নিজস্ব প্রতিবেদক
শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬ প্রিন্ট ৯ বার পঠিত
বৈশ্বিক বাণিজ্যের অস্থিরতা, উচ্চ পরিচালন ব্যয় এবং নানা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে বলে মত দিয়েছেন রাজধানীর ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুর এলাকার ব্যবসায়ীরা। তারা বলেছেন, বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে পরিচালন ব্যয় কমানো, ট্রেড লাইসেন্সসহ সরকারি সেবাগুলো পুরোপুরি ডিজিটাল করা, ব্যাংকঋণের সুদের হার হ্রাস, ঋণপত্র (এলসি) খোলার প্রক্রিয়া সহজ করা এবং সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন জরুরি।
শনিবার (১১ জুলাই) ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘সার্বিক স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় এসব দাবি উঠে আসে। ডিসিসিআই নিউ ধানমন্ডি কনভেনশন হলে অনুষ্ঠিত এ সভায় ধানমন্ডি-মোহাম্মদপুর অঞ্চলের ১৫টি ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধি এবং প্রায় শতাধিক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক (বৈদেশিক মুদ্রা ও বিনিয়োগ নীতি বিভাগ) মাহমুদুন নবী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দ্বিতীয় সচিব (রাজস্ব নীতি) নুসরাত ফারজানা, কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট ঢাকা (পশ্চিম)-এর অতিরিক্ত কমিশনার নির্ঝর আহমেদ, ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম) মো. তারেক জুবায়ের এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা জোনায়েদ কবীর সোহাগ।
স্বাগত বক্তব্যে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, দেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি খাত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও উদ্যোক্তারা এখনও কর ও ভ্যাটসংক্রান্ত জটিলতা, প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির মতো নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। তিনি বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বিপণিবিতান ও দোকানপাট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত ব্যবসায়ীদের বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক জাতীয় বাজেটে উৎসে করকে অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করা, শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে উৎসে কর কমানো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের জন্য বিশেষ তহবিল এবং পাঁচ বছরের স্থিতিশীল কর কাঠামোর ঘোষণা ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে রাজস্ব আহরণের উচ্চ লক্ষ্য এবং সরকারি ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীলতা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে চাপ সৃষ্টি করছে, যা বিনিয়োগের জন্য উদ্বেগজনক।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা জোনায়েদ কবীর সোহাগ বলেন, নাগরিকদের হয়রানি কমাতে ট্রেড লাইসেন্সসহ সব সেবায় শূন্য সহনশীলতার নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। তিনি জানান, উদ্যোক্তাদের সুবিধার্থে ঢাকা চেম্বারের সঙ্গে যৌথভাবে ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন সপ্তাহ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে হোল্ডিং ট্যাক্সসহ অন্যান্য কর সময়মতো পরিশোধে নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. তারেক জুবায়ের বলেন, অর্থনীতির গতিশীলতা ধরে রাখতে নিরাপদ ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চাঁদাবাজি প্রতিরোধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি রাজধানীতে যানজট কমাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে পুরো শহরে স্মার্ট পুলিশিং ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের অতিরিক্ত কমিশনার নির্ঝর আহমেদ বলেন, বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতা এবং স্থানীয় সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে কিছুটা ধীরগতি দেখা গেলেও তিন মাস অন্তর ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার ব্যবস্থা উদ্যোক্তাদের জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একই সঙ্গে তিনি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এনবিআরের দ্বিতীয় সচিব নুসরাত ফারজানা বলেন, রাজস্ব আহরণ ও ব্যবসাবান্ধব নীতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখেই সরকার কাজ করছে। নতুন অর্থ আইন-২০২৬-এর মাধ্যমে ব্যবসা সহজীকরণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার সুফল উদ্যোক্তারা দ্রুতই পাবেন। তিনি আরও জানান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত শর্তসাপেক্ষ কর অবকাশের সুযোগ দেওয়া হয়েছে এবং এ খাতে বিনিয়োগে উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
মুক্ত আলোচনায় ব্যবসায়ীরা চশমা শিল্পের যন্ত্রপাতি আমদানি সহজ করা, রিয়েল এস্টেট খাতে সাইনিং মানির ওপর কর কমানো, ডিজিটাল বিপণন ও ফ্রিল্যান্সিং খাতের জন্য নীতিমালা প্রণয়ন, কনটেইনার খালাস প্রক্রিয়া দ্রুত করা, নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য এলসি প্রক্রিয়া সহজ করা, নারী উদ্যোক্তাদের বিশেষ প্রণোদনা এবং ট্রেড লাইসেন্সের মেয়াদ এক বছরের পরিবর্তে পাঁচ বছর করার দাবি জানান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক মাহমুদুন নবী বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এবং উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে ঋণের সুদের হার কমানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে এলসি খোলার প্রক্রিয়াও দীর্ঘ হচ্ছে এবং ব্যবসার ব্যয় বাড়ছে। তিনি আমদানি ব্যয় কমাতে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কার্যকর আলোচনা জোরদারের পরামর্শ দেন।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে নতুন ৩৯টি প্রতিষ্ঠানকে ডিসিসিআইর সদস্যপদ প্রদান করা হয়। ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ নবনির্বাচিত সদস্যদের হাতে সদস্যপদের সনদ তুলে দেন। এ সময় ডিসিসিআইর ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহসভাপতি মো. সালেম সোলায়মান এবং পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
Posted ০৮:০৩ অপরাহ্ণ | শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com