বিশেষ প্রতিবেদক
মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬ প্রিন্ট ১০১ বার পঠিত
জীবন বীমা খাতের সাতটি কোম্পানিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পর্যবেক্ষণে এনেছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। কোম্পানিগুলোর কাছে আটকে থাকা গ্রাহকের প্রায় ৪ হাজার ১০০ কোটি টাকার বীমা দাবি পরিশোধে গতি আনতে নেয়া হয়েছে বেশ কিছু পদক্ষেপ। এরই মধ্যে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের প্রথম বর্ষের প্রিমিয়াম সংগ্রহ ও নতুন পলিসি ইস্যুতে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। কোম্পানির বিনিয়োগ ও সম্পদ নগদায়ন করে দেয়া হয়েছে দাবি পরিশোধের নির্দেশনাও।
আইডিআরএর একটি দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, অগ্রাধিকার তালিকায় থাকা ঝুঁকিপূর্ণ অন্যান্য কোম্পানির ক্ষেত্রেও পর্যায়ক্রমে এ ধরনের নির্দেশনা দিতে পারে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
আইডিআরএর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৩৬টি জীবন বীমা কোম্পানির কাছে গ্রাহকের বীমা দাবি বাবদ পাওনা প্রায় ৪ হাজার ৪১০ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ১০০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে সাতটি কোম্পানির কাছে। যেগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নজরদারিতে নিয়েছে আইডিআরএ। এই সাত কোম্পানির মধ্যে রয়েছে বায়রা লাইফ ইন্স্যুরেন্স, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, গোল্ডেন লাইফ, হোমল্যান্ড লাইফ, পদ্মা ইসলামী লাইফ, প্রোগ্রেসিভ লাইফ ও সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্স।
আইডিআরএর সূত্র বলছে, গ্রাহকের দাবি পরিশোধ নিশ্চিত করতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা কোম্পানিগুলোর বিধিবদ্ধ সঞ্চয় ও বিনিয়োগ সংরক্ষণ করে অন্যান্য বিনিয়োগ ও সঞ্চয় নগদায়ন করে সেই অর্থ দিয়ে গ্রাহকের দাবি পরিশোধের নির্দেশনা দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইডিআরএ। পাশাপাশি কোম্পানির মালিকানাধীন জমি ও ভবনের সম্পদের মূল্য দ্রুত নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সেগুলো বিক্রি করতে হবে। বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থও দাবি পরিশোধে ব্যবহার করার নির্দেশ দেয়া হতে পারে।
একই সঙ্গে সাবসিডিয়ারি কোম্পানি কিংবা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে থাকা শেয়ার ও বিনিয়োগ পর্যায়ক্রমে নগদায়ন করে সেই অর্থও দাবি পরিশোধে ব্যবহারের নির্দেশনা দেয়া হতে পারে।
এ বিষয়ে আইডিআরএ’র গণমাধ্যম পরামর্শক ও মুখপাত্র সাইফুন্নাহার সুমি সম্প্রতি ব্যাংক বীমা অর্থনীতির সঙ্গে আলাপকালে বলেন, বীমা গ্রাহকের দাবি পরিশোধ নিশ্চিত করতে আমরা সাতটি কোম্পানিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পর্যবেক্ষণের আওতায় এনেছি। এসব কোম্পানির কাছে ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি দাবি রয়েছে। এসব দাবি দ্রুত পরিশোধের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে তাৎক্ষণিক কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কোম্পানিগুলোকে বলা হয়েছে, বিধিবদ্ধ সঞ্চয় ব্যতীত তাদের যেসব বিনিয়োগ ও সঞ্চয় রয়েছে, সেগুলো এনক্যাশ করে সেই অর্থ দিয়ে অবিলম্বে গ্রাহকের দাবি পরিশোধ করতে হবে। পাশাপাশি, প্রতিটি কোম্পানির মালিকানাধীন জমি ও ভবনের সম্পদের মূল্য দ্রুত নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় বিক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে এবং সেখান থেকে প্রাপ্ত অর্থও দাবি পরিশোধে