|

Advertisement
×
নিবন্ধন ফি বৃদ্ধি, ব্যবস্থাপনা ব্যয় হ্রাস

আইডিআরএ’র স্ববিরোধী প্রস্তাবে অংশীজনের আপত্তি

বুধবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৫   প্রিন্ট   ৫৫৬ বার পঠিত

আইডিআরএ’র স্ববিরোধী প্রস্তাবে অংশীজনের আপত্তি

দেশের লাইফ ও নন-লাইফ বীমা খাতে একদিকে ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমানো এবং অন্যদিকে বীমা ব্যবসা নিবন্ধন ফি বাড়ানোর প্রস্তাব দুটি উদ্যোগকেই সাংঘর্ষিক বা পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) এই পদক্ষেপ বীমা খাতের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
জানা যায়, সোমবার (২৭ অক্টোবর) এসব বিধিমালা সংশোধনের বিষয়ে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে পরামর্শমূলক মতবিনিময় সভা আয়োজন করে আইডিআরএ। সভায় বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ), বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামসহ খাতের বিভিন্ন অংশীজন অংশ নেন।

সভায় উপস্থিত একাধিক অংশীজন জানান, অধিকাংশ অংশগ্রহণকারীই আইডিআরএ’র প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছেন। তারা বলেন, একদিকে ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে নিবন্ধন ফি পাঁচগুণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এটি স্ববিরোধী সিদ্ধান্ত।

তাদের ভাষায়, “এতে কোম্পানিগুলোর ব্যবস্থাপনা ব্যয় আরও বাড়বে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের ওপর পড়বে।” অনেক প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান ব্যয়সীমা মানতেই হিমশিম খাচ্ছে এই অবস্থায় সীমা আরও কমিয়ে দিলে অনেক কোম্পানি নন-কমপ্লায়েন্স প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তারা।
অংশীজনরা বলেন, বর্তমান বাজারদর, মূল্যস্ফীতি এবং খরচ বৃদ্ধি বিবেচনায় ব্যয়সীমা কমানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। অফিস ভাড়া, কর্মচারী বেতন, প্রযুক্তি ও প্রশাসনিক খরচসহ সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বেড়েছে। ফলে প্রিমিয়াম ট্যারিফ অপরিবর্তিত রেখে ব্যয় কমানো বাস্তবসম্মত নয়।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ২০১৮ সালে প্রণীত ব্যবস্থাপনা ব্যয়সীমা ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক মান বিবেচনায় নির্ধারিত হয়েছিল। তাই নতুন করে ব্যয়সীমা কমানোর পরিবর্তে বিদ্যমান বিধিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করাই যথাযথ হবে।

তাদের দাবি, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ব্যয় কমানো সম্ভব নয়, বরং এতে কোম্পানিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং বীমা ব্যবসা আরও সংকুচিত হবে।
২০১৮ সালে বিধিমালা প্রণয়নের পর থেকে ইন্স্যুরেন্স রেট কমিশন (সিআরসি) একাধিকবার ফায়ার ও মেরিন ট্যারিফ কমিয়েছে, যার ফলে কোম্পানিগুলোর প্রিমিয়াম আয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। এই অবস্থায় ব্যবস্থাপনা ব্যয় (গধহধমবসবহঃ ঊীঢ়বহংব) আরও কমানো অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেন তারা।
এছাড়া মোটর বীমা বাধ্যতামূলক না থাকায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই খাতে ব্যবসার পরিমাণও ব্যাপকভাবে কমে গেছে। ফলে বীমা কোম্পানিগুলোর মোট আয় আগের তুলনায় অনেক কমে এসেছে।

শিল্প প্রতিনিধিদের মতে, ব্যবস্থাপনা ব্যয় সীমা কমানো হলে তা বাস্তবায়নযোগ্য হবে না। কারণ, ব্যয় বেশি হলে তা এনবিআর (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) “অতিরিক্ত ব্যয়” হিসেবে গণ্য করে কর আরোপ করবে। এতে কোম্পানিগুলো দ্বিগুণ আর্থিক চাপে পড়বে।

