকায় টার্মিনালটির সক্ষমতা বাড়াতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (চবক)। দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যাশিত মাত্রায় আমদানি-রপ্তানি পণ্য আকর্ষণ করতে না পারা টার্মিনালটির অব্যবহৃত ২২ একর জমিতে নতুন কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং সুবিধা গড়ে তুলতে বেসরকারি বিনিয়োগ চাওয়া হয়েছে।
এ লক্ষ্যে গত ২২ সেপ্টেম্বর দরপত্র আহ্বান করেছে চবক। দরপত্র অনুযায়ী, নির্বাচিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ২২ বছর মেয়াদে ওই জমিতে কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিং সুবিধা নির্মাণ, উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিচালনার দায়িত্ব পাবে।
চবক সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, অব্যবহৃত জমির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চবকের কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যমান টার্মিনালের পাশাপাশি ২২ একর জমিতে নতুন সুবিধা চালু হলে পানগাঁওয়ে নদীপথে কনটেইনার পরিবহনের সক্ষমতা বাড়বে। এতে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে পণ্য পরিবহনে সড়কপথের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
দীর্ঘদিন কম ব্যবহৃত হওয়ার পর চলতি বছর পানগাঁও টার্মিনালে কনটেইনার পরিবহনে গতি দেখা দিয়েছে। ২০২৪ সালে টার্মিনালটিতে মাসে গড়ে ২৪২ টিইইউ এবং ২০২৫ সালে ৩৬৬ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছিল। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত সাত মাসে তা বেড়ে মাসে প্রায় ৯০০ টিইইউতে দাঁড়িয়েছে।
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান মেডলগের ব্যবস্থাপনায় টার্মিনালের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর এ প্রবৃদ্ধি দেখা যায়। মেডলগ বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেড ১৭ জানুয়ারি পানগাঁও টার্মিনালের পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বরে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ২২ বছরের কনসেশন চুক্তি হয়।
মেডলগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ মে থেকে পানগাঁও রিভার টার্মিনাল পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যক্রম শুরু করে। প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের মধ্যে সরাসরি বার্জসেবা চালুর মাধ্যমে সড়কপথের যানজট এড়িয়ে কনটেইনার পরিবহনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। মেডলগের ব্যবস্থাপনায় আমদানি ও রপ্তানি—দুই ধরনের কনটেইনার পরিবহনই বাড়ছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ টি এম আনিসুল মিল্লাতের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জুনের মধ্যেই পানগাঁও দিয়ে কনটেইনার পরিবহন আগের পুরো বছরের মোট ৪ হাজার ৪০০ টিইইউ হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ ছাড়িয়ে যায়।
বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে কেরানীগঞ্জে ২০১৩ সালে পানগাঁও ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) যৌথভাবে প্রায় ১৫৪ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও রেলপথে পণ্য পরিবহনের চাপ কমিয়ে নদীপথে কনটেইনার পরিবহন বাড়ানোই ছিল প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য।
টার্মিনাল নির্মাণের জন্য বিআইডব্লিউটিএর কাছ থেকে মোট ৪৮ দশমিক ২৪ একর জমি ইজারা নেয় চবক। এর মধ্যে বর্তমানে মেডলগ পরিচালিত টার্মিনালটি প্রায় ২৬ একর জমির ওপর রয়েছে। বাকি ২২ একর জমি এতদিন অব্যবহৃত ছিল।
চবকের নতুন দরপত্রের আওতায় ওই ২২ একর জমিতেই কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের নতুন সুবিধা গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
নতুন প্রকল্পের জন্য আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর যোগ্যতার ক্ষেত্রেও কঠোর শর্ত রাখা হয়েছে।
দরপত্র অনুযায়ী, আবেদনকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা তাদের মূল বা হোল্ডিং কোম্পানির জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর কাজে কমপক্ষে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
