|

Advertisement
×

মটরযান বীমার অস্পষ্টতা দূর করতে সম্মিলিত উদ্যোগ

সোমবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২২   প্রিন্ট   ৫৯৬ বার পঠিত

মটরযান বীমার অস্পষ্টতা দূর করতে সম্মিলিত উদ্যোগ

সড়ক পরিবহন আইন- ২০১৮ অনুযায়ি মোটরযানের তৃতীয় পক্ষের ঝুঁকি বীমাকে ঐচ্ছিক বলে ২০২০ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর পুলিশ হেডকোয়ার্টারে চিঠি দেয় সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। এতে পুলিশের সহায়তা চেয়ে বলা হয়, ‘এখন থেকে মটরযানের বীমা না থাকলে কোন মামলা দেয়া যাবে না।’ এর প্রেক্ষিতে যে কোন মটরযানের সব ধরণের বীমা থেকে অব্যহতি দেয় পুলিশ প্রশাসন। কিন্তু বিআরটিএ’র এই চিঠি ও পুলিশের এমন সিদ্ধান্তকে ভুল ব্যাখ্যা বলেছিলেন বীমা খাত সংশ্লিষ্টরা। অবশেষে দীর্ঘদিন পর বিষয়টি সমাধানে আইনটির সাথে সম্পর্কিত সকল পক্ষকে সাথে নিয়ে সভার আয়োজন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। সভায় সড়ক পরিবহন আইনের ৬০ ধারার অস্পষ্টতা দূর করে সুনির্দিষ্ট সুপারিশমালা তৈরীতে সকলে একমত জানায়। এরই প্রেক্ষিতে কমিটি গঠন করা হয়। এমনটাই জানা গেছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ সূত্রে।

জানা গেছে, গত ১২ ডিসেম্বর সকালে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সভায় সভাপতিত্ব করেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব শেখ মোহাম্মদ সলীম উল্লাহ। এতে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, রূপালী ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) পৃথ্বীশ কুমার (পি.কে) রায়, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) রোড সেফটি বিভাগের পরিচালক শেখ মোহাম্মদ মাহাবুব-ই-রব্বানী, বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট নাসির উদ্দিন আহমেদ পাভেল, ভাইস প্রেসিডেন্ট এ কে এম মনিরুল হক, সেতু বিভাগের উপসচিব মোহাম্মদ আনোয়ারুল নাসের, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উপসচিব মনিরুল আলম, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উপসচিব (বীমা) জাহিদ হোসেন, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) নির্বাহী পরিচালক এসএম শাকিল আখতার এবং বিআরটিএ’র চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার।

সভায় রূপালী ইন্স্যুরেন্সের সিইও পিকে রায় বলেন, গত ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখে বিআরটিএ’র এক অফিস আদেশে মটরযানের তৃতীয় পক্ষের ঝুঁকি বীমা বাতিল করায় মটরযানের সকল ধরণের বীমা না করার প্রবণতা তৈরী হয়েছে। এতে বীমা ও পরিবহন খাত ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার পাশাপাশি সরকারও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। গত ২৮ অক্টোবর ২০২১ তারিখে পাটুরিয়া ফেরীঘাটে ৩৩টি যানবাহনসহ ফেরী ডুবে গেলেও বীমা না থাকায় কেউ ক্ষতিপূরণ পায়নি। তাই সড়ক পরিবহন আইনে ৬০(২) ধারা অনুসারে মটরযানে বীমা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এটি বাস্তবায়িত হলে বীমা ও মটরযান শিল্প উপকৃত হবে। পাশাপাশি জিডিপিতে বীমার পেনিট্রেশন বৃদ্ধিতে সরকারের রাজস্ব বাড়বে।

