|

Advertisement
×

পোশাকনির্ভরতা কমাতে ১৮ দেশে রপ্তানি কৌশল, নজর এশিয়ার বাজারে

রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬   প্রিন্ট   ৩৬ বার পঠিত

পোশাকনির্ভরতা কমাতে ১৮ দেশে রপ্তানি কৌশল, নজর এশিয়ার বাজারে

নিজস্ব প্রতিবেদক : তৈরি পোশাকের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি আয়ের নতুন উৎস তৈরি করতে ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি বাজারকে লক্ষ্য করে পৃথক কর্মপরিকল্পনা নিচ্ছে সরকার। এসব দেশের চাহিদা, শুল্ক ও অশুল্ক বাধা, প্রতিযোগী দেশ এবং বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় পণ্য চিহ্নিত করে বাজারভিত্তিক রপ্তানি কৌশল তৈরি করা হচ্ছে। তালিকায় রয়েছে চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াসহ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদাররা।

বিশ্ব বাণিজ্যের কেন্দ্র এশিয়ার দিকে সরে আসা এবং ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এ উদ্যোগের গুরুত্ব বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, শুধু নতুন বাজার খুঁজলেই হবে না; রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং আঞ্চলিক উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ওপরও জোর দিতে হবে।

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে তৈরি পোশাক খাতের আধিপত্য এখনো স্পষ্ট। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ দশমিক ৬২ শতাংশ এসেছে এ খাত থেকে। অন্যদিকে, গত আট মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও রপ্তানি কমেছে প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ। প্রধান বাজারগুলোতে এমন নিম্নমুখী প্রবণতা রপ্তানি আয়ের ভিত্তি বিস্তৃত করার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে।

এশিয়ার বাজারে সম্ভাবনা, বাণিজ্য ঘাটতিও বড়

বিশ্ব অর্থনীতিতে এশিয়ার প্রভাব বাড়লেও এ অঞ্চলের বড় অর্থনীতিগুলোতে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো তুলনামূলক সীমিত। চীন, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও এসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি বড়। ফলে বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে ৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ। একই সময়ে ভারতে রপ্তানি বেড়েছে ৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ৭ দশমিক ২৯ শতাংশ।

এই প্রবৃদ্ধি এশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের চাহিদা বাড়ানোর সম্ভাবনা তুলে ধরলেও সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে অবস্থান শক্তিশালী করতে হলে কয়েকটি ক্ষেত্রে অগ্রগতি প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উৎপাদন, আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা, সরবরাহে সময়নিষ্ঠতা এবং প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য সরবরাহের সক্ষমতা।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান রেহমান সোবহানের মতে, বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্র এশিয়ার দিকে সরে আসা বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে আঞ্চলিক বাজার ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ বাড়াতে হবে।

আসিয়ান বাজারে বাধা কাটানোর চ্যালেঞ্জ

এশিয়ার বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর সম্ভাবনা থাকলেও সেখানে প্রবেশের ক্ষেত্রে কিছু কাঠামোগত বাধা রয়েছে। বিশেষ করে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোতে উচ্চ শুল্ক এবং বাণিজ্যচুক্তির সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

তাদের মতে, বাজার সম্প্রসারণের জন্য শুধু বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়ানো যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর শুল্ক কাঠামো, আমদানি নীতি, পণ্যের মানসংক্রান্ত শর্ত এবং স্থানীয় বাজারে প্রতিযোগী দেশগুলোর অবস্থান বিশ্লেষণ করে এগোতে হবে। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, পণ্যের মানোন্নয়ন এবং দ্রুত পণ্য সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

সরকারের দেশভিত্তিক কর্মপরিকল্পনায় এসব বিষয় চিহ্নিত করা গেলে রপ্তানিকারকদের জন্য বাজারে প্রবেশের কৌশল নির্ধারণ সহজ হতে পারে। তবে পরিকল্পনার কার্যকারিতা নির্ভর করবে চিহ্নিত বাধা দূর করা এবং ব্যবসায়ীদের জন্য বাস্তবসম্মত সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর।

পণ্য রপ্তানির পাশাপাশি সেবায় জোর

রপ্তানি বহুমুখীকরণের আলোচনা শুধু পণ্যবাণিজ্যে সীমাবদ্ধ রাখার পক্ষে নন অর্থনীতিবিদদের একাংশ। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান তথ্যপ্রযুক্তি, দক্ষতাভিত্তিক সেবা এবং ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো খাতে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

এ ধরনের সেবা আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের আয় বাড়ানোর বিকল্প উৎস হতে পারে। তবে এ জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

অর্থাৎ, রপ্তানি বহুমুখীকরণের কৌশলে একদিকে যেমন নতুন পণ্য ও বাজারকে গুরুত্ব দিতে হবে, অন্যদিকে তেমনি ডিজিটাল সেবা ও দক্ষতাভিত্তিক কাজের আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগ খুঁজতে হবে।

পরিকল্পনার বাস্তবায়নই হবে মূল পরীক্ষা

১৮টি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি গন্তব্যকে কেন্দ্র করে পৃথক কর্মপরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের প্রচেষ্টাকে নতুন কাঠামো দিতে পারে। তবে প্রতিটি বাজারের জন্য সম্ভাবনাময় পণ্য চিহ্নিত করার পাশাপাশি বাণিজ্য বাধা দূর করা, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা এবং উৎপাদন ও সরবরাহ সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ দুটি—প্রচলিত বড় বাজারে রপ্তানি ধরে রাখা এবং নতুন বাজারে পণ্যের অবস্থান শক্তিশালী করা। এ জন্য তৈরি পোশাক খাতের পাশাপাশি অন্যান্য শিল্প ও সেবা খাতের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

দেশভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে নতুন ক্রেতা ও বাজারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব হলে রপ্তানি আয়ের উৎস আরও বিস্তৃত হতে পারে। একই সঙ্গে এশিয়ার আঞ্চলিক উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে নীতিগত সহায়তা, ব্যবসায়িক প্রস্তুতি এবং কার্যকর বাস্তবায়নের সমন্বয় জরুরি।

Facebook Comments Box
✎ মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Posted ০২:০৯ অপরাহ্ণ | রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com