আদম মালেক
বুধবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২ প্রিন্ট ৭৭২ বার পঠিত
আইন অনুযায়ী বীমা কোম্পানীতে একই পরিবার থেকে দুই জনের বেশী পরিচালক থাকার বিধান নেই। কিন্তু বীমা আইনের এ ধারার প্রতি বৃদ্ধাংগুলি প্রদর্শন করেছেন কর্ণফুলী ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন আহমেদ। তিনি পরিবার পরিজন নিয়ে চাঁদের হাট বসিয়েছেন কোম্পানীটিতে। কোম্পানীর পরিচালনা পর্ষদে স্থান পেয়েছে স্ত্রী দুই পুত্রও এক কন্যা। বাদ যায়নি দুই পুত্রবধুও। এভাবে দুই জনের জায়গায় সাত জনকে পরিচালনা পর্ষদের অন্তর্ভুক্ত করে কোম্পানীটিকে পারিবারিক প্রতিষ্ঠান বানিয়ে ফেলেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া টেনে এনেছেন নিজের আরেক বীমা কোম্পানী মেঘনা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মনোনীত পরিচালকেও। স্বার্থ সিদ্ধির জন্য নিজের স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান নিজাম হাসিনা ফাউন্ডেশনের মনোনীত পরিচালককেও কর্ণফুলী ইন্স্যুরেন্সের পরিচালনা পর্ষদে ঠাঁই দিতে ভুল করেননি। এতে কোনঠাসা অন্যান্য পরিচালক। কাগুজে বাঘে পরিণত স্বতন্ত্র পরিচালনকবৃন্দ। মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার জায়গায় ডিফেক্টো সিইও ক্রমেই প্রভাবশালী হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ করেছেন বিনিয়োগকারীরা।
বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন আহমেদ আইন লঙ্ঘন করে তার পরিবার থেকে ৭ জনকে পরিচালনা পর্ষদে জায়গা করে দিয়েছেন। এসব পরিচালকরা হলেন তার স্ত্রী হাসিনা নিজাম, কন্যা উম্মে খাদিজা মেঘনা, পুত্র রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ, পুত্রবধু শারমিন নাসির ও দিলরুবা শারমিন। আরেক পুত্র নাসির উদ্দিন আহমেদ পাভেল কোম্পানীর ভাইস চেয়ারম্যান। নিজ পরিবারের সাত জনকে এনেই ক্ষান্ত হননি । দল ভারী করার জন্য পরিচালনা পর্ষদে ডেকে এনেছেন নিজেদের আরেক কোম্পানী মেঘনা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মনোনীত পরিচালক এন সি রুদ্রকে। নিরঙ্কুশ ক্ষমতার জন্য পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বাইরে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নিজাম হাসিনা ফাউন্ডেশনের মনোনীত পরিচালক লে. কর্নেল(অব.) এম শামছুদ্দিন আহমেদকেও কর্ণফুলী ইন্স্যুরেন্সে বসিয়েছেন বলে জানিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা।
বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, আত্মীয় ও অনুগতদের বলে বলীয়ান নিজাম উদ্দিন আইনের তোয়াক্কা করছেন না। এখানে পরিপালন হয় না আইডিআরএ, বিএসইসি, আইএএস বা আইএফআরএসসহ হিসাব আইন । তাই সুশাসন স্বচ্ছতা ও জবাবদিাহতার জন্য এই বীমা কোম্পানীকে পরিবারের বলয় থেকে বের করে আনা দরকার বলে মনে করে অংশীজনরা।
বীমাকারীর নিবন্ধন প্রবিধানমালা,২০১৩ এর ৩(২)(খ) অনুসারে উদ্যোক্তা বা পরিচালকদের জীবনবৃত্তান্ত ফরম (বিউনিখ-খ) এর ১৮(ঠ) ক্রমিকে একই পরিবার থেকে ২ জনের বেশী পরিচালক থাকতে পারবে না বলে বিধান আছে।
অভিযোগ আছে, মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার পাশাপাশি ক্রমেই প্রভাবশালী হয়ে উঠছেন নিজাম উদ্দিনের আরেক পুত্র নাসির উদ্দিন পাভেল যিনি কোম্পানীর ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন। তিনি যেন ছায়া সিইও। তার আবদার ইচ্ছা অনিচ্ছা মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনে বাধা হয়ে উঠছে। এতে বিঘ্নিত হচ্ছে সুশাসন প্রতিষ্ঠা। নাসির উদ্দিন আহমেদ পাভেল কর্ণফুলীর ভাইস চেয়ারম্যান ছাড়াও বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্বেও রয়েছেন। তাঁরা পিতা-পুত্র উভয়ে বীমা উন্নয়ন ও সুশাসনে প্রতিনিয়ত যত্রতত্র ছবক দিয়ে যাচ্ছেন। বীমা খাতের অন্যন্য কোম্পানির সমস্যা নিয়ে আলোচনার জন্য বিভিন্ন সভা, সেমিনারে তাদের সরব উপস্থিতি। এ যেন বাতির নিচে অন্ধকার !