বিআরটিএ’র রোড সেফটি বিভাগের পরিচালক শেখ মোহাম্মদ মাহাবুব-ই-রব্বানী বলেন, পরিবহন সংশ্লিষ্টদের দীর্ঘদিনের দাবীর ও স্টেকহোল্ডারদের মতামতের প্রেক্ষিতে নতুন সড়ক পরিবহন আইনে মটরযানের তৃতীয় পক্ষের ঝুঁকি বীমা বাতিল করা হয়েছে। তবে আইনের ধারা ৬০ ও উপধারায় মোটরযানের মালিক বা প্রতিষ্ঠান ইচ্ছা করলে বীমা ঝুঁকি গ্রহণ করতে পারবেন।

বিআইএ’র ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট নাসির উদ্দিন আহমেদ পাভেল বলেন, প্রতিবেশি দেশসহ পৃথিবীর সকল উন্নত দেশে মটরযানে দায় বীমা বাধ্যতামূলক। যেখানে ২০৪১ সালকে সামনে রেখে দেশ ক্রমান্বয়ে উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, সেখানে যদি মানুষের জীবন ও সম্পদের ঝুঁকি গ্রহণের ব্যবস্থা সুদৃঢ় করা না হয় তবে দেশে অনেক পিছিয়ে পড়বে। তাই মোটরযানের তৃতীয় পক্ষের ঝুঁকিসহ সার্বিক বীমা ঝুঁকি ব্যবস্থা পুনরায় চালু করতে প্রয়োজনে সড়ক পরিবহন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা-উপধারা সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে।

বিআইএ’র ভাইস প্রেসিডেন্ট এ কে এম মনিরুল হক বলেন, যে কোন আইন প্রণয়নের আগে পূর্ববর্তী আইনের কোন ধারা-উপধারা বাতিল কিংবা সংশোধন করতে স্টেকহোল্ডারদের মতামত নেয়া হয়। অথচ সড়ক পরিবহন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারার বিষয়ে বীমার সাথে জড়িত কারো মতামত নেয়া হয়নি। ফলে এ নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উপসচিব মো. মনিরুল আলম বলেন, পৃথিবীর সকল উন্নত দেশেই যানবাহনের বীমা করার ব্যবস্থা প্রচলিত। বাংলাদেশেও এ ব্যবস্থা অব্যহত রাখা প্রয়োজন। কিন্তু ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইনে মটরযানের বীমা করার বিষয়টি সুস্পষ্ট নয়। তাই আইনের ৬০ ধারা ও এর উপধারাগুলোর বিষয়ে সৃষ্ট সমস্যা সমাধানে পুনরায় মটরযানের বীমা ব্যবস্থা চালু করা অথবা সংশ্লিষ্ট ধারা-উপধারা সংশোধনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উপসচিব (বীমা) মো. জাহিদ হোসেন বলেন, সড়ক পরিবহন আইনের ৬০(১) ধারায় তৃতীয় পক্ষের ঝুঁকি বীমা ঐচ্ছিক করা হলেও ৬০(২) ধারায় মটরযানের বীমা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এরইমাঝে গত ২৯ সেপ্টেম্বর বিআরটিএ থেকে ‘মটরযানের তৃতীয় পক্ষের বীমা ঝুঁকি না থাকলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ নেই’ এমনটা জানিয়ে অফিস আদেশ জারি করা হয়। কিন্তু মটরযানের সব ধরণের বীমার ক্ষেত্রে এটি প্রয়োগ করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এতে বীমা শিল্প ও পরিবহন শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

আইডিআরএ’র নির্বাহী পরিচালক এসএম শাকিল আখতার বলেন, জাতীয় অর্থনীতিতে বীমা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও বীমার পেনিট্রেশন এখনো কাঙ্খিত পর্যায়ে যেতে পারেনি। বীমার পেনিট্রেশন বৃদ্ধিতে যে সব পরিকল্প অবদান রাখছে তার মধ্যে মটরযান বীমা অন্যতম। মটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩ অনুসারে তৃতীয় পক্ষের ঝুঁকি বীমা বাধ্যতামূলক থাকলেও নতুন আইনে এই বিধান রাখা হয়নি। ফলে যানবাহন ক্ষতিগ্রস্থ হলে বীমা কোম্পানি থেকে কোন ক্ষতিপূরণ পাচ্ছে না। উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও তৃতীয় পক্ষের ঝুঁকি বীমা বাধ্যতামূলক করা গেলে বীমা শিল্প ও পরিবহন শিল্প উভয়েই উপকৃত হবে।

