|

Advertisement
×

বিশ্বব্যাংকের ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ পেতে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় কমাচ্ছে বাংলাদেশ

বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬   প্রিন্ট   ৪০ বার পঠিত

বিশ্বব্যাংকের ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ পেতে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় কমাচ্ছে বাংলাদেশ

বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল সাত বছর থেকে কমিয়ে পাঁচ বছর এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া ১৮ মাস থেকে আট মাসে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। আগামী তিন বছরে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের ঋণ অনুমোদনের সময় আরও কমিয়ে পাঁচ মাসে নামিয়ে আনার লক্ষ্যও নির্ধারণ করেছে সরকার। এর মাধ্যমে উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা এবং অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতে অর্থায়ন বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

ব্যাংককের এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনা বিজার্দে আলোচনা করেন। বৈঠকে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি পার্টনারশিপ ফ্রেমওয়ার্ক ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে চূড়ান্ত করার বিষয়ে সম্মতি জানায় সংস্থাটি।

বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী জানান, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনায় ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক নীতি এবং মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের অবস্থানের সামঞ্জস্য রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তবে ১০ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত ঋণ সহায়তার বিষয়ে আলোচনা এখনো চলমান রয়েছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।

সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাংকের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকেও অতিরিক্ত সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে। নতুন ঋণ কর্মসূচির আওতায় আইএমএফের কাছে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ চেয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার।

তবে দুই সংস্থাই ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন বিষয়ে শর্ত দিচ্ছে। ঋণ সহায়তা পেতে শর্তগুলোর মধ্যে সমন্বয় আনার চেষ্টা চলছে, যাতে একই ধরনের সংস্কার কার্যক্রমের জন্য একাধিক শর্তের চাপ তৈরি না হয়।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, অতিরিক্ত অর্থায়ন পাওয়া গেলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা মোকাবিলা, জ্বালানি ও সারে ভর্তুকি অব্যাহত রাখা, অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আমদানি নিশ্চিত করা, ব্যাংকের মূলধন শক্তিশালী করা এবং সামগ্রিক আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা বাড়ানোর কাজে অর্থ ব্যয় করা হবে।

১০ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাবে চারটি অগ্রাধিকার

অতিরিক্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করতে সরকার ‘রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড রিফর্ম ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম’ নামে একটি সংস্কার ও বিনিয়োগ কর্মসূচির খসড়া তৈরি করেছে। এতে চারটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

প্রথমত, বাণিজ্য অর্থায়ন—জ্বালানি ও সারসহ অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের আমদানি নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, বাণিজ্য সহজীকরণ—ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এমএসএমই) সহায়তা এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম সম্প্রসারণ। তৃতীয়ত, আর্থিক খাতে সুশাসন—ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে কাঠামোগত সংস্কার জোরদার করা। চতুর্থত, অর্থনৈতিক সহনশীলতা বৃদ্ধি—বৈশ্বিক সংকট ও বহিঃস্থ অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক সক্ষমতা শক্তিশালী করা।

গত মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গার বৈঠকের পর অতিরিক্ত অর্থায়নের উদ্যোগটি আরও গতি পায়। পরে সোমবার ব্যাংককে বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তাদের কাছে প্রস্তাবটির আনুষ্ঠানিক কাঠামো উপস্থাপন করা হয়।

অর্থমন্ত্রী এই উদ্যোগকে বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন প্রচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে লিখিত প্রস্তাব ও প্রাথমিক সুপারিশ বিনিময় হয়েছে বলেও তিনি জানান।

বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সংস্কারে জোর

বাংলাদেশের জন্য বিশ্বব্যাংকের সংস্কার কর্মসূচিতে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ কমানো, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সংস্কার এবং ব্যাংক খাতের আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করার বিষয়গুলো রয়েছে।

বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে ইতোমধ্যে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে বাংলাদেশি প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

ব্যাংকিং খাতে পুনর্গঠন কার্যক্রমের আওতায় ব্যাংকগুলোর মূলধন বাড়ানো এবং আমানতকারীদের আস্থা সুরক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের বেসরকারি খাতবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করা হচ্ছে। কয়েকটি নির্দিষ্ট ব্যাংকে আর্থিক পরিস্থিতি উন্নয়নের কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।

পুঁজিবাজারে তদারকি জোরদার করতেও উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। রাজনৈতিক নেতৃত্বনির্ভর ব্যবস্থার পরিবর্তে একটি স্বাধীন ও পেশাদার সিকিউরিটিজ কমিশন গঠন করা হয়েছে বলে প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে জানানো হয়। নিয়ন্ত্রক বাধা শিথিল হওয়ায় নিউইয়র্ক, লন্ডন ও হংকংয়ের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেড়েছে। হংকংভিত্তিক একটি ইক্যুইটি ফান্ড গঠনের কার্যক্রমও এগোচ্ছে।

কর ব্যবস্থার স্বয়ংক্রিয়করণে গুরুত্ব

রাজস্ব আয় বাড়াতে করনীতি প্রণয়ন এবং কর প্রশাসনের কার্যক্রম পৃথক করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের দীর্ঘদিনের সুপারিশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

একই সঙ্গে কর ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ স্বয়ংক্রিয়করণ কার্যক্রম চালু করা হচ্ছে। এর লক্ষ্য কর আদায় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়ানো, কর ফাঁকি কমানো এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় কর-রাজস্বের অনুপাত বৃদ্ধি করা।

সরকারের প্রত্যাশা, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় কমানো, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং বেসরকারি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার মাধ্যমে বিশ্বব্যাংকের অতিরিক্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করার পথ সহজ হবে। তবে ১০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ প্রস্তাবের চূড়ান্ত অনুমোদন নির্ভর করবে চলমান আলোচনা, অর্থায়নের কাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট সংস্কার শর্তের বিষয়ে সমঝোতার ওপর।

Facebook Comments Box
✎ মন্তব্য করুন

Posted ১১:২৭ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com