অনলাইন ডেস্ক
শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬ প্রিন্ট ২১ বার পঠিত
প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের অর্থ আত্মসাৎ ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে নাম এসেছে কোম্পানিটির সাবেক প্রধান হিসাব কর্মকর্তা (সিএফও) মো. রফিক আহমেদের। তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত চলছে। দুদকের সহকারী পরিচালক হাবিবুর রহমান এই অনুসন্ধান করছেন। প্রাইম লাইফের অর্থ তছরুপের বিষয়ে অনুসন্ধানে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে দুদক সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে, রফিক আহমেদ বর্তমানে সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সে একই গুরুত্বপূর্ণ পদে (সিএফও) দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি কোম্পানিটির ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী হিসেবেও দায়িত্ব পেয়েছেন। অতীতে একটি জীবনবীমা কোম্পানির আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে নাম আসার পরও কীভাবে তিনি অন্য একটি কোম্পানির সিএফও ও ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পেলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পিএফআই সিকিউরিটিজের নামে বেআইনি ঋণ সুবিধা দিয়ে প্রাইম লাইফের ১৭৫ কোটি টাকা প্রতারণামূলকভাবে আত্মসাতসহ জমি কেনা ও উন্নয়ন ব্যয়ের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাত মামলার আসামিও রফিক। ২০২৫ সালে আদালতে ওই মামলা দায়ের করা হয়। প্রাইম লাইফের সাবেক সিএফও হিসেবে তাকে ওই মামলার আসামি করা হয়।
প্রাইম ইসলামী লাইফের তৎকালীন মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা আপেল মাহমুদ ২০২২ সালের ডিসেম্বরে কোম্পানিটির অর্থ আত্মসাৎ ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে দুদকে অভিযোগ দায়ের করেন। এতে কোম্পানিটির সাবেক চেয়ারম্যান এম এ খালেক, সাবেক মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রধান পরামর্শক কাজী মো. মোরতুজা আলী, সাবেক মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহ আলম, সাবেক কোম্পানি সচিব হাবিবুর রহমান এবং সাবেক সিএফও মো. রফিক আহমেদের নাম রয়েছে।
অভিযোগে জমি কেনা, উন্নয়ন ব্যয় এবং সম্পদ বিক্রির লেনদেনের পাশাপাশি পিএফআই সিকিউরিটিজের ঋণের নামে অবৈধভাবে বিনিয়োগের মাধ্যমে কোম্পানির তহবিল থেকে বিপুল অর্থ তছরুপের বিষয়ও রয়েছে ।
প্রাইম ইসলামী লাইফের আর্থিক অনিয়মসংক্রান্ত অভিযোগের মধ্যে পিএফআই সিকিউরিটিজের ঋণের নামে অবৈধ বিনিয়োগের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অভিযোগ অনুযায়ী, এ ধরনের বিনিয়োগের মাধ্যমে কোম্পানির তহবিল থেকে ১৭৫ কোটি ১২ লাখ টাকা তছরুপ করা হয়। দুদক সূত্র জানায়,
জমি কেনা ও উন্নয়নের ব্যয় নিয়েও অভিযোগ:
প্রাইম ইসলামী লাইফের বিরুদ্ধে করা অভিযোগে জমি কেনা ও উন্নয়নের ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে ঢাকার বাংলামটরে ৩৭ দশমিক ৪৬ শতাংশ জমি কেনার দলিলমূল্য ছিল ১৭৫ কোটি ১২ লাখ টাকা। নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট খরচসহ মোট ব্যয় দেখানো হয় প্রায় ১৯৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা।
অভিযোগকারীর দাবি, একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে জমিটির মূল্য প্রায় ১০২ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এ পার্থক্যের ভিত্তিতে তিনি প্রায় ৭২ থেকে ৭৩ কোটি টাকা তছরুপের অভিযোগ তোলেন।
