|

Advertisement
×

বাংলা কিউআর লেনদেনে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ফি শূন্য, কমবে মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট

সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬   প্রিন্ট   ২০ বার পঠিত

বাংলা কিউআর লেনদেনে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ফি শূন্য, কমবে মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট

মার্চেন্ট পেমেন্ট সহজ করা এবং ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক পণ্য ও সেবা বিক্রেতাদের ডিজিটাল লেনদেনের আওতায় আনতে বাংলা কিউআর ব্যবস্থায় আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ফি শূন্য করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে মার্চেন্টদের কাছ থেকে নেওয়া মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট বা এমডিআর কমার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে নগদ লেনদেনের তুলনায় ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যয় কমে আসবে এবং ব্যবসায়ীদের বাংলা কিউআর ব্যবহারে আগ্রহ বাড়বে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংক মার্চেন্ট পেমেন্ট সহজীকরণ এবং ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় আনতে আন্তঃপ্রতিষ্ঠানযোগ্য কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেন চালু করেছে। এ ব্যবস্থা ‘বাংলা কিউআর’ নামে পরিচিত। এর আওতায় তফসিলি ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা, পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটর ও পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারসহ সব অধিগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব কিউআর কোডের পরিবর্তে বাংলা কিউআর চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের সব মার্চেন্ট পয়েন্টে নিজস্ব কিউআর কোড ৩০ জুন ২০২৬-এর মধ্যে বাংলা কিউআর দিয়ে প্রতিস্থাপন করার কথা। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকে ট্রেড লাইসেন্সধারী সব খুচরা হিসাবধারীকে বাংলা কিউআর চ্যানেলে যুক্ত করা, মোবাইল অ্যাপে গ্রাহক নিবন্ধন বাড়ানো এবং নতুন মার্চেন্টদের এই ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এসব উদ্যোগের ফলে প্রায় ২৪ লাখ মার্চেন্টকে বাংলা কিউআর ব্যবস্থায় যুক্ত করা হয়েছে। তবে মার্চেন্টের সংখ্যা বাড়লেও বাংলা কিউআরভিত্তিক লেনদেনে এখনো উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা যায়নি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলা কিউআর ব্যবহারে মার্চেন্টদের অনাগ্রহের অন্যতম প্রধান কারণ হলো মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট বা এমডিআর। অধিগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মার্চেন্টদের কাছ থেকে এই ফি আদায় করে। ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণের ক্ষেত্রে এই ব্যয় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

এমডিআরের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আবার পেমেন্ট প্রদানকারী গ্রাহকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানকে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ফি হিসেবে দিতে হয়। ফলে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ফি বেশি থাকলে অধিগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে মার্চেন্টদের জন্য এমডিআর কমানো কঠিন হয়ে পড়ে।

এতদিন বাংলা কিউআর লেনদেনে এমডিআর সাধারণত ১ থেকে ১ দশমিক ১৫ শতাংশ হারে আদায় করা হতো। এর মধ্যে শূন্য দশমিক ৩৫ শতাংশ থেকে শূন্য দশমিক ৭০ শতাংশ পর্যন্ত আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ফি হিসেবে ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেওয়া হতো। ফলে মার্চেন্টদের জন্য এমডিআর উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর সুযোগ সীমিত ছিল।

এর প্রভাব পড়ছিল ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের ওপর। নগদ লেনদেনে কোনো অতিরিক্ত মার্চেন্ট ফি না থাকায় ডিজিটাল লেনদেনকে অনেক ব্যবসায়ী তুলনামূলক ব্যয়বহুল মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করতেন। ফলে বাংলা কিউআর ব্যবস্থায় বিপুলসংখ্যক মার্চেন্ট যুক্ত হলেও এর ব্যবহার আশানুরূপ বাড়ছিল না।

