|

Advertisement
×

বীমা আইন সংশোধন ও রেজুলেশন অধ্যাদেশ : পুঁজিবাজারে নেতিবাচক প্রভাবের শঙ্কা

বুধবার, ১৯ নভেম্বর ২০২৫   প্রিন্ট   ৫১৫ বার পঠিত

বীমা আইন সংশোধন ও রেজুলেশন অধ্যাদেশ : পুঁজিবাজারে নেতিবাচক প্রভাবের শঙ্কা

বীমা আইন ২০১০এর প্রস্তাবিত সংশোধনী ও নতুন বীমাকারী রেজুলেশন অধ্যাদেশের খসড়া প্রস্তাবগুলো বহাল রেখে অনুমোদন হলে দেশের পুঁজিবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, আলোচনার পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে ও গভীরভাবে পর্যালোচনা, গবেষণা না করে দ্রুত আইন পরিবর্তনের উদ্যোগ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারে। তাদের মতে, বিশেষজ্ঞ প্যানেল ও অংশীজনের সঙ্গে যথেষ্ট আলোচনা ছাড়া নীতিগত পরিবর্তন আনা হলে তালিকাভুক্ত বীমা কোম্পানি, বিনিয়োগকারী এবং সামগ্রিক বাজারে নেতিবাচক চাপ দেখা দেবে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পুঁজিবাজারে ৫৮টি জীবন ও সাধারণ বীমা কোম্পানি তালিকাভুক্ত রয়েছে, যা বাজারের মোট লেনদেন ও মার্কেট ক্যাপের উল্লেখযোগ্য অংশ। এ খাতে যেকোনো নীতিগত পরিবর্তন সরাসরি বাজারে প্রভাব ফেলে।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রায় অর্ধশতাধিক জীবন ও সাধারণ বীমা কোম্পানির শেয়ার লেনদেন উল্লেখযোগ্য অংশজুড়ে রয়েছে। নতুন নীতিমালা কার্যকর হলে এসব কোম্পানির আর্থিক অবস্থা, শেয়ারহোল্ডার অধিকার এবং পরিচালনা কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে-যা বাজারে অস্থিরতা তৈরি করবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সংশোধিত আইন ও রেজুলেশন অধ্যাদেশে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএকে বীমা কোম্পানির পর্ষদ ভেঙে প্রশাসক নিয়োগের ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হলে তা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ‘ঝুঁকি সংকেত’ হিসেবে দেখা হবে। এতে তালিকাভুক্ত অনেক কোম্পানির শেয়ারের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।

তারা আরও বলেন, কোনো কোম্পানিকে ‘সমস্যাগ্রস্ত বীমা প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে ঘোষণা করা হলে তার শেয়ারমূল্য আকস্মিকভাবে পড়ে যেতে পারে, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলবে। তাছাড়া, রেজুলেশন ব্যবস্থায় জোরপূর্বক পুনর্গঠন, বিশেষ অডিট কিংবা সম্পদ পুনর্মূল্যায়নের বাধ্যবাধকতা আসলে আর্থিক প্রতিবেদন নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়বে।

এদিকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও নীতির স্থিতিশীলতাকে বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে বিবেচনা করে। তাই আলোচনার পর্যাপ্ত সময় ছাড়া তড়িঘড়িভাবে আইন সংশোধন করা হলে তারা এ খাতে সম্ভাব্য বিনিয়োগ থেকে পিছিয়ে যেতে পারেন।
বাজার সংশ্লিষ্টদের দাবি, নির্বাচিত সরকারের অধীনে পর্যালোচনা, স্টেকহোল্ডারদের মতামত গ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিলে পুঁজিবাজারে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হতো না। তড়িঘড়ি সংশোধন বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করবে বলে তারা মনে করেন। তারা বলেন, প্রস্তাবিত আইন ও অধ্যাদেশ নিয়ে সেমিনার হতে পারে, আরো বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে।

