অনলাইন ডেস্ক
মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬ প্রিন্ট ২৩ বার পঠিত
বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাতে উৎপাদন বৃদ্ধির সুফল মিলতে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও। অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাড়ছে দুধ, মাংস, ডিম ও অন্যান্য প্রাণিজ পণ্যের রপ্তানি। চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট—ছয় মাসে এ খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ১ কোটি ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৭২৭ মার্কিন ডলার। আগের ছয় মাসের তুলনায় আয় বেড়েছে ২১৭ দশমিক ২০ শতাংশ।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ছয় মাসে প্রাণিজ পণ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছিল ৩২ লাখ ৯৮ হাজার ৬৬২ ডলার। পরবর্তী ছয় মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৭২৭ ডলারে। অর্থাৎ ছয় মাসে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৭১ লাখ ৬৫ হাজার ৬৫ ডলার।
মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানেও রপ্তানি আয়ের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৬ সালের মার্চে রপ্তানি আয় ছিল ৬ লাখ ৭৮ হাজার ১২৯ ডলার। এপ্রিলে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ লাখ ৪৮ হাজার ৯০৩ ডলারে। মে মাসে কিছুটা কমে ৭ লাখ ৫০ হাজার ৮০৮ ডলার হলেও জুনে আবার বেড়ে হয় ১১ লাখ ৯৮ হাজার ৭৭৮ ডলার। জুলাইয়ে আয় হয় ১৯ লাখ ৫ হাজার ১৪ ডলার। আগস্টে এক লাফে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৮ লাখ ৮২ হাজার ৯৫ ডলারে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, শুধু আগস্ট মাসেই যে রপ্তানি আয় হয়েছে, তা আগের ছয় মাসের সম্মিলিত আয়ের চেয়েও বেশি।
রপ্তানি আয়ের এই প্রবৃদ্ধি পরবর্তী অর্থবছরেও অব্যাহত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রাণিজ পণ্য রপ্তানি করে আয় হয়েছে ২ কোটি ৪৭ লাখ ২৩ হাজার ৬৩৮ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৩০৯ কোটি ৪ লাখ ৫৪ হাজার ৭৮১ টাকা।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে হালাল পণ্যের চাহিদা এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের উদ্যোগ এ খাতের সম্ভাবনা বাড়াচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান নিশ্চিত করতে পণ্যের গুণগত মান, খাদ্যনিরাপত্তা, রোগ নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামোর উন্নয়ন জরুরি।
প্রাণিজ পণ্য রপ্তানিতে গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। প্রাণিসম্পদ খাতের রপ্তানি বিবরণী অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে এ খাত থেকে আয় হয়েছিল ৫১ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৮ কোটি ৭ লাখ টাকায়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানি আয় আরও বেড়ে হয় ৯৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।
তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রপ্তানি আয় কমে ৫৮ কোটি ৫২ লাখ টাকায় নেমে আসে। পরবর্তী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭২ কোটি ৪৫ লাখ টাকায়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রাণিজ পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১০২ কোটি ৫১ লাখ টাকা।
অন্যদিকে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে রপ্তানি আয় ৩০৯ কোটি ৫ লাখ টাকা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে প্রাণিসম্পদ খাত দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন উৎস হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশ থেকে বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের প্রাণিজ পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে মাংস ও মাংসজাত পণ্য, বুল স্টিক, দধি, রসমালাই, মিষ্টি, হাঁসের পালক, জিলেটিন, গরুর লেজের লোম, কবুতর, ওম্যাজাম, মোগলাই পরোটা, মহিষ ও গরুর শিং, টুকরা চামড়া এবং ভেটেরিনারি মেডিসিন সাপ্লিমেন্ট।
এসব পণ্যের বাজার ছড়িয়ে রয়েছে মালদ্বীপ, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, নাইজেরিয়া, ভিয়েতনাম, চীন, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, মালয়েশিয়া, মিসর, কুয়েত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং ও নেপালসহ বিভিন্ন দেশে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাতকে রপ্তানিমুখী শিল্পে রূপান্তরের লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী নিরাপদ, মানসম্মত ও হালাল প্রাণিজ পণ্য উৎপাদনে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, এ লক্ষ্যে প্রাণীরোগ নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক খামার ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার ও সনদায়ন ব্যবস্থা এবং নতুন রপ্তানি বাজার অনুসন্ধানে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। হ্যাচিং এগ রপ্তানির মাধ্যমে এ খাতের আন্তর্জাতিক সম্ভাবনা ইতোমধ্যে উন্মোচিত হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনই সরকারের লক্ষ্য।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, প্রাণিজ পণ্যের উৎপাদন ও গুণগত মান বৃদ্ধি, নিরাপদ ও রোগমুক্ত উৎপাদনব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ খাতের রপ্তানি বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি খামারি ও উদ্যোক্তারাও লাভবান হবেন। জাতীয় অর্থনীতিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান আরও বাড়বে।
