|

Advertisement
×
মঞ্জুর-আদিবা চক্রের বিরুদ্ধে আইডিআরএ'তে অসংখ্য অভিযোগ

আইডিআরএ’র বিশেষ নিরীক্ষায় ৪৭টি অনিয়মের তথ্য উদঘাটন

মঙ্গলবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১   প্রিন্ট   ৮৮২ বার পঠিত

আইডিআরএ’র বিশেষ নিরীক্ষায় ৪৭টি অনিয়মের তথ্য উদঘাটন

বাংলায় একটি প্রবাদ রয়েছে ‘সারা গায়ে ঘা ঔষধ লাগাবো কোথায়?’ ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ক্ষেত্রে একই অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। অন্য কোম্পানির মতো সুনির্দিষ্ট একটি, দু’টি নয় বরং অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগ করেছেন প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক, বিনিয়োগকারী, সাবেক পরিচালক ও চেয়ারম্যান। এমনকি ব্যবসায়িক চুক্তিতে আবদ্ধ অন্য প্রতিষ্ঠানও আইডিআরএ’র কাছে তাদের অভিযোগ দিয়েছে। অনেকে আবার বাণিজ্যমন্ত্রীর কাছেও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চিঠি দিয়েছেন। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে আইডিআরএ কারণ দর্শানোর নোটিশ দিলেও তার যথাযথ ব্যাখ্যা দিতে পারেনি কোম্পানির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। ফলে অনন্যোপায় হয়ে আইডিআরএ যখন প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে সে মুহুর্তে নিয়ন্ত্রণ সংস্থার চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অবৈধ ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ তোলা হয় কোম্পানির পক্ষ থেকে। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। বিদায় নিতে হয়েছে সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান পরিচালক মঞ্জুরুর রহমান এবং তার মেয়ে ও কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আদিবা রহমানকে। কিন্তু এতেই কি মুক্তি মিলবে? মঞ্জুর-আদিবার দুর্নীতির কারণে গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না তো? এটিই এখন বীমা খাতের গ্রাহক-বিনিয়োগকারীসহ বিশ্লেষক ও সচেতন মহলের প্রশ্ন। এ বিষয়ে ব্যাংক বীমা অর্থনীতির ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ রয়েছে ৩য় পর্ব-

৪৭ ধরনের অনিয়ম চিহ্নিত: এদিকে বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএর বিশেষ নিরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ৪৭টি অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গ্রাহককে পলিসির টাকা না দেওয়া, তহবিল বাড়িয়ে দেখানো, রাজস্ব ফাঁকি, ভবন ভাড়ার প্রাপ্ত অর্থ কোম্পানি হিসাবে গোপন রাখা, ব্যাংক হিসাবে ব্যাপক গড়মিল এবং আর্থিক রিপোর্টে মানদণ্ড লঙ্ঘনের মতো গুরুতর অভিযোগ। এ ছাড়াও এসব অনিয়ম ও ব্যর্থতার কারণে প্রতিষ্ঠানের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা আদিবা রহমানের পুনঃনিয়োগের আবেদন বাতিল করেছে আইডিআরএ।

এ বিষয়ে বীমা মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি (বিআইএ) শেখ কবির হোসেন বলেন, আইডিআরএ হলো বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তাই এখানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দায়িত্বও তাদের। অনেক কোম্পানির বিরুদ্ধে গ্রাহকের দাবি পূরণ না করাসহ বিভিন্ন অনিয়মের যে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে তার ফলে কোম্পানিতে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টিকে আমি ইতিবাচকভাবে দেখছি। এর আগে বায়রা লাইফেও প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

ডেল্টা লাইফে গ্রাহকের স্বার্থ যাচাইয়ে আইডিআরএ’র নিয়োগকৃত দু’টি অডিট ফার্ম হলো-এমএস হাওলাদার ইউনুস অ্যান্ড কোং এবং এমএস ফেমস অ্যান্ড আর। এদের একটি কোম্পানির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত করেছে এবং অন্যটি আর্থিক প্রতিবেদনসহ অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত নিরীক্ষা করেছে।

নিরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি ২০১৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ২২টি ক্ষেত্রে বীমা আইন ও বিধি লঙ্ঘন করেছে বলে জানানো হয়। প্রতিবেদনে ১০টি বিষয়ে অধিকতর তদন্ত করতে গিয়ে আরও ২৫টি সুনির্দিষ্ট অনিয়ম পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে কোম্পানি যে ব্যাখ্যা দিয়েছে তা গ্রহণযোগ্য নয় জানিয়েছে আইডিআরএ। তবে কয়েকটি ক্ষেত্রে আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছে কোম্পানি। এই কোম্পানির মাধ্যমে ভবিষ্যতেও গ্রাহকের স্বার্থ ক্ষুন্ন হতে পারে বলে আইডিআরএ মনে করে।

এদিকে আইডিআরএ সূত্র জানায়, ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রচুর পরিমাণ পলিসি তামাদি হয়েছে। এক্ষেত্রে নবায়ন প্রিমিয়াম বাবদ প্রতিষ্ঠানটি ১৮০ কোটি টাকা বঞ্চিত হয়েছে বলে মনে করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ফলে সরকারও হারিয়েছে বড় অঙ্কের রাজস্ব। এছাড়া আলোচ্য সময়ে ২১৮ কোটি টাকা ব্যাংকে যথাযথভাবে জমা হয়নি এবং ২২১ কোটি টাকার ব্যাংক বিবরণী পাওয়া যায়নি। অথচ ৫ হাজার টাকার বেশি নগদ লেনদেন করা যাবে না বলে আইডিআরএ’র নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু তা আমলে নেয়নি ডেল্টা লাইফ। এ সময়ে প্রচুর পরিমাণে নগদ লেনদেন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। শুধু ২০২০ সালের ডিসেম্বরেই ১০০ কোটির বেশি টাকা নগদ উত্তোলন করেছে। যার বড় অংশ মুনাফায় কমিশন দেখিয়েছে। ব্যাংক বিবরণীতে সুদ ও লভ্যাংশের তথ্য ভেরিফাইড নয়। আবার শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও বিধি-বিধান মানেনি প্রতিষ্ঠানটি। নিয়মের বাইরে গিয়ে জেড ক্যাটাগরির শেয়ারে বিনিয়োগ করা হয়েছে। ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে ৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা সার্ভিস আদায় করলেও তা কোম্পানির হিসাবে দেখানো হয়নি। বিভিন্ন সময়ে ক্ষতিপূরণ হিসাবে পাওয়া ৩৯ লাখ টাকা কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। এ ছাড়াও ৫৯ কোটি টাকা প্রিমিয়াম আদায় হয়নি বলে জানা গেছে। কিন্তু সেখানেও অনিয়ম হয়েছে। আর্থিক প্রতিবেদন তৈরিতে মানা হয়নি বাংলাদেশ অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড। কোম্পানিটি একটি প্রতিবেদনে বলেছে তাদের গ্রাহক সংখ্যা ১৮ লাখ। অথচ আইডিআরএ’র কাছে প্রদত্ত তথ্যে পলিসির সংখ্যা ২ লাখ ১ হাজার ১২টি দেখানো হয়েছে। তাছাড়া কোম্পানির ৯০ শতাংশ পলিসির ক্ষেত্রে মোবাইল নাম্বার না থাকায় গ্রাহকের স্বার্থ ক্ষুণ্নসহ ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে বলে মনে করছে আইডিআরএ। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে এর আগেও মামলায় জড়িয়ে দীর্ঘদিন বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ বঞ্চিত রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এসব বিষয়ে কোম্পানির সিইও আদিবা রহমানকে ফোন করা হলে তিনি রিসিভ করেননি। অপরদিকে সিএফও মিল্টন ব্যাপারীর সাথে কথা বলতে ফোন দেয়া হলে অসুস্থতার কারণে তিনি এ প্রতিবেদকের সাথে কথা বলতে রাজি হননি।

 

Facebook Comments Box
✎ মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Posted ১১:৪৫ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১

bankbimaarthonity.com |

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com