এই সমস্যা সমাধানে নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ১০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে জারি করা পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট-২-এর সার্কুলার লেটার নম্বর ৬-এর মাধ্যমে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ফি বা আইআরএফের হার শূন্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের ফলে বাংলা কিউআর লেনদেনে অধিগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যয় কমবে। ফলে বাজারে সুষম প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেটও সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এতে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের। কারণ তাদের ব্যবসায় লেনদেনের পরিমাণ তুলনামূলক কম হওয়ায় প্রতিটি লেনদেনে অতিরিক্ত ফি ব্যবসার মুনাফায় সরাসরি প্রভাব ফেলে। এমডিআর কমে এলে ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ তাদের জন্য আগের তুলনায় আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশা, আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ফি শূন্য করার ফলে বাংলা কিউআর ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং মার্চেন্টদের ওপর আরোপিত ফি কমে আসবে। এতে দোকান, ক্ষুদ্র ব্যবসা, বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী ও প্রান্তিক উদ্যোক্তারা আরও বেশি ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণে উৎসাহিত হবেন।

বাংলাদেশে নগদনির্ভর লেনদেন কমিয়ে ডিজিটাল পেমেন্টের বিস্তার ঘটানোর ক্ষেত্রেও এই সিদ্ধান্তকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল লেনদেনের আওতায় আনা গেলে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা বাড়বে। একই সঙ্গে লেনদেনের স্বচ্ছতা, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

প্রায় ২৪ লাখ মার্চেন্ট ইতোমধ্যে বাংলা কিউআর ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ায় এখন মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে এর কার্যকর ব্যবহার বাড়ানো। এমডিআর কমানোর মাধ্যমে সেই বাধার একটি বড় অংশ দূর করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন এই সুবিধা মার্চেন্টদের কাছে কতটা দ্রুত পৌঁছায় এবং এর ফলে বাংলা কিউআরভিত্তিক লেনদেন কতটা বাড়ে, সেটিই হবে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বাংলা কিউআর লেনদেনে ১০০ কোটি টাকার প্রণোদনা:
দেশে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার বিস্তার এবং ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের বাংলা কিউআরভিত্তিক লেনদেনে উৎসাহিত করতে ১০০ কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী ১ অক্টোবর থেকে এ তহবিলের অর্থ থেকে নির্দিষ্ট বাংলা কিউআর লেনদেনের বিপরীতে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রণোদনা দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ১০ আগস্ট পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট-২-এর সার্কুলার নম্বর ৩-এর মাধ্যমে বাংলা কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেন সম্প্রসারণে প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়ে পরিপত্র জারি করেছে। এর লক্ষ্য হলো মার্চেন্ট পেমেন্ট সহজ করা, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক পণ্য ও সেবা বিক্রেতাদের ডিজিটাল পেমেন্টের আওতায় আনা এবং একটি নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও আন্তঃপ্রতিষ্ঠানযোগ্য ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ’ বাস্তবায়নে বাংলা কিউআরভিত্তিক লেনদেনের প্রসার গুরুত্বপূর্ণ হলেও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণে এখনো কাঙ্ক্ষিত আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। তাদের মুনাফার হার কম হওয়ায় ১ থেকে ১ দশমিক ১৫ শতাংশ মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট বা এমডিআরকে বাড়তি ব্যয় হিসেবে বিবেচনা করেন অনেক ব্যবসায়ী। ফলে তারা ডিজিটাল লেনদেনের চেয়ে নগদ লেনদেনে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

এই বাধা দূর করতে গত ২৯ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৪৫১তম সভায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ১০০ কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল গঠনের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।

নতুন ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত খুচরা হিসাবের মাধ্যমে অনবোর্ড করা ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক পণ্য বিক্রেতা এবং সেবা প্রদানকারী মার্চেন্ট পয়েন্টে সম্পন্ন ২ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রতিটি বাংলা কিউআরভিত্তিক লেনদেনের বিপরীতে মাসিক ভিত্তিতে প্রণোদনা দেওয়া হবে।

এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অধিগ্রহণকারী বা একুয়ারিং প্রতিষ্ঠানকে লেনদেনের পরিমাণের ০ দশমিক ১০ শতাংশ এবং ইস্যুয়িং প্রতিষ্ঠানকে ০ দশমিক ২০ শতাংশ হারে প্রণোদনা দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যাশা, এ উদ্যোগের ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণে আগ্রহ বাড়বে এবং বাংলা কিউআর লেনদেনের পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে নগদনির্ভরতা কমিয়ে দেশে একটি টেকসই ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার পথ আরও সুগম হবে।

Facebook Comments Box

Posted ০৮:০১ অপরাহ্ণ | সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com