নিজস্ব প্রতিবেদক | রবিবার, ০৯ নভেম্বর ২০২৫ | প্রিন্ট | 357 বার পঠিত
‘বীমা কর্পোরেশন আইন ২০১৯’এর প্রস্তাবিত সংশোধনী রাষ্ট্রীয় স্বার্থের বিপক্ষে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন আন্দোলনরত সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের (এসবিসি) কর্মচারী ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা। একইসঙ্গে এ আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী বাতিলের দাবি জানিয়েছেন তারা। রোববার (৯ নভেম্বর) পূর্বনির্ধারিত মানববন্ধন কর্মসূচি থেকে এ আহ্বান জানান তারা। আন্দোলনকারীরা বলছেন, প্রস্তাবিত সংশোধনীর ফলে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের অস্তিত্ব বিপন্ন হতে পারে। তাদের অভিযোগ, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) স্টেকহোল্ডারদের মতামত ছাড়াই একতরফাভাবে আইনটির খসড়া প্রণয়ন করেছে, যা দেশের বীমা শিল্পে অস্থিরতা ও দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি করবে।
মানববন্ধনে সাধারণ বীমা কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি কাজী আবদুর রহিম, সাধারণ সম্পাদক মো. হানিফ, সাবেক সভাপতি ম. রফিকুর রহমান, সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো: আলী হোসেন, সাধারণ বীমার সহকারী ব্যবস্থাপক মো: সাজ্জাদ হোসেনসহ শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী অংশ নেন। বক্তারা অভিযোগ করেন, সংশোধন প্রস্তাবের মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠান এসবিসিকে দুর্বল করার চক্রান্ত চলছে, যা দেশের সরকারি বীমা খাতের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হবে।
সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো: আলী হোসেন বলেন, এই আইন সংশোধন করা হলে সরকারি খাত চরম ক্ষতির মুখে পড়বে। তাই কোনোভাবেই এই সংশোধন হতে দেয়া হবে না। একইভাবে সাবেক সভাপতি ম. রফিকুর রহমান বলেন, বেসরকারি খাতে পুনর্বীমা ব্যবসা চলে গেলে সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাবে। এসবিসিতে এই ব্যবসা থাকলে বীমা কোম্পানিগুলো নিরাপদ থাকবে।
এ সময় বীমা কর্পোরেশন আইনে সংশোধনের প্রস্তাবনা প্রত্যাহারের দাবিতে সোমবার সংশ্লিষ্টদের কাছে স্মারকলিপি দেয়ার ঘোষণা দেন তারা।
এ দাবিতে ইতিবাচক সাড়া না পেলে সরকারের অন্যান্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরেও অবস্থান নেয়া হবে বলে জানান ইউনিয়ন নেতারা।
মানববন্ধন শেষে সাধারণ বীমা কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি কাজী আবদুর রহিম ও সাধারণ সম্পাদক মো. হানিফ প্রস্তাবিত সংশোধনীর কয়েকটি ধারা বিশ্লেষণ করে আপত্তি তুলে ধরেন। তারা বলেন, প্রস্তাবিত আইনের ধারা-১৬ তে ‘সরকারি সম্পত্তি’র সংজ্ঞা পরিবর্তন এবং এসবিসির ১০০ শতাংশ সরকারি সম্পত্তির বীমা কভারেজ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা শিথিল করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠান নিজেদের বেসরকারি বলে দাবি করে সরাসরি বেসরকারি বীমা কোম্পানির কাছে যেতে পারবে যা দুর্নীতি ও আর্থিক লেনদেনের নতুন দুয়ার খুলে দেবে।
তাদের দাবি, এতে সরকারি খাতের শত শত কোটি টাকার বীমা ব্যবসা ৫-৬টি প্রভাবশালী নন-লাইফ বীমা কোম্পানির হাতে চলে যেতে পারে। এতে সাবীক এবং তুলনামূলক দুর্বল ৩০-৪০টি কোম্পানি বাজার থেকে ছিটকে পড়বে।
বীমা কর্পোরেশন আইন, ২০১৯ এর ধারা-১৬ মোতাবেক সাধারণ বীমা কর্পোরেশন সরকারি সম্পত্তির শতভাগ বীমা কভারেজ দিয়ে আসছে এবং সরকারি খাতের আহরণকৃত ব্যবসার ৫০ শতাংশ ৪৫ টি নন-লাইফ বীমা কোম্পানিকে সমহারে বন্টন করে আসছে।
প্রস্তাবিত বীমা কর্পোরেশন আইনের উক্ত ধারায় সরকারি সম্পত্তির ব্যাখায়/সংজ্ঞায় ব্যাপক পরিবর্তন আনায়ন করা এবং সাবীক কর্তৃক শতকরা একশত ভাগ অবলিখনের বাধ্যবাধকতা শিথিল করার যে প্রস্তাব করা হয়েছে তা বাস্তবায়িত হলে দেশের বীমা শিল্পে অরাজকতা, দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তপনা বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।
কারণ প্রস্তাবিত আইনের সুযোগ নিয়ে যেমনিভাবে কিছু কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাগণ নিজেদের প্রতিষ্ঠানকে বেসরকারি হিসেবে দাবী করার সুযোগ পাবে, তেমনিভাবে কিছু কিছু সরকারি প্রতিষ্ঠান বীমাকরণের
সময় বিভিন্ন অযুহাতে সরকারি সম্পত্তির সংজ্ঞা শিথিল করার জন্য ব্যাপক সংখ্যায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, অর্থমন্ত্রণালয়ে এবং আইডিআরএ বরাবর আবেদন করতে থাকবে। ফলশ্রুতিতে সরকারি সম্পত্তির ব্যাখা/সংজ্ঞা নির্ধারণকারী সংশ্লিষ্ট বিভাগ এবং দেশের নন-লাইফ বীমা বাজার নিয়ন্ত্রণকারী বড় বড় ৫-৬ টি বীমা কোম্পানির মধ্যে বিপুল পরিমাণ অবৈধ আর্থিক লেনদেনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এভাবে শত শত কোটি টাকার সরকারি খাতের বীমা ব্যবসা বেসরকারি খাতের কয়েকটি অতি প্রভাবশালী নন-লাইফ বীমা কোম্পানির নিকট হস্তান্তরের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পরিণতিতে সাবীক এবং অবশিষ্ট ৩৯-৪০টি দুর্বল বীমা কোম্পানি ওই অংশের বীমা প্রিমিয়াম থেকে বঞ্চিত হবে। এর ফলে গুটিকয়েক অতি প্রভাবশালী নন-লাইফ বীমা কোম্পানি আর্থিকভাবে আরও ফুলে-ফেঁপে উঠবে এবং অবশিষ্ট ৩৯-৪০ টি বীমা কোম্পানি অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। তাই সরকারি সম্পত্তির ব্যাখ্যায়/সংজ্ঞায় কোন ধরণের পরিবর্তন না আনার দাবি জানান আন্দোলনকারীরা।
নতুন আইনে সরকারি প্রকল্পে বিদেশি অর্থায়ন থাকলে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং থাকা বীমা কোম্পানিকেই কভারেজের অনুমতি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। আন্দোলনকারীদের মতে, এর ফলে বিদেশি বীমা কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের প্রকল্পে প্রবেশ করবে, মানি লন্ডারিং ও বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের ঝুঁকি বাড়বে। তারা বলেন, আন্তর্জাতিক রেটিং থাকার বিষয়ে নতুনভাবে ধারা ১৬ এ যা সংযোজিত হয়েছে তা বাস্তবায়িত হলে সরকারি সম্পত্তিতে বিদেশী অর্থায়ন রয়েছে- এ অযুহাতে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি বীমা কোম্পানী নিকট হতে উক্ত সম্পত্তির বীমা কভারেজ নিতে পারবে। এর ফলে মানিলন্ডারিং অপরাধ সংগঠিত হওয়ার পাশাপাশি দেশের আর্থিক ক্ষতি হবে যা আমরা হতে দিতে পারি না। সাধারণ বীমা কর্পোরেশন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পদ্মা বহুমুখী সেতু, মাতারবাড়ি, রামপাল ও পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, এমআরটি লাইন-১, পদ্মা রেল লিংক, দোহাজারী-কক্সবাজার রেল লাইন, যমুনা রেল সেতু ও বাংলাদেশ স্যাটেলাইটসহ সরকারি সকল অবকাঠামো নির্মাণ, স্থাপন ও পরিচালনের বীমা রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টার হিসেবে আন্তর্জাতিক মানদন্ডে (ক্রেডিট রেটিং) সফলভাবে সম্পন্ন করেছে।
বাংলাদেশে সরকারি বা বেসরকারি কোন প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কোন ক্রেডিট রেটিং প্রতিষ্ঠান হতে নির্দিষ্ট মানের ক্রেডিট রেটিং নেই। আন্তর্জাতিক রেটিং করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি কাজ। সাবীক-এর কোন আন্তর্জাতিক মানের ক্রেডিট রেটিং না থাকলেও রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি আছে।
ইউনিয়ন নেতারা বলেন, সরকার অনুমতি দিলে যে কোন সময় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কোন রেটিং প্রতিষ্ঠান থেকে সাবীকের ক্রেডিট রেটিং করানো সম্ভব এবং সেক্ষেত্রে সাবীক সর্বোচ্চ মানের ক্রেডিট রেটিং পাবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। তাই সরকার বা কর্তৃপক্ষের অধীন পরিচালিত প্রকল্প বা সরকারি কোন সম্পত্তিতে বিদেশী অর্থায়ন সংশ্লিষ্ট থাকলে ক্রেডিট রেটিং নেই- এ অযুহাতে বিদেশী বীমা কোম্পানীর সঙ্গে বীমা করা সংক্রান্ত বিধান প্রস্তাবিত আইনে রাখা কোনক্রমেই যৌক্তিক নয়। সাধারণ বীমা কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক বলেন, প্রস্তাবিত আইনে ২০১৯ সনের বীমা কর্পোরেশন আইনের ১৭ ধারা বিয়োজনের প্রস্তাবে দেশের বেসরকারি কোম্পানীগুলোর সাবীকের নিকট পুনঃবীমা করার (পূর্বে ৫০% পুনঃবীমা বিদেশে করার বিষয়টি ঙঢ়ঃরড়হধষ ছিল) বাধ্যবাধকতা তুলে দেয়া হয়েছে। বিষয়টিকে আমরা সাধারণ বীমা কর্পোরেশনকে হেয় প্রতিপন্ন করা, আর্থিকভাবে দুর্বল করা এবং পুনঃবীমা প্রিমিয়াম পরিশোধের উসিলায় দেশের টাকা বিদেশে পাচার করে দেশের/সরকারের আর্থিক ভিত দুর্বল করার ষড়যন্ত্র বলে মনে করছি। এ বিষয়ে আমরা বলতে চাই যে, মাথা ব্যাথা করলে মাথা কেটে ফেলা যায় না। এ জন্য চিকিৎসার প্রয়োজন হয় । তাই সাবীকের পুনঃবীমা সেবা নিয়ে কোন ধরনের অভিযোগ থাকলে তা নিরসনে মন্ত্রণালয়, আইডিআরএ এবং সাবীক যৌথভাবে উক্ত অভিযোগ নিরসনের ব্যবস্থা নিতে পারে ।
নেতৃবৃন্দ বলেন, ২০১৯ সনের বীমা কর্পোরেশন আইনের ৯ এর উপ-ধারা ‘ছ’ সংযোজনের মাধ্যমে কর্পোরেশনের পরিচালনা বোর্ডের সদস্য সংখ্যা ৭ জনের স্থলে ৪ জন বৃদ্ধি করে ১১ জন করা হয়েছিল। নতুন আইনে পরিচালকের সংখ্যা আরো ২ জন বৃদ্ধি করে ১৩ জন করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আমরা এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করছি। কারণ ২০১৯ এর আইনে ৪ জন বৃদ্ধি করে ১১ জন করায় কর্পোরেশন কোনভাবেই লাভবান হয়নি। তাই আমরা পূর্বের ন্যায় ৭ জন পরিচালক রাখা এবং উক্ত ৭ জনের মধ্যে অধিকসংখ্যক বীমাবিদ রাখার জন্য অনুরোধ করছি। সাধারণ বীমা কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি কাজী আবদুর রহিম ও সাধারণ সম্পাদক মো. হানিফ বলেন, সাবীক প্রতি বছর সরকারকে উল্লেখযোগ্য হারে রাজস্বের (ভ্যাট, আয়কর, উৎসেকর ও লভ্যাংশ) যোগান দিয়ে থাকে। সাবীকের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে গত ২০২৩ সালে ২৯৮.৮৭ কোটি টাকা এবং গত ২০২২ সালে ২৭০.৫৩ কোটি টাকা জমা করা হয়েছে। গত ১০ বছরের তথ্য অনুযায়ী সাবীক এ খাতে মোট জমা দিয়েছে ২,৮৮০ কোটি টাকা। এ ধারা অব্যাহত না থাকলে সরকারের রাজস্ব আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং লাভজনক রাষ্ট্রীয় এ প্রতিষ্ঠানটি অচিরেই অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিনত হবে। ফলে এ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ১১৬২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। একইসাথে ১,৫৬৩ জন পেনশনভোগীর ভাগ্যও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়বেন শিক্ষানবিস কর্মকর্তা-কর্মচারীগণও ।
Posted ৯:১৮ অপরাহ্ণ | রবিবার, ০৯ নভেম্বর ২০২৫
bankbimaarthonity.com | rina sristy