বিনিয়োগকারীদের প্রশ্ন-স্বচ্ছতা বাড়ানোর নামে যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণে শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার সংকুচিত হয়, বা ডিভিডেন্ড নীতি অনিশ্চিত হয়, তা হলে এর প্রভাব সরাসরি বাজারে পড়বে।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই মুহূর্তে সবচেয়ে প্রয়োজন আস্থা পুনরুদ্ধার এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। না হলে বীমা সেক্টরকে ঘিরে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা পুরো বাজারেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

সংশোধনী খসড়ায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএকে কোম্পানির বোর্ড ভেঙে প্রশাসক নিয়োগ, অবসায়ন ও বিশেষ অডিট পরিচালনার ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে হঠাৎ প্রশাসক নিয়োগ হলে তার শেয়ারের দাম কয়েক দিনের মধ্যে বড় ধরনের পতনের ঝুঁকি রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রেজুলেশন অর্ডিন্যান্স যদি খুব কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে দুর্বল অবস্থায় থাকা বীমা কোম্পানিগুলো ‘ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায়’ পড়ে যাবে। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
পর্যাপ্ত আলাপ আলোচনা ছাড়া হঠাৎ করে বীমা খাতে বাস্তবতা বহির্ভূত আইন বা বিধি চাপিয়ে দিলে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতির মুখে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। সম্প্রতি পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরণের ঘটনা তার প্রমাণ। যেখানে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা তাদের পুঁজি হারিয়েছেন।

বিনিয়োগকারীরা বলছেন, সংশোধনীতে যদি এজিএম, ডিভিডেন্ড নীতি বা বোর্ড সিদ্ধান্তে শেয়ারহোল্ডারদের ভূমিকা কমে যায়, তাহলে শেয়ারহোল্ডার অধিকার সংকুচিত হবে এবং বাজারে নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়বে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বৈঠক-আলোচনা ও স্টেকহোল্ডারদের যথাযথ মতামতের গুরুত্ব না দিয়ে নীতিগত পরিবর্তন আনা হলে বাজারে এর প্রভাব পড়বে।
বাজারে নীতি পরিবর্তনের বার্তা যত দ্রুত আসে, বিনিয়োগকারীর প্রতিক্রিয়া তত দ্রুত হয়। সংশোধনী তড়িঘড়ি পাস হলে এর প্রভাব পড়বে।

আইন সংশোধনের ফলে যদি সলভেন্সি মার্জিন, রিজার্ভ গঠন, টেকনিক্যাল প্রভিশন বাড়ানোর বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়, তাহলে অনেক তালিকাভুক্ত কোম্পানিই ভবিষ্যতে ডিভিডেন্ড ঘোষণা কমিয়ে দিতে পারে। ডিভিডেন্ড কমলে শেয়ার বাজারে আগ্রহও কমে যাবে।

স্টেকহোল্ডাররা মনে করেন, নির্বাচিত সরকারের অধীনে আইনের পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা করা উচিত, যাতে বিনিয়োগকারীরা নীতি পরিবর্তনে ঝুঁকি অনুভব না করেন। অংশীজনদের অনেকে মনে করেন,
বীমা খাতের আইন বদলানো দরকার, কিন্তু হঠাৎ বদলে দিলে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। যথেষ্ট সময় দিয়ে আলোচনা করা জরুরি।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, নীতি পরিবর্তনের লক্ষ্য যদি খাতকে সুসংগঠিত করা হয়, তবে বীমা আইনের সংশোধন বা রেজুলেশন অধ্যাদেশ নিয়ে আরো বিস্তারিত আলোচনা এবং বাজার–প্রভাব মূল্যায়ন ছাড়া বাস্তবায়ন করা উচিত নয়। তারা বলছেন, আইন সংশোধন বা প্রণয়ন হতে পারে কিন্তু তা যেন অবশ্যই বাস্তবায়নযোগ্য এবং বাস্তবতার নিরিখে হয়।

 

Facebook Comments Box
✎ মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Posted ০৮:৫২ অপরাহ্ণ | বুধবার, ১৯ নভেম্বর ২০২৫

bankbimaarthonity.com |

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com