তারা আরও বলেন, “সব কিছুর দাম বেড়েছে অফিস ভাড়া, কর্মচারী বেতন, প্রযুক্তি ব্যয়, এমনকি প্রশাসনিক খরচও। কিন্তু প্রিমিয়াম ট্যারিফ বাড়েনি। ফলে বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থায় খরচ কমানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।”

শিল্প সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ২০১৮ সালের বিধিমালা যথেষ্ট সময় নিয়ে আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুসারে তৈরি হয়েছিল। তখন সবদিক বিবেচনা করেই ব্যয়সীমা নির্ধারণ করা হয়। তাই তারা মনে করেন, বর্তমান বিধিমালায় পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই; বরং তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করলেই খাতের শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে।
প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী, ১০ বছর বা তদূর্ধ্ব সময় ধরে ব্যবসায় থাকা লাইফ বীমা কোম্পানিগুলো প্রথম বর্ষ প্রিমিয়ামের সর্বোচ্চ ৮২ শতাংশ পর্যন্ত খরচ করতে পারবে যেখানে বর্তমানে এ সীমা ৯৩ শতাংশ। নবায়ন প্রিমিয়ামের ক্ষেত্রেও ব্যয়সীমা ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে নামানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

এদিকে, নন-লাইফ বীমা ব্যবসায়ও ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সীমা ধাপে ধাপে কমানোর প্রস্তাব এসেছে। খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম ১৫ কোটি টাকার জন্য অগ্নি ও অন্যান্য বীমায় ব্যয়সীমা ২৫ শতাংশ এবং নৌবীমায় ১৬ শতাংশ; পরবর্তী ধাপগুলোতে হার আরও কমবে।
অন্যদিকে, বীমা ব্যবসা নিবন্ধন নবায়ন ফি গ্রস প্রিমিয়ামের প্রতি হাজার টাকায় পাঁচগুণ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে আইডিআরএ। সংস্থাটি যুক্তি দিয়েছে, নিজেদের ভবন নির্মাণ, শাখা কার্যালয় স্থাপন, পেনশন-গ্র্যাচুইটি, জনবল বৃদ্ধি এবং পেশাদার প্রতিষ্ঠান যেমন বিসিআইআই, বিআইআইএম ও একচ্যুয়ারিয়াল সোসাইটি অব বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন।

তবে অংশীজনরা বলছেন, কর্তৃপক্ষের এসব প্রকল্পের ব্যয়ভার বীমা কোম্পানির তহবিলের ওপর চাপিয়ে দেওয়া অনুচিত। অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক বা বিএসইসি তাদের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানের আয়ের ওপর কোনো নবায়ন ফি ধার্য করে না।
প্রসঙ্গত, আইডিআরএ আইন-২০১০ অনুযায়ী কর্তৃপক্ষের তহবিলের উৎসের প্রথমেই সরকারের অনুদানের কথা বলা আছে। কিন্তু বর্তমানে আইডিআরএ সেই সুযোগ না নিয়ে সরাসরি বীমা কোম্পানির ওপর অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চাপাতে চাইছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, নিবন্ধন ফি বাড়ানো এবং ব্যবস্থাপনা ব্যয় কমানো দুটি প্রস্তাবই বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং খাতের প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করবে। তাদের দাবি, আইডিআরএ যদি প্রকৃতপক্ষে বীমা খাতকে শক্তিশালী করতে চায়, তবে প্রথমে বিদ্যমান বিধিমালার কার্যকর প্রয়োগ ও প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোর দিকেই মনোযোগ দেওয়া উচিত।

 

 

 

Facebook Comments Box
✎ মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Posted ০৯:৪৭ অপরাহ্ণ | বুধবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৫

bankbimaarthonity.com |

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com