হেলাল সাজওয়াল
সোমবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২৫ প্রিন্ট ৩৩৩ বার পঠিত
শতকোটি টাকা লোকসান, প্রায় চারশ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ, কর্তাব্যাক্তিদের দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, স্থায়ী পরিচালনা পর্ষদ না থাকায় ডুবতে বসেছে ন্যাশনাল টি কোম্পনি (এনটিসি)।
বর্তমান অস্থায়ী পরিচালনা পর্ষদে চেয়ারম্যান নেই, এমডি নেই, কোম্পানি সেক্রেটারি, সিএফও পদেও কেউ নেই। অন্য পদে যারা আছেন তাদের মধ্যেও সমন্বয়হীনতা রয়েছে। এ ছাড়াও আওয়ামী সরকারের নিয়োগ দেওয়া কোম্পানির রাসায়নিক মালামাল আত্মসাতে অভিযুক্ত সৈয়দ মাহমুদ হাসানকে এখনও ভারপ্রাপ্ত এমডি হিসেবে বহাল রাখা হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের মাঝে হতাশা বিরাজ করছে। অস্তিত্ব টিকবে কি না এই শঙ্কায় তারা। তাদের অভিযোগ কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণেই মূলত অর্থসংকট দেখা দিয়েছে কোম্পানিটিতে। চা সংশ্লিষ্টদের দাবি, কর্মকর্তাদের ভোগবিলাস আর দুর্নীতির কারণেই নিজেদের অস্তিত্ব হারাতে বসেছে এনটিসি, দেখভালের কেউ নেই যেন।
এদিকে বাগানে কার্যক্রম শুরুর দাবিতে মানববন্ধন, অবরোধ ও ঘেরাও কর্মসূচি চালিয়েও ফলাফল শূন্য হওয়ায় কঠোর কর্মসূচির কথা ভাবছেন শ্রমিক নেতারা। জানা গেছে, ন্যাশনাল টি কোম্পানির ১২টি বাগানের প্রায় ১৫ হাজার শ্রমিক এখন অর্থসংকটে। শুধু মজুরি সংকট যে তাই নয় গত এক বছরেরও বেশি সময় তাদের রেশন, বোনাস দেয়া হয়েছে অনিয়মিত। ফলে এসব শ্রমিকের ওপর নির্ভরশীল ৫০ হাজার মানুষ এখন বিপদের সম্মুখীন।
এদিকে, রোববার প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে কোম্পানিটি জানিয়েছে; ৩০ জুন সমাপ্ত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কোম্পানিটির লোকসান বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১৯ কোটি টাকা।
এসময় কোম্পানির শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ১০৭ টাকা ৪৯ পয়সা। বিপুল লোকসানের কারণে কোম্পানিটি শেয়ারধারীদের কোনো লভ্যাংশ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদের সভায় ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গত আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কোম্পানিটি ব্যাপক আর্থিক সংকটে পড়ে। এ কারণে চা-শ্রমিকদের বেতনও পরিশোধ করতে পারেনি এনটিসি। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে ২০২২-২৩ পর্যন্ত ৫ বছরে মোট ২১৫ কোটি টাকা লোকসান করেছে।
উপরন্তু এনটিসি কর্তৃপক্ষ বলছে ২০২৩-২৪ সালে এসে তাদের ব্যাংকের কাছে ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮০ কোটি টাকা। তাছাড়া চলতি বছরে বাগান পরিচালনার জন্য কৃষি ব্যাংক থেকে ৮৬ কোটি টাকা ঋণ নিলেও মাত্র ৭ মাসেই খরচ হয়েছে ৮০ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, মূলত বাগান পরিচালনাকারী ব্যক্তিদের বিলাসিতা, অদক্ষতা, দুর্নীতি আর লুটপাটের কারণেই বাগানগুলোর ভগ্নদশা। তারা বলেন, দেশের অন্যান্য বাগানগুলো যখন সমন্বয় করে লাভে আছে সেখানে কেবল সরকার নিয়ন্ত্রিত বাগানগুলোতে লোকসান হবে কেন?
অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত পরিচালকরা সরকার পরিবর্তনের পর নিয়োগপ্রাপ্ত ৩ স্বতন্ত্র পরিচালক ও ২ শেয়ারহোল্ডার পরিচালককে সহযোগিতা করছেন না। শেয়ারহোল্ডারদের দাবি, এই অসহযোগিতা এবং দায়িত্বে নিস্পৃহতা কোম্পানির কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
বিনিয়োগকারীদের মতে, সরকারি পরিচালকদের এই নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিচ্ছে কোম্পানির ভেতরের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা। তাদের বেপরোয়া আচরণ কোম্পানির কার্যক্রমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং এনটিসির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সাধারণ বিনিয়োগকারীরা মনে করছেন, কোম্পানির বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। পরিচালকদের পেশাগত দায়িত্বশীলতার অভাব ও দুর্নীতির সুযোগ বন্ধ না করা হলে এনটিসির ভবিষ্যৎ অন্ধকার হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন তারা।
তাদের দাবি বিগত সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত ভারপ্রাপ্ত এমডি সৈয়দ মাহমুদ হাসান এখনো বহাল রয়েছেন। অথচ তার বিরুদ্ধে ৪৮ লাখ ২৭ হাজার ২১২ টাকার রাসায়নিক মালামাল আত্মসাতের অভিযোগসহ আরও অনেক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
ন্যাশনাল টি কোম্পানির এই সংকট দ্রুত সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের মোট চা উৎপাদনের ৯ শতাংশ এনটিসি করে থাকে। এখন কোন প্রভাব না পড়লেও ভবিষ্যতে চা শিল্পে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। শেয়ারহোল্ডারদের দাবি বাগান মালিক থেকে শুরু করে, সরকার, চা-বোর্ড, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে একত্রিত হয়ে দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। কি কারণে কোম্পানি বন্ধ হলো। কিভাবে এটা এখন চালু করা যায়।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি পঙ্কজ কন্দ বলেন, এখানে ‘সেট ট্রি’ নেই। এই যে অব্যবস্থাপনা, চা বাগানের যে যত্ন, এখানে যে খরচ, সে খরচগুলো যদি বোর্ড সিদ্ধান্ত নেয় এবং ব্যয় করা হয় তাহলে টাকাগুলো গেছে কোথায়?’
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক বিজয় হাজরা বলেন, পরিচালনায় দুর্বলতা থাকার কারণে আজ এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যেখানে লুটপাট চলে, কোনো ডিসিপ্লিন নেই। যদিও ন্যাশনাল টি কোম্পানির কর্মকর্তারা বলছেন অভিযোগ সঠিক নয়।
কোম্পানি সূত্রে জানা যায়, প্রথমবারের মতো সরকারি এই চা কোম্পানির লোকসান শতকোটি টাকা ছাড়াল। ২০২২ সাল থেকে এটির লোকসানের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। লোকসান বাড়তে থাকায় ২০২২ সালের পর থেকে কোম্পানিটি শেয়ারধারীদের কোনো লভ্যাংশও দিতে পারছে না। সর্বশেষ ২০২২ সালের জুনে সমাপ্ত আর্থিক বছরে কোম্পানিটি শেয়ারধারীদের সাড়ে ৭ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ দিয়েছিল। এরপর আর লভ্যাংশ দিতে না পারায় এটিকে দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানি হিসেবে ‘জেড’ শ্রেণিভুক্ত করা হয়।
এদিকে বড় অঙ্কের লোকসানের খবরেও রোববার ডিএসইতে এনটিসির শেয়ারের দাম সামান্য বেড়েছে। এদিন কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দাম ৭০ পয়সা বেড়ে দাঁড়ায় ১৯০ টাকায়। কোম্পানিটি ১৯৭৯ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। ডিএসইর ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, এটির শেয়ারের প্রায় ৩৫ শতাংশ রয়েছে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাতে। বাকি ৬৫ শতাংশ শেয়ার ব্যক্তিশ্রেণি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে।
Posted ০৯:২৬ অপরাহ্ণ | সোমবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২৫
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com