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান শেখ কবির হোসেন বলেন, পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের দুই এর অধিক সদস্যের উপস্থিতি বীমা আইনের লঙ্ঘন। আমরা সব সময় এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নিই।
কর্ণফুলী ইন্স্যুরেন্সের চেয়ারম্যানের নিজাম উদ্দিন আহমেদের কাছে এ অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজী হননি। তিনি বলেন,আমি এখন মিটিংয়ে। পরে কথা বলবো।
ভাইস চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন আহমেদ পাভেলের যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, কর্ণফুলী ইন্স্যুরেন্সের পরিচালকরা নিয়মানুযায়ী পরিচালনা পর্ষদে আছেন। এখানে আইনের কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। বীমা কোম্পানীর জন্য আইন প্রণয়নের সময় আমরা পাশে থাকি।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্বাহী পরিচালক এস এ শাকিল আক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, বীমা কোম্পানীতে একই পবিারের দুই জন থাকার বিধান রয়েছে। আমি শুনেছি, কোনো কোনো কোম্পানীতে একই পরিবারের তিন জন রয়েছে কিন্তু সাত জনের কথা জানতাম না। সাত জনের কথা এই প্রথম শুনলাম।
অনেক বীমা কোম্পানী নিজেদের ছেলেমেয়ে আত্মীয় স্বজন নিয়ে বোর্ড গঠন করার পায়তারা করেন। আবার অনেকে প্রাইভেট কোম্পানীর নামে শেয়ার ধারণ করে পরিচালনা বোর্ডে মনোনীত পরিচালক হিসেবে অংশগ্রহণ করে। এভাবে বীমা কোম্পানীতে পরিবারতন্ত্র বা আত্মীয়করণ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। এই পরিবারতন্ত্রের আড়ালে নানা অনিয়ম দুর্নীতি দেখা দেয়। এর মধ্যে রয়েছে মানি লন্ডারিং, বীমা আইন লঙ্ঘন, আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ ভঙ্গ । তাছাড়া কর্পোরেট গর্ভান্যান্স কোর্ড ও লিস্টিং আইন ভঙ্গ করাসহ নানা অপরাধ সংঘটিত হয়।
ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার্থে কেউ যদি সংক্ষুদ্ধ হয়ে কোম্পানির পরিচালনা বোর্ডের সদস্যদের অবৈধ সুবিধা গ্রহণের জন্য আইডিআরএ, বিএসইসি, এফ আর সি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও দুদুকের নিকট অভিযোগ করে তাহলে কোম্পানিকে চরমমূল্য দিতে হবে। যেমন- জরিমানা, গ্রুপ পরিবর্তন, বীমা লাইসেন্স বাতিল, প্রশাসক নিয়োগের মতো ঘটনারও আশঙ্কা রয়েছে বলে বিনিয়োগকারীরা জানান।
Posted ১২:৫৪ অপরাহ্ণ | বুধবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com
✎ মন্তব্য করুন