এ ছাড়া নিজস্ব যন্ত্রপাতি ও জনবল ব্যবহার করে কনটেইনার ও কনটেইনারাইজড কার্গো হ্যান্ডলিং, সংরক্ষণ এবং সরবরাহের অভিজ্ঞতাও থাকতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলোর একটি হলো—বাংলাদেশ বা বিদেশের কোনো ইনল্যান্ড নদী টার্মিনাল কিংবা নদীবন্দরে বছরে অন্তত ৭০ হাজার টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা বা অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
অর্থাৎ, শুধু জমি উন্নয়ন বা অবকাঠামো নির্মাণে অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠান নয়, আন্তর্জাতিক মানের কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে—এমন বিনিয়োগকারী খুঁজছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
পানগাঁও টার্মিনাল নির্মাণের পর থেকেই প্রত্যাশা ছিল, এটি ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। কিন্তু উচ্চ নৌপথ পরিবহন ব্যয়, দীর্ঘ কাস্টমস প্রক্রিয়া এবং অন্যান্য লজিস্টিক জটিলতার কারণে ব্যবসায়ীরা টার্মিনালটি ব্যবহারে খুব বেশি আগ্রহ দেখাননি।
ফলে দীর্ঘ সময় টার্মিনালটির বড় অংশের সক্ষমতা অব্যবহৃত থেকে যায় এবং প্রতিষ্ঠানটি লোকসানের মুখে পড়ে। মেডলগকে দায়িত্ব দেওয়ার সময়ও সরকারি পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, দক্ষ ও পেশাদার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দীর্ঘদিন লোকসানে থাকা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোটিকে কার্যকর ও লাভজনক করার লক্ষ্য রয়েছে।
নতুন করে বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির উদ্যোগ সেই পুনরুজ্জীবন প্রক্রিয়ারই পরবর্তী ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পানগাঁওয়ের বর্তমান পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান মেডলগ বাংলাদেশও ২২ একর জমির উন্নয়ন ও পরিচালনার জন্য দরপত্রে অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ টি এম আনিসুল মিল্লাত বলেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নেবে এবং পানগাঁওয়ে আরও সুবিধা সম্প্রসারণে আগ্রহী।
মেডলগ ইতোমধ্যে টার্মিনালে নতুন ধরনের কার্গো সেবা যুক্ত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, শিগগিরই ডেঞ্জারাস গুডস বা ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যবাহী কনটেইনার পরিচালনার ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি তুলাবাহী কনটেইনার সংরক্ষণের সুবিধাও চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
পানগাঁওয়ের সম্প্রসারণ শুধু একটি টার্মিনালের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নয়; এর সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথে কনটেইনার পরিবহনের সম্ভাবনাও জড়িত।
বর্তমানে ঢাকা-চট্টগ্রাম বাণিজ্য করিডোরে বিপুল পরিমাণ পণ্য সড়কপথে পরিবহন করা হয়। এর ফলে মহাসড়কে যানজট ও পরিবহন ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়। পানগাঁওয়ের মতো ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনালগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেলে নদীপথে তুলনামূলক বড় পরিমাণ পণ্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে পানগাঁওয়ের সামনে এখনও কয়েকটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রতিযোগিতামূলক পরিবহন ব্যয় নিশ্চিত করা, কাস্টমস ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা দ্রুত সম্পন্ন করা, নিয়মিত বার্জসেবা নিশ্চিত করা এবং রপ্তানিকারক ও আমদানিকারকদের আস্থা অর্জন—এসব বিষয়ই টার্মিনালের ভবিষ্যৎ সাফল্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন ২২ একর জমিতে বেসরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে অতিরিক্ত অবকাঠামো গড়ে উঠলে পানগাঁওয়ের সেই সক্ষমতা আরও বাড়তে পারে। ফলে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থাকা জমি যেমন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আসবে, তেমনি ঢাকা-চট্টগ্রাম বাণিজ্যপথে নদীপথের ব্যবহার বাড়ানোরও নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
Posted ১২:৫৮ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | Animator Alif
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com