নিজস্ব প্রতিবেদক
রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬ প্রিন্ট ৩৮ বার পঠিত
দেশের বীমা খাতে অর্থপাচার প্রতিরোধে নতুন করে কঠোর অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। গ্রাহকের পরিচয় যাচাই, অর্থের উৎস শনাক্ত, সন্দেহজনক লেনদেন পর্যবেক্ষণ এবং কেন্দ্রীয় কমপ্লায়েন্স ইউনিট গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে দেশের সব বীমা কোম্পানিকে। সম্প্রতি জারি করা সার্কুলারে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়।
তবে বীমা কোম্পানির প্রধান কার্যালয় থেকে শাখা, এজেন্সি, কমিশন এজেন্ট ও দাবি নিষ্পত্তির পর্যায় পর্যন্ত অর্থের প্রবাহ যথাযথভাবে যাচাই করা না গেলে শুধু নীতিমালা প্রণয়ন করে অর্থপাচারের ঝুঁকি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, বীমা খাতে অর্থপাচারের ঝুঁকি ব্যাংকিং খাতের মতো শুধু নগদ জমা বা অর্থ স্থানান্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জীবন বীমার প্রিমিয়াম জমা, পলিসি সমর্পণ করে অর্থ ফেরত নেওয়া, মেয়াদপূর্তির অর্থ গ্রহণ, বীমা দাবি নিষ্পত্তি এবং নন-লাইফ বীমার প্রিমিয়াম ফেরতের মতো প্রক্রিয়াও যথাযথ নিয়ন্ত্রণের অভাবে অপব্যবহারের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এ বিষয়ে ইউএনডিপির ন্যাশনাল কনসালটেন্ট বীমা ব্যক্তিত্ব এস এম জিয়াউল হক বলেন, বীমা খাতের মানিলন্ডারিং ব্যাংক খাতের মতো নয়, এর ধরন আলাদা। সেক্ষেত্রে এ খাতের মানিলন্ডারিং প্রতিরোধে স্বতন্ত্র গাইডলাইন প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।
গত ১৯ অক্টোবর জারি করা বিএফআইইউর নতুন নির্দেশনায় বেনামে, ছদ্মনামে কিংবা কাল্পনিক নামে বীমা পলিসি খোলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে কোনো গ্রাহক এক দিনে ১০ লাখ টাকা বা তার বেশি নগদ লেনদেন করলে সেই তথ্য বিএফআইইউতে প্রতিবেদন আকারে জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আর্থিক অপরাধ প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা এবং বিমা খাতকে অপব্যবহার থেকে সুরক্ষিত রাখার লক্ষ্যে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিএফআইইউর নির্দেশনা অনুযায়ী, সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত কিংবা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের তালিকাভুক্ত কোনো সন্ত্রাসী, গোষ্ঠী বা তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যাতে বীমা ব্যবস্থার সুযোগ নিতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে জটিল, অস্বাভাবিক কিংবা যৌক্তিক আর্থিক উদ্দেশ্যবিহীন বিমা পলিসির ওপর নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে বিএফআইইউ।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কোনো গ্রাহক এক দিনে ১০ লাখ টাকা বা তার বেশি নগদ লেনদেন করলে ওই লেনদেনের তথ্যসংবলিত নগদ লেনদেন প্রতিবেদন (সিটিআর) বিএফআইইউতে দাখিল করতে হবে। পাশাপাশি এ ধরনের লেনদেনের তথ্য ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র অন্তত পাঁচ বছর সংরক্ষণ করতে হবে।
গ্রাহকের পরিচয় নিশ্চিত করতে নির্ভরযোগ্য ও স্বাধীন উৎস থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন সনদ, পাসপোর্ট, ছবি ও ঠিকানা যাচাই করতে হবে। গ্রাহকের পক্ষে অন্য কেউ বীমা পলিসি পরিচালনা করলে ওই ব্যক্তি যথাযথভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কি না, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
বিদেশি বাণিজ্য-সংক্রান্ত বীমার ক্ষেত্রে ঋণপত্রের (এলসি) নম্বর, আমদানি-রপ্তানি চুক্তি, পণ্যের বিবরণ এবং জাহাজীকরণ-সংক্রান্ত নথিপত্র ব্যাংকের রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।
এ ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের নামে বীমা পলিসি খোলা হলে প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তি অথবা ২০ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ারের মালিককে মূল সুবিধাভোগী হিসেবে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে।
ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেন নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে বিএফআইইউ। কোনো সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন বিএফআইইউতে পাঠাতে হবে।
অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ এবং বীমা খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রতিটি বিমা প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়ে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় পরিপালন ইউনিট গঠনের নির্দেশনাও দিয়েছে সংস্থাটি।
কমিশন ও এজেন্সি পর্যায়ে নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ:
বীমা ব্যবসার বড় একটি অংশ বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে শুধু প্রধান কার্যালয়ে কমপ্লায়েন্স ইউনিট থাকলেই ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত হবে না। মাঠপর্যায়ে প্রিমিয়াম সংগ্রহ, কমিশন প্রদান, পলিসি বাতিল এবং অর্থ ফেরতের প্রতিটি ধাপে কার্যকর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
