Ad
x
একের পর এক নির্দেশ অমান্য

বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের দুর্দশা কাটছেই না

মঙ্গলবার, ১২ আগস্ট ২০২৫   প্রিন্ট   ৬৬৯ বার পঠিত

বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের দুর্দশা কাটছেই না

বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক খাতের দুর্নীতির ও অব্যবস্থাপনার তালিকায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক লিমিটেড (বিসিবিএল)। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এস আলম গ্রুপের আশির্বাদপুষ্ট হয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থ লুটপাট, অনিয়ম এবং দুর্নীতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সম্প্রতি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে না পেরে।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যারা বিভিন্ন সময় গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থেকে নিজেদের অনুগত একটি চক্র তৈরি করেন। এই চক্রের সদস্যরা নিয়োগ, লোন অনুমোদন, ক্রয়-বিক্রয়, প্রকল্প বাস্তবায়নসহ সব পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করে এক ধরনের ছায়া প্রশাসন চালিয়ে যাচ্ছেন। চক্রের অন্যতম সদস্যদের মধ্যে মোহাম্মদ জিয়াউল করিম, মো. রেজাউল হক, এস এম শওকত হোসাইন ও ক্রেডিট বিভাগের প্রধান সিএমডি আরিফ আলী এবং সঞ্জয় নন্দী, আরিফুর রহমান সবুজ ও ইঞ্জিনিয়ার ইমরুল অন্যতম। রেজাউল হক ব্যাংকের মানব সম্পদ বিভাগ প্রধান হিসাবে বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গে জড়িত বলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও বরাবর অভিযোগ করেন বাংলাদেশ কর্মাস ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারী সমন্বিত পরিষদ।

২০১৭ সালেও বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকটি লাভজনক ব্যাংক হিসাবে পরিচিত ছিল। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে চরম অব্যবস্থাপনায় এখন বারোটা বেজে গেছে বলে ব্যাংকের অভ্যন্তরের অনেকের অভিযোগ।

লোন জালিয়াতি ও আর্থিক অনিয়ম:
এসআইবিএল ব্যাংক থেকে এস আলমের প্রতিনিধি হয়ে এসভিপি হিসেবে যোগদান করলেও ইভিপি; এসইভিপি ও কৌশলে ডিএমডি পদ বাগিয়ে নেন বলে অভিযোগ আছে মোহাম্মদ জিয়াউল করিমের বিরুদ্ধে। এখন তিনি চলতি দায়িত্বে এমডি পদে আছেন। অভিযোগ আছে পর্ষদকেও জিম্মি করে রেখেছে তার সিন্ডিকেট। কর্মকর্তাগণ তাদের চাপে ব্যবসা করতে পারছেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনৈক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘ইচ্ছা হয় আত্মহত্যা করি। হাত পা বেঁধে বলে দৌড় দাও/ব্যবসা কর- এটা কি সম্ভব? অনেক শাখা/উপশাখা বন্ধ হওয়ার উপক্রম।’ তবে এ বিষয়ে মোহাম্মদ জিয়াউল করিম বলেন, ‘আমি হঠাৎ করে তো ডিএমডি হইনি, এসভিপি হিসাবে যোগদান করে নিয়ম মেনে কয়েক দফায় নিজ যোগ্যতা বলেই ইভিপি, এসইভিপি হয়ে ডিএমডি পদে উন্নীত হয়েছি।’

পর্ষদের একজন সদস্য বলেন, ‘ব্যাংকের অসামঞ্জস্যর জন্য মূলত ‘‘দুর্বল ব্যবস্থাপনাই দায়ী। ব্যবস্থপনা শক্তিশালী থাকলে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হত না। নজরুল ইসলাম একজন মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক ম্যানেজার এবং আব্দুস সালামসহ অবসরপ্রাপ্ত অনেক কর্মকর্তা সার্ভিস বেনিফিট না পেয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। এ বিষয়ে বোর্ডকে অবহিত করা ম্যানেজমেন্ট দায়িত্ব মনে করে নাই। যার ফলে অবসর পাওয়া অনেকেই অসহায় জীবন যাপন করছেন।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক অডিট প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিসিবিএল’র মোট বিতরণ করা ঋণের একটি বড় অংশই উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ও যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া বিতরণ করা হয়েছে। এই অনিয়মে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মোহাম্মদ জিয়াউল করিম ও তার সিন্ডিকেটের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে অভিযোগ আছে কারণ কমার্স ব্যাংকে যোগদানের পর থেকে ঋণ ব্যবস্থাপনা প্রধান হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন তিনি। তার দেয়া হাজার কোটি টাকা ঋণ এখন ব্যাংকটিকে মুমূর্ষু করে রেখেছে। তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদ জিয়াউল করিম বলেন, ‘আগের চেয়ে এখন ঋণ অনেক যাচাই বাছাইয়ের পর দেওয়া হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা অনেক লোন রিকভারি করেছি যা আমাদের সাফল্য।’

পদোন্নতিতে দুর্নীতি:
জানা যায়, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ট্রেজারি প্রধানকে ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট সুকৌশলে ব্যাংক থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার আবেদন করেছেন এই মর্মে যে, জোরপূর্বক তাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে। এ নিয়ে তিনি মতিঝিল থানায় সাধারণ ডায়েরিও করেছেন। তারপর থেকে কয়েক দফা তিনি কর্তৃপক্ষের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার কোন সুরাহা হয়নি এবং যোগদানের কোন তথ্যও পাওয়া যায়নি।

ব্যাংকের অভ্যন্তরে পদোন্নতি, বদলি ও নিয়োগ নিয়ে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে অভ্যন্তরীন সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। সিন্ডিকেটের বাইরে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বছরের পর বছর পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। অন্যদিকে সিন্ডিকেটের সদস্যরা অল্প সময়ের মধ্যেই উচ্চপদে উন্নীত হয়েছেন। কয়েকজন কর্মকর্তা একাধিকবার বদলি হলেও কিছু কর্মকর্তা নির্দিষ্ট বিভাগে বছরের পর বছর অবস্থান করেছেন যার মাধ্যমে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়েছে। অভিযোগ আছে জিয়াউল সিন্ডিকেট একসঙ্গে ৩১৮ জনকে পদন্নতি দিয়েছিলেন যা বাংলাদেশ ব্যাংকের আপত্তি সত্বেও এখন পর্যন্ত তাদের বেতন ভাতা নিয়মিতভাবেই দেওয়া হচ্ছে। এসব ঘটনা ব্যাংকের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার পাশাপাশি আর্থিক স্থিতিশীলতায়ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নীরবতা ও তদন্তের দাবি:
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, কমার্স ব্যাংকে চলমান অনিয়ম সম্পর্কে তাদের কাছে একাধিক লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি যা সিন্ডিকেটকে আরও বেপরোয়া করে তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে এ ধরনের দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কেবল প্রতিষ্ঠান নয় বরং জাতীয় অর্থনীতির ওপরও চাপ সৃষ্টি করে। সুষ্ঠু তদন্ত, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংক পরিচালনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা। তাছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের জনৈক কর্মকর্তাকে দিয়ে ২/৩শ কর্মকর্তাকে ঋণ দেওয়া সংক্রান্ত ফাইলে জড়িয়ে ভীতিকর অবস্থা সৃষ্টি করেন। এখন কোন ঋণ প্রস্তাবে কর্মকর্তাগণ সাহস করে এগিয়ে আসেন না।

অভিযোগ সম্পর্কে চলতি দায়িত্বে থাকা এমডি মোহাম্মদ জিয়াউল করিমের মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এসব তথ্য সত্য নয়, আমাকে যারা পছন্দ করে না তারা পত্রিকা অফিসে যোগাযোগ করে এসব তথ্য দেয়। আমি ব্যাংকে চাকরি করি। এখানে সিন্ডিকেটের প্রশ্নই আসে না এবং আমার সঙ্গে এস আলম গ্রুপের কোন সম্পর্ক আগেও ছিল না, এখনও নেই। এস আলম গ্রপের সঙ্গে যাদের আঁতাত ছিল তাদের চাকরি যাওয়ায় তারা আমার সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য প্রচার করছে।’ এমডি’র পদত্যাগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার সঙ্গে এমডি সাহেবের খুব ভাল সম্পর্ক ছিল এবং আছে। আমি এখন চলতি দায়িত্বে মাত্র কয়েকদিনের জন্য এমডি কিন্তু নির্দিষ্টভাবে এমডি হওয়ার নিয়মনীতি বা যোগ্যতা পূরণ করি না অর্থাৎ আমি এখন ইচ্ছা করলেও এমডি হতে পারবো না। তাহলে কেনই-বা এমডিকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করব?’

ব্যাংকের এমডি’র পদত্যাগ নয়, এটা ছিল প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়ের পরাজয়:
“বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন পদত্যাগ করেছেন”-এ খবরটি এখন পত্রিকার একটি শিরোনাম মাত্র। কিন্তু এর পেছনের বাস্তবতা অনেক গভীর, অনেক বেশি আশঙ্কাজনক কারণ এই পদত্যাগ আসলে কেবল ব্যক্তিগত কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না বরং এটি ছিল প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম-নীতি এবং নৈতিকতার বিরুদ্ধে সংঘটিত এক পরিকল্পিত অপমানের পরিণতি।

ব্যাংকের এক খেলাপি প্রতিষ্ঠান সুরুজ মিয়া স্পিনিং মিলের ৮৮ কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে ৪৮ কোটি টাকার সুদ মওকুফের সিদ্ধান্ত নিয়ে শুরু হয় বিবাদ। ব্যাংকের নিয়মমাফিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী এমডি মোশারফ হোসেন এ সিদ্ধান্তে আপত্তি জানান। সেখান থেকেই শুরু হয় চাপ, হুমকি এবং অবশেষে পদত্যাগে বাধ্য করার প্রক্রিয়া। ব্যাংকের আরেক ডিএমডি মো. জহিরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয় ‘১৬ জানুয়ারি ২০২৫ সালে নিয়োগকৃত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন ব্যাংকের ডিপোজিট বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা করতে ব্যর্থ হন। এ নিয়ে ২৯ জুলাই ব্যাংকের ৪২তম বোর্ড সভায় তাকে ব্যর্থতায় দায় দিলে এমডি মোশারফ হোসেন তেমন কোন সদুত্তর দিতে পারেননি এবং স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন।’ আবার পর্ষদ চেয়ারম্যান পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে নিজের ওপর চাপানো অভিযোগ ‘সুরুজ মিয়া স্পিনিং মিলের ৮৮ কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে ৪৮ কোটি টাকার সুদ মওকুফের’ বিষয়টি অসত্য বলে দাবি করেছেন।

পদত্যাগের বিষয়ে এমডি মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন ‘দৈনিক ব্যাংক বীমা অর্থনীতি’কে জানান, ‘আসলে ওখানে কাজ করার পরিবেশ ছিল না। প্রতিটা মুহূর্তে ও আমার প্রতিটা কাজে যদি চেয়ারম্যান ও ডিরেক্টর নাক গলান তাহলে কীভাবে কাজ করবো? তাই কোন ঝামেলা যাতে না হয় তার আগেই আমি পদত্যাগ করেছি কিন্তু পদত্যাগের পরে অনেকেই আমার নামে নানান সমালোচনা করছেন। আমি তো জানুয়ারিতে যোগদান করেছি। কারো দোষর হলে এ বছরের জানুয়ারি মাসে আমার নিয়োগ হয় কী করে?’
জানা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিপত্র জারির মাধ্যমে বন্ধের নিদর্শনা দিলেও বোর্ডের চেয়ারম্যান/ইসি চেয়ারম্যান ২ জনই বড় চেম্বারে ব্যাংকে নিয়মিত অফিস করছেন।

Facebook Comments Box

Posted ০৪:১০ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ১২ আগস্ট ২০২৫

bankbimaarthonity.com |

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com