প্রাণিজ পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধির পেছনে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ সময়ে দেশে দুধ উৎপাদিত হয়েছে ১৫৭ দশমিক ৫৩ লাখ টন। আগের অর্থবছরে উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ১৫৫ দশমিক ৩৮ লাখ টন। অর্থাৎ এক বছরে দুধ উৎপাদন বেড়েছে ২ দশমিক ১৫ লাখ টন।
দুধ উৎপাদন বাড়াতে গবাদিপশুর জাত উন্নয়ন, উন্নত পশুখাদ্য সরবরাহ, রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং খামার ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় ৪ হাজার ২৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বাজারসংযোগ, প্রাণিবীমা এবং দুধের ভোক্তা তৈরিতে কাজ করা হয়েছে। পাশাপাশি স্কুল ফিডিং কার্যক্রমের মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে দুধ পানের অভ্যাস গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মাংস উৎপাদনেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মাংস উৎপাদিত হয়েছিল ৮৯ দশমিক ৫৪ লাখ টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯০ দশমিক ৭০ লাখ টনে। একই সময়ে দেশে গরুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫৩ দশমিক ২৯ লাখ এবং ছাগলের সংখ্যা ২৭৪ দশমিক ৬৫ লাখে।
পোলট্রি খাতেও উৎপাদন বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে ডিম উৎপাদিত হয়েছে ২ হাজার ৫০৯ কোটি ৪১ লাখ। আগের অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৪৪০ কোটি ৬৫ লাখ। ফলে এক বছরে ডিম উৎপাদন বেড়েছে ৬৮ কোটি ৭৬ লাখ।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট পরিবারের ৪৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে প্রাণিসম্পদ ও পোলট্রি পালনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর মধ্যে ১১ দশমিক ১৫ শতাংশ পরিবার শুধু প্রাণিসম্পদ পালন এবং ২৩ দশমিক ৫২ শতাংশ পরিবার শুধু পোলট্রি পালনের সঙ্গে যুক্ত।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ছিল ১ দশমিক ৮১ শতাংশ। মোট কৃষিজ জিডিপিতে এ খাতের অংশ ১৬ দশমিক ৫৬ শতাংশ। এ সময়ে খাতটির জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩ দশমিক ৩০ শতাংশ।
উৎপাদন বাড়লেও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে আরও পরিকল্পিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. দীন ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের উৎপাদকদের অনেক ক্ষেত্রে বাজার গবেষণা ও বিপণনে ঘাটতি রয়েছে। পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি কোন দেশের বাজারে কোন ধরনের পণ্যের চাহিদা রয়েছে, তা বুঝতে হবে। ব্র্যান্ডিং ও প্যাকেজিংয়ের মান উন্নয়নের পাশাপাশি বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান বলেন, বিশ্বজুড়ে হালাল অর্থনীতির প্রসার ঘটছে। বাংলাদেশও এ সম্ভাবনা কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। এ লক্ষ্যে প্রাণিসম্পদ খাতে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা এবং প্রাণিজ খাদ্যপণ্য উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফিডমিলগুলোতে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত ২০০টি ফিডমিল বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি বাড়াতে পণ্যের গুণগত মান, খাদ্যনিরাপত্তা, রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি মানদণ্ড অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষাগার, আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা, প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা এবং মানসম্মত প্যাকেজিং সুবিধা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, উন্নত খাদ্যব্যবস্থাপনা, সবুজ ঘাসের উৎপাদন বৃদ্ধি, বায়োগ্যাস প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কার্বন ব্যালান্সিং পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব প্রাণিসম্পদ খাত গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে। ভালো মানের পণ্য উৎপাদন নিশ্চিত করা গেলে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ডিম, দুধ ও মাংস রপ্তানিও বাড়ানো সম্ভব হবে।
Posted ১২:৫২ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | Animator Alif
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com
✎ মন্তব্য করুন