বিআরটিএ’র চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার বলেন, মটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩ অনুসারে গাড়ি দূর্ঘটনার পর বীমা দাবি পরিশোধের ক্ষেত্রে বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর কিছুটা সমস্যা ছিলো। এ কারণে মটরযান মালিক ও শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল তৃতীয় পক্ষের ঝুঁকি বীমা বাতিল করার। তবে সময়ের প্রেক্ষাপটে এবং প্রয়োজনে যে কোন আইনই সংশোধন করা যায়। তাই নতুন সড়ক পরিবহন আইনের ৬০ ধারা ও এর উপধারা স্পষ্টিকরণের মাধ্যমে মটরযানের বীমা করাটাই সঠিক হবে।

সভাপতির বক্তব্যে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব বলেন, নতুন সড়ক পরিবহন আইনের ফলে মটরযানের বীমা করার বিষয়ে যে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে তার সমাধানে মটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩ এবং সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ তে সংশ্লিষ্ট ধারা ও উপধারাগুলো পর্যালোচনার প্রয়োজন। এর আলোকে একটি সুনির্দিষ্ট সুপারিশমালা তৈরী করতে কমিটি গঠন করা প্রয়োজন।

সচিব শেখ মোহাম্মদ সলীম উল্লাহর বক্তব্যের আলোকে সভা শেষে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি সড়ক পরিবহন আইনের আগের ও পরের বিষয়গুলো আমলে নিয়ে পর্যালোচনা করে আগামী ১৫ মার্চের মধ্যে একটি সুপারিশমালা তৈরী করবে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের বীমা বিষয়ক অতিরিক্ত সচিবকে আহবায়ক এবং উপসচিবকে সদস্য সচিব করে ১১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, জননিরাপত্তা বিভাগের একজন প্রতিনিধি, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের একজন প্রতিনিধি, সেতু বিভাগের থেকে একজন, বিআরটিএ’র একজন, আইডিআরএ’র একজন, বিআইএ’র একজন, বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের (বিআইএফ) একজন, সাধারণ বীমা করপোরেশনের একজন এবং জীবন বীমা করপোরেশনের একজন প্রতিনিধি। এছাড়া গত ১০ বছরে মটরযানের বীমা দাবি উপস্থাপনের বিপরীতে পরিশোধের একটি তুলনামূলক চিত্র প্রস্তুত করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের পাঠানোর জন্য আইডিআরএ’কে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে প্রণীত সড়ক পরিবহন আইনের ৬০(১) ধারায় কোন মটরযানের আসন সংখ্যা অনুযায়ি নির্ধারিত যাত্রী ও তাদের বহনকৃত পণ্য বা সম্পদের বীমা করার বিষয়টি মটরযান মালিকের ইচ্ছাধীন রাখা হয়েছে। আবার ৬০(২) ধারায় মটরযানের মালিক বা প্রতিষ্ঠানকে যথানিয়মে বীমা করার বিষয়টি জানিয়ে একে বাধ্যতামূলক রূপ দেয়া হয়েছে। কেননা ৬০(৩) ধারায় মটরযানের ক্ষতি হলে ৫৩ ধারায় গঠিত আর্থিক তহবিল থেকে মটরযান মালিক কোন ক্ষতিপূরণ পাবেন না। এ বিষয়ে গত ১৩ জুন ২০২১ তারিখে তৃতীয় পক্ষের বীমা ঝুঁকি ও মটরযানের বীমা ঝুঁকির বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করে দৈনিক ব্যাংক বীমা অর্থনীতি ‘মটরযান বীমা : বাতিল নাকি বাধ্যতামূলক’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশ করে। এরপরই বিভিন্ন মহলে এ বিষয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।

Facebook Comments Box
✎ মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Posted ১২:৫৩ অপরাহ্ণ | সোমবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২২

bankbimaarthonity.com |

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com