ব্যবহার করতে হবে। এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সাইফুন্নাহার সুমি বলেন, এছাড়া আগস্ট মাসের মধ্যেই কোম্পানিগুলোকে জানাতে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে তারা কত টাকা দাবি পরিশোধ করতে সক্ষম হবে। একই সঙ্গে তাদের যেসব সাবসিডিয়ারি কোম্পানি রয়েছে কিংবা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে শেয়ার ও বিনিয়োগ রয়েছে, সেগুলো পর্যায়ক্রমে এনক্যাশ করে সেই অর্থও গ্রাহকের দাবি পরিশোধে ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আইডিআরএ মুখপাত্র বলেন, ২০২৬ সালের মধ্যেই সব কোম্পানিকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ দাবি পরিশোধ নিশ্চিত করার জন্য তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এরপরও কোনো কোম্পানি নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে প্রচলিত আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ফারইস্টের পর অন্যদের নিয়েও ভাবনা:
এরই মধ্যে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের প্রথম বর্ষের প্রিমিয়াম সংগ্রহ এবং নতুন বীমা পলিসি ইস্যুতে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে আইডিআরএ। কোম্পানিটিকে সিকিউরিটিজ বন্ডে বিনিয়োগ করা ৬ কোটি টাকা সাত দিনের মধ্যে উত্তোলন করে দাবি পরিশোধে ব্যয় করতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৬ সালের মধ্যে ১ হাজার কোটি টাকার বকেয়া দাবি কীভাবে পরিশোধ করা হবে, সে বিষয়ে চলতি আগস্ট মাসের মধ্যে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা জমা দিতে বলা হয়েছে।
আইডিআরএর এই সিদ্ধান্তকে অগ্রাধিকারভুক্ত কোম্পানিগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। দীর্ঘদিন ধরে দাবি পরিশোধে ব্যর্থ কোনো কোম্পানি পরিস্থিতির উন্নতি করতে না পারলে ফারইস্টের মতো প্রথম বর্ষের প্রিমিয়াম সংগ্রহ ও নতুন পলিসি ইস্যুতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে।
সম্পদ বিক্রি করে দাবি পরিশোধ:
সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে আইডিআরএর চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন বলেছেন, প্রথম পর্যায়ে সাতটি কোম্পানির বকেয়া দাবি পরিশোধে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এ জন্য কোম্পানিগুলোর জমি বিক্রি, এফডিআর ভাঙানো, বিভিন্ন বিনিয়োগ থেকে অর্থ তুলে আনা এবং ট্রেজারি বন্ডে থাকা অর্থ ব্যবহার করে দাবি পরিশোধের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রয়োজনে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করা হবে বলেও জানান তিনি।
চেয়ারম্যান বলেন, সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর জমি, ট্রেজারি বন্ড, বিভিন্ন বিনিয়োগ ও অন্যান্য সম্পদ ধাপে ধাপে বিক্রি করে পাওয়া অর্থ পৃথক ব্যাংক হিসাবে সংরক্ষণ করা হবে। প্রতিটি কোম্পানির জন্য আলাদা হিসাব থাকবে এবং পুরো প্রক্রিয়ায় নিরীক্ষক যুক্ত থাকবেন।
এরপর ‘ফার্স্ট ইন, ফার্স্ট আউট’ বা এফআইএফও পদ্ধতিতে দাবি পরিশোধ করা হবে। অর্থাৎ যে গ্রাহকের দাবি আগে জমা পড়েছে, তাঁকে আগে অর্থ পরিশোধ করা হবে।
আইডিআরের এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো নতুন করে গ্রাহকের দায় না বাড়িয়ে পুরোনো বকেয়া দাবি কমানো। অগ্রাধিকারভুক্ত কোম্পানিগুলোর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের পর পরবর্তী ধাপে অন্য ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানির ক্ষেত্রেও একই ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
Posted ০৮:৩৭ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com