বিশেষ করে কোনো গ্রাহকের নামে পলিসি খোলা হলেও অর্থের প্রকৃত উৎস অন্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কিত হলে সেই সম্পর্ক যাচাই করা জরুরি। একইভাবে, কোনো এজেন্টের মাধ্যমে অস্বাভাবিক সংখ্যক পলিসি, অস্বাভাবিক কমিশন বা বারবার অর্থ ফেরতের ঘটনা দেখা গেলে ঝুঁকিভিত্তিক পর্যালোচনা প্রয়োজন হতে পারে।
কোনো গ্রাহকের ঘোষিত আয় ও আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ বড় অঙ্কের প্রিমিয়াম, তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ, অল্প সময়ের মধ্যে পলিসি সমর্পণ অথবা অসংগতিপূর্ণ ব্যাংক হিসাবে অর্থ ফেরত দেওয়ার ঘটনা বাড়তি যাচাইয়ের প্রয়োজন তৈরি করতে পারে। একইভাবে, ভুয়া নথি বা অসত্য তথ্যের ভিত্তিতে বিমা দাবি আদায়ের চেষ্টা আর্থিক অপরাধের ঝুঁকি তৈরি করে।
পরিচালনা পর্ষদের দায়ও গুরুত্বপূর্ণ:
বিএফআইইউর নির্দেশনায় কেন্দ্রীয় কমপ্লায়েন্স ইউনিট গঠন, প্রধান মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ পরিপালন কর্মকর্তা (সিএএমএলসিও) নিয়োগ এবং বার্ষিক প্রতিবেদন দাখিলের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। কোম্পানির ব্যবসার আকার ও কার্যক্রমের পরিধি অনুযায়ী পর্যাপ্ত জনবল রাখার কথাও বলা হয়েছে।
কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, কমপ্লায়েন্স ইউনিটের কার্যকারিতা নির্ভর করবে তার স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ, প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রাপ্তি, দক্ষ জনবল এবং ব্যবস্থাপনার সহযোগিতার ওপর। কোনো সন্দেহজনক লেনদেনের সঙ্গে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার আশঙ্কা থাকলে বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করার সক্ষমতাও জরুরি।
এ ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদ, প্রধান নির্বাহী এবং কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তার দায়িত্ব স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন। শুধু বার্ষিক প্রতিবেদন জমা দেওয়া নয়, চিহ্নিত দুর্বলতা সংশোধনে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেটিও মূল্যায়নের অংশ হওয়া উচিত।
বিএফআইইউর প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, বীমা খাতে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধের নির্দেশনা নতুন নয়। ২০০৮ সালের ১০ আগস্ট বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করা হয়েছিল। এরপর ২০১১ সালে নির্দেশিকা, ২০১৫ সালে সমন্বিত নির্দেশনা এবং ২০২২ সালে নতুন সার্কুলার জারি হয়। চলতি বছরের মার্চেও বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ইলেকট্রনিক গ্রাহক পরিচিতি যাচাইসংক্রান্ত নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রায় দুই দশক ধরে বীমা খাত মানিলন্ডারিং প্রতিরোধের নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় থাকলেও নতুন নির্দেশনায় গ্রাহকের পরিচয়, অর্থের উৎস, প্রকৃত সুবিধাভোগী এবং অস্বাভাবিক লেনদেনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বীমা খাতে মানিলন্ডারিংয়ের ঝুঁকি কতটা?
বিএফআইইউর ২০২১-২২ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে বীমা খাতের ঝুঁকি মূল্যায়নের বিষয়টি উঠে আসে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, দ্বিতীয় জাতীয় ঝুঁকি মূল্যায়নে বীমা খাতকে তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালের নির্দেশনায় কিছু নিয়ন্ত্রক প্রতিবেদন দাখিলের বাধ্যবাধকতা কমানো হয়। একই সঙ্গে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি এবং গ্রাহকের সঠিক তথ্য সংগ্রহের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।
২০২৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর বিএফআইইউর তৎকালীন প্রধানের বরাত দিয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিশ্বে যে পরিমাণ মানিলন্ডারিং বা অর্থপাচার হয় তার প্রায় ২০ শতাংশ বীমা কোম্পানিগুলো ব্যবহার করে করা হয়। মানিলন্ডাররা প্রতিনিয়ত তাদের কৌশল ও মাধ্যম পরিবর্তন করে। এ ক্ষেত্রে আর্থিক সেবা খাতের মধ্যে তুলনামূলকভাবে দুর্বল খাতকে মানিলন্ডারিংয়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। বিশ্বে যে পরিমাণ মানিলন্ডারিং হয় তার প্রায় ২০ শতাংশ বিমা কোম্পানিগুলো ব্যবহার করে করা হয়। এতে বিএফআইইউ কর্তৃক বেশ কয়েকটি ইনস্যুরেন্স কোম্পানি পরিদর্শনে প্রাপ্ত বিভিন্ন অনিয়ম যেমন- ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলোর রি-ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম বাবদ বিদেশি নামসর্বস্ব ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির অনুকূলে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানো, বিমা পলিসির মেয়াদপূর্তি হলেও গ্রাহকদের দাবি নিষ্পত্তি না করা, প্রিমিয়াম বাবদ আয়ের অর্থ সুষ্ঠুভাবে বিনিয়োগ না করে অন্যত্র স্থানান্তর, প্রিমিয়ামের অর্থ পরিচালক ও ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের বিভিন্নভাবে তছরূপ, বিভিন্ন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির কর্মকর্তাদের নিজ ও স্বার্থ সংশ্লিষ্ট নামে পরিচালিত ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেন পরিচালনা সংক্রান্ত বিষয় উঠে আসে।
Posted ০৮:৫৭ অপরাহ্ণ | রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com
✎ মন্তব্য করুন