এ ছাড়া ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ঢাকার গোড়ান চটবাড়ী এলাকায় ৩৮১ দশমিক ৭৪ শতাংশ জমি কেনা ও উন্নয়ন নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, নয়টি দলিলে জমির ক্রয়মূল্য ছিল ৫ কোটি ১৪ লাখ ১ হাজার টাকা। জমি ভরাট ও উন্নয়নের জন্য ব্যয় দেখানো হয় প্রায় ৫৭ কোটি ৬৩ লাখ ৩৩ হাজার ৪০৭ টাকা। জমি কেনাসহ মোট ব্যয় দেখানো হয় ৬২ কোটি ৭৭ লাখ ৩৪ হাজার ৪০৭ টাকা।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ওই জমির ২৩৭ দশমিক ১৫ শতাংশ অন্য একটি ইসলামী জীবনবিমা কোম্পানির কাছে ৭১ কোটি ১৫ লাখ টাকার দলিলে বিক্রি দেখানো হয়। অভিযোগকারীর দাবি, এ লেনদেনে প্রকৃত অর্থ পরিশোধ হয়নি। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে জমির দলিল, মূল্যায়ন প্রতিবেদন, ব্যাংক লেনদেন এবং উন্নয়নকাজের হিসাব যাচাই প্রয়োজন।
আদালতেও মামলা, একাধিক আদেশের উল্লেখ
অভিযোগপত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অন্যান্য আর্থিক অনিয়মের প্রসঙ্গও আনা হয়েছে। এতে হাইকোর্ট বিভাগের কোম্পানি ম্যাটার নম্বর ১০৯/২০২০, ১৬৪/২০২০, ৩১৮/২০২০, ৩১৯/২০২০, ৩২০/২০২০ ও ৩২১/২০২০-এর উল্লেখ রয়েছে। এসব মামলায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাব জব্দ ও পাসপোর্ট জব্দের আদেশ দেওয়া হয়েছিল।
দুদকে দেয়া অভিযোগে যা আছে:
২০২২ সালের ১৫ ডিসেম্বরে প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের নামে জমি ক্রয় এবং উন্নয়নের নামে প্রায় শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে দুদকে অভিযোগ দেন কোম্পানিটির তৎকালীন মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা আপেল মাহমুদ। এতে বলা হয়, ২০১৬ সাল থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে এই আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে।
যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এদের মধ্যে রয়েছেন কোম্পানিটির সাবেক চেয়ারম্যান এম এ খালেক, কাজী মোঃ মোরতুজা আলী, সাবেক মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রধান পরামর্শক, মোহাম্মদ শাহ্ আলম, সাবেক মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা, হাবিবুর রহমান, সাবেক কোম্পানি সচিব, মোঃ রফিক আহমেদ, সাবেক প্রধান হিসাব কর্মকর্তা (সিএফও)।
আপেল মাহমুদ তার অভিযোগে বলেন,
১. অভিযোগকারী প্রতিষ্ঠান প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশের বীমা শিল্পে সুপ্রতিষ্ঠিত একটি বীমা কোম্পানি এবং বাদী কোম্পানি
প্রতিষ্ঠা লগ্ন হতে বীমা শিল্পে প্রচলিত আইন, বিধি, বিধিমালা এবং বীমা উন্নয়ন এবং নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এবং অন্যান্য সকল কর্তৃপক্ষের সময়ে সময়ে জারি করা নির্দেশনা মান্য করত: সুনামের সহিত বীমা ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে ;
২. ১নং অভিযুক্ত জনাব এম.এ খালেক অভিযোগকারী কোম্পানিতে পরিচালনা পর্ষদে চেয়ারম্যান হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন এবং কোম্পানির প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে ২০১৮ সনে তার শেয়ার ট্রান্সফার করার পূর্ব মূহুর্ত পর্যন্ত সবচেয়ে প্রভাবশালী পরিচালকের ভূমিকাতে নিজেকে রেখেছিলেন এবং ২নং অভিযুক্ত জনাব কাজী মো. মোরতুজা আলী বাদী কোম্পানিতে মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার আসনে এবং কিছুটা সময় বাদী কোম্পানির প্রধান পরামর্শকের আসনেও অধিষ্ঠিত ছিলেন; ৩নং অভিযুক্ত জনাব মোঃ শাহ আলম বাদী কোম্পানিতে মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন; ৪নং অভিযুক্ত জনাব হাবিবুর রহমান এবং নেং অভিযুক্ত জনাব রফিক আহমেদ অভিযোগকারী কোম্পানিতে যথাক্রমে কোম্পানি সচিব এবং প্রধান হিসাব কর্মকর্তা পদে নিয়োজিত ছিলেন;
