বুধবার ১০ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৭ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

Ad
x

আসছে বাজেট হোক স্বস্তি ও সম্ভাবনার

মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬   প্রিন্ট   ১৭ বার পঠিত

আসছে বাজেট হোক স্বস্তি ও সম্ভাবনার

আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বিশাল বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার। এটি হবে ক্ষমতাসীন বিএনপি’র এ মেয়াদের প্রথম বাজেট। প্রতি বছর বাজেট ঘোষণার সময় দেশের মানুষ তাকিয়ে থাকে-দ্রব্যমূল্য কমবে কি না, চাকুরির সুযোগ বাড়বে কি না, কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবে কি না, কিংবা মধ্যবিত্তের জীবন আরোও কঠিন হবে কি না। তাই বাজেটের সঙ্গে সাধারণ মানুষের আবেগ ও বাস্তব জীবনের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। বাংলাদেশ এখন অর্থনীতির এক সংবেদনশীল মোড়ে দাঁড়িয়ে। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, ব্যাংকিং খাতে দুর্বলতা ও বৈশ্বিক বাণিজ্য সংকট-অন্যদিকে তরুণ জনশক্তি, ক্রমবর্ধমান শিল্পবৃত্তি এবং ডিজিটাল অর্থনীতির সম্ভাবনা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট তাই কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, এটি হতে হবে অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের রূপরেখা।

বাজেটের সাধারণ দিকটি হলো এটা বিভিন্ন উৎস হতে অর্থ সংগ্রহ ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্থায়নের প্রস্তাব ও সিদ্ধান্ত বহন করে। কিন্তু বাজেটের আরও গভীর তাৎপর্য আছে। আধুনিক অর্থনীতিতে সরকারের বর্ধিত সম্পৃক্তির ফলে বিভিন্ন সমাজকল্যাণ মূলক কার্যক্রম, বিভিন্ন উৎপাদনশীল প্রচেষ্টায় ও বাণিজ্যে সরকারের কর্মকান্ড প্রসারিত হয়েছে। বাজেটের রয়েছে একটি রাজনৈতিক মাত্রা যেখানে সরকারের লক্ষ্য ও আদর্শ প্রতিফলিত হয় এবং যার মাধ্যমে সেগুলো বাস্তবায়িত হয়।

পৃথিবীর প্রায় সকল দেশে জাতীয় বাজেটে করের ভূমিকা অপরিহার্য। এর ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার সাথে বর্তমানের বাস্তবতায় সভ্যতার কোন রকমের কমতি নেই। আবার ঐতিহাসিক ক্রমবিবর্তনে রাজা বাদশা জমিদার সহ সকল ধরনের সামন্ত প্রভুরা খাজনা আদায় করেছে। এমনকি বর্তমান আধুনিক বিশ্বের সরকারসমূহ দেশের উন্নয়ন কর্মকান্ডসহ প্রশাসনিক ব্যয় নির্বাহের জন্য কর আদায় করে থাকে। সামন্ত ব্যবস্থায় বা উপনিবেশ যুগে জৌলুস করে অন্যায়ভাবে খাজনা আদায় করা হতো এবং তখন ব্যাপক অসন্তোষ ও বিক্ষোভ দেখা দিত। আর তাই গণতান্ত্রিক বিশ্বে কর আদায়ের পদ্ধতি ন্যