অনলাইন ডেস্ক
বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬ প্রিন্ট ১৩ বার পঠিত
বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) তালিকা থেকে উত্তরণের নির্ধারিত সময় ২৪ নভেম্বর ২০২৬। তবে উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে জাতিসংঘে আলোচনা চলছে। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন GSP কাঠামোর আওতায় উত্তরণের পরও বাংলাদেশ অন্তত ২০২৯ সালের শেষ পর্যন্ত ‘Everything But Arms’ সুবিধা ধরে রাখার সুযোগ পেতে পারে। ফলে কিছুটা সময় পাওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার প্রস্তুতি এখনই জরুরি।
বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে প্রচলিত শুল্কহার কমিয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন ধরনের প্যারাট্যারিফ ও অতিরিক্ত শুল্ক এখনো অনেক পণ্যে উচ্চমাত্রার সুরক্ষা তৈরি করে রেখেছে। এর ফলে আমদানি করা কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও মধ্যবর্তী পণ্যের ব্যয় বেড়ে যায়।
অন্যদিকে চূড়ান্ত পণ্যে তুলনামূলক বেশি সুরক্ষা থাকলে দেশীয় বাজারে উৎপাদন করাই অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য সহজ হয়ে ওঠে। কিন্তু রপ্তানি করতে হলে একই প্রতিষ্ঠানকে আন্তর্জাতিক দামে পণ্য বিক্রি, কঠোর মানদণ্ড পূরণ এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হয়। এতে উৎপাদনশীলতা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের চাপও বাড়ে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত এই ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। রপ্তানিকারকরা শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুবিধাসহ বিশেষ ধরনের বন্ডেড সুবিধা পেয়েছে। এর ফলে তারা বড় পরিসরে উৎপাদন করতে পেরেছে, আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এবং তুলনামূলক কম শ্রম ব্যয়কে কাজে লাগিয়ে বিশ্ববাজারে অবস্থান তৈরি করেছে।
কিন্তু একই ধরনের সুবিধা চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ওষুধ, ইলেকট্রনিকসসহ সম্ভাবনাময় অন্যান্য খাতে সমানভাবে বিস্তৃত হয়নি।
ফলে এসব খাতকে শুধু ‘রপ্তানির সম্ভাবনাময় খাত’ হিসেবে চিহ্নিত করলেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। উচ্চ পরিবহন ও লজিস্টিক ব্যয়, বাণিজ্য অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, মান পরীক্ষার অবকাঠামোর ঘাটতি এবং নিয়ন্ত্রক জটিলতার পাশাপাশি শুল্ক কাঠামোর বৈষম্যও তাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে সীমিত করছে।
বাণিজ্য সুরক্ষা নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সুবিধা ও ব্যয় সমানভাবে দৃশ্যমান নয়। একটি সুরক্ষিত শিল্প সরাসরি বেশি মুনাফা বা কম প্রতিযোগিতার সুবিধা পেতে পারে। ফলে সংশ্লিষ্ট শিল্পের জন্য সুরক্ষা ধরে রাখার প্রবল প্রণোদনা থাকে।
অন্যদিকে ভোক্তাকে বেশি দাম দিতে হয়, কাঁচামালনির্ভর অন্যান্য শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে এবং সম্ভাবনাময় রপ্তানিকারকরা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারাতে পারেন। এসব ক্ষতি সমাজের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ায় তাদের পক্ষে নীতিনির্ধারণে একই ধরনের প্রভাব তৈরি করা কঠিন।
নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নতুন শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া যৌক্তিক হতে পারে। তবে সেই সুরক্ষার সঙ্গে উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ, রপ্তানি বা প্রযুক্তি উন্নয়নের মতো নির্দিষ্ট কর্মদক্ষতার শর্ত না থাকলে সাময়িক সুবিধাই দীর্ঘমেয়াদি অধিকার হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের বাণিজ্য সংস্কারের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজস্ব কাঠামো। দীর্ঘদিন ধরে আমদানি পর্যায়ে শুল্ক ও কর আদায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব সংগ্রহের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এখানেই তৈরি হচ্ছে নীতিগত দ্বন্দ্ব। একদিকে রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়াতে আমদানি করা কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক কমানো প্রয়োজন। অন্যদিকে সীমান্ত পর্যায়ের শুল্ক কমালে সরকারের রাজস্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য দেশের অভ্যন্তরীণ করভিত্তি সম্প্রসারণ, ভ্যাট ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, অপ্রয়োজনীয় কর অব্যাহতি কমানো এবং প্রত্যক্ষ কর আদায় বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে শুল্ক সংস্কারের প্রতিটি উদ্যোগই রাজস্ব ঘাটতির যুক্তিতে বাধার মুখে পড়তে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সাম্প্রতিক সময়ে নিজেদের শিল্পকে সুরক্ষা দিতে নানা ধরনের শুল্ক ও বাণিজ্য ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। ফলে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে দেশীয় বাজারে সুরক্ষা কমানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক।
তবে অন্য দেশ সুরক্ষাবাদী নীতি গ্রহণ করছে—এটি বাংলাদেশের নিজস্ব বাণিজ্য কাঠামোর দুর্বলতা ধরে রাখার একমাত্র যুক্তি হতে পারে না। বরং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা বাড়ার পরিস্থিতিতে দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে উৎপাদনশীল, প্রযুক্তিনির্ভর ও রপ্তানিমুখী করে তোলার প্রয়োজন আরও বাড়ে।
জাপান-বাংলাদেশ Economic Partnership Agreement (EPA), যা ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত হয়েছে, বাংলাদেশের জন্য পারস্পরিক বাণিজ্য কাঠামোর দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু কোনো বাণিজ্য চুক্তি নিজে থেকেই রপ্তানি বাড়াতে পারে না।
বন্দর ব্যবস্থাপনা, কাস্টমস প্রক্রিয়া, পণ্যের মান পরীক্ষার সক্ষমতা, জ্বালানি সরবরাহ, লজিস্টিক ব্যয় এবং Rules of Origin মেনে চলার সক্ষমতা উন্নত না হলে শুল্ক সুবিধা থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠান তা কাজে লাগাতে পারবে না।
একইভাবে, RCEP-এ বাংলাদেশের সম্ভাব্য অন্তর্ভুক্তি এশিয়ার আঞ্চলিক উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এর ফলে দেশীয় সুরক্ষিত শিল্পগুলোকে আরও শক্তিশালী আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে। তাই এর আগে শুল্ক কাঠামো, কাস্টমস, মান নিয়ন্ত্রণ এবং শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতির পরবর্তী পর্যায়ের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সুরক্ষা ধরে রাখা নয়, বরং প্রতিযোগিতা সক্ষমতা তৈরি করা। এ জন্য—
বাংলাদেশের সামনে এখন মূল প্রশ্ন শুধু কতটা শুল্ক কমানো হবে তা নয়; বরং কীভাবে এমন একটি বাণিজ্য কাঠামো তৈরি করা যায়, যেখানে দেশীয় প্রতিষ্ঠান সুরক্ষার ওপর নির্ভর না করে উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বড় হবে।
LDC উত্তরণ ও বৈশ্বিক বাজারের পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য এই সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করেছে। রপ্তানি বহুমুখীকরণ সফল করতে হলে নীতিগত সুবিধা কেবল প্রতিষ্ঠিত খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সম্ভাবনাময় নতুন রপ্তানি খাতগুলোর প্রতিযোগিতা সক্ষমতা তৈরিতে ব্যবহার করতে হবে।
Posted ১২:২০ অপরাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | Animator Alif
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com