৩. অভিযুক্তগণ অভিযোগকারী কোম্পানিতে তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব চরম অবহেলার সাথে শুধু পালন করেছেন তা নয়, কোম্পানির বীমা গ্রাহক এবং শেয়ারহোল্ডারদের সাথে চরম প্রতারণা মূলক কাজে নিজেদেরকে লিপ্ত রেখে অভিযোগকারী কোম্পানির নামে জমি ক্রয়/বিক্রয় এবং উন্নয়নের নামে কোম্পানির তহবিল থেকে শত-শত কোটি টাকা লুটপাট এবং আত্মসাৎ করেছেন ।
৪. ২০১৭ ইং সালে অভিযুক্ত নং ১ অত্র কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত থেকে এবং অভিযুক্ত নং ২-৫ এর সহযোগীতায় বাংলামটরে ৩৭.৪৬ শতাংশ জমির মূল্য অপকৌশল অবলম্বন করত: অনেক বেশি দেখিয়ে ক্রয় করেছেন (দলিল মূল্য ১৭৫,১২,০০,০০০/-) এবং সমস্ত খরচ বাবদ প্রায় ১৯৬.৬৪ কোটি টাকা দেখিয়েছেন
(নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুসারে) (কপি সংযুক্ত – ১ ও ২)। অথচ, যার বর্তমান বাজার মূল্য ভ্যালুয়েশন রিপোর্ট অনুসারে প্রায় ১০২ কোটি টাকা এবং হিসেব মোতাবেক, তছরূপকৃত অর্থের পরিমান প্রায় ৭২/৭৩ কোটি টাকা। (কপি সংযুক্ত – ৩) ২০১৬-২০১৮ ইং সালে অভিযুক্ত নং ১. অত্র অভিযোগকারী কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত থেকে এবং অভিযুক্ত নং ২-৫ এর সহযোগীতায় মিরপুরের গোড়ান চটবাড়ীতে ৩৮১.৭৪ শতাংশ জমি ক্রয় করেন ৫,১৪,০১,০০০/- (পাঁচ কোটি চৌদ্দ লক্ষ এক হাজার) টাকায় (পৃথক ৯ টি দলিল মূল্যের সমষ্টি) অথচ জমি ভরাট বা উন্নয়ন করতে ব্যয় দেখিয়েছেন প্রায় ৫৭,৬৩,৩৩,৪৭/– (সাতান্ন কোটি তেষট্টি লক্ষ তেত্রিশ হাজার চারশত সাত) টাকা (সর্বসাকূল্যে ৬২,৭৭,৩৪,৪০৭/- টাকা)
(নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুসারে) (কপি সংযুক্ত – ৪ এ ও ৪.বি) এবং সুস্পষ্টত ভাবেই অপকৌশল অবলম্বন করত: এখানে বিপুল পরিমান অর্থ তছরূপ হয়েছে এবং উক্ত সম্পত্তির মধ্য হতে ২৩৭.১৫ শতাংশ জমি আসামী নং ১ এর অধিগত্যতা আছে এমন অন্য আর একটি ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির নিকট প্রকৃত লেনদেন ব্যতীত বিক্রয় দেখান যার দলিল মূল্য ৭১,১৫,০০,০০০/- (একাত্তর কোটি পনের লক্ষ) টাকা (কপি সংযুক্ত – ৫)। প্রসংগত উল্লেখ্য যে, অভিযুক্ত নং ১ এর বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে অন্য একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রতারণা এবং দুর্নীতি বিষয়ে মামলা রজু হয়েছে এবং বিচার প্রক্রিয়া চলমান। {মামলা নং ১৫(৯)২০২২, শাহবাগ থানা}
৬. আরো প্রকাশ থাকে যে, জমি ক্রয় বিক্রয়ের ক্ষেরে বীমা কোম্পানি গুলোকে বীমা শিল্পের কর্তৃপক্ষ তথা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এর পূর্বানুমোদন নেয়াটা আবশ্যক মর্মে একটি সার্কুলার রয়েছে। (কপি সংযুক্ত – ৬) সেটি সম্পর্কে অভিযুক্তগন ভালোভাবে ওয়াকিবহাল থাকা স্বত্ত্বেও তা পরিপালন না করেই জমি ক্রয়/বিক্রয় এর সাথে লিও ছিলেন এবং যার ফলস্বরূপ কর্তৃপক্ষ, অভিযোগকারী কোম্পানিকে জরিমানা আরোপ করেন এবং সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করারও নির্দেশনা প্রদান করেন। (জরিমানা ও
নির্দেশনার কপি সংযুক্ত – ৭)
৭. উল্লেখ্য যে, অভিযুক্তগণ, অভিযোগকারী কোম্পানিতে আরো অন্যান্য আর্থিক অনিয়ম সংগঠিত করেছেন এবং তা উদ্ধারের নিমিত্তে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে রজু কৃত কোম্পানি ম্যাটার নং ১০৯/২০২০, ১৬৪/২০২০, ৩১৮/২০২০, ৩১৯/২০, ৩২০/২০২০ এবং ৩২১/২০২০ তে অভিযুক্তগনের ব্যাংক একাউন্ট ফ্রিজিং এবং পাসপোর্ট সিজিং এর আদেশ হয়েছে। (আদেশের কপি সংযুক্ত – ৮ এ ও ৮ বি
এমতাবস্থায়, অভিযোগকারী কোম্পানির আত্মসাৎকৃত অর্থ উদ্ধার এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করত: বাধিত করবেন ।
Posted ০৮:১১ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com
✎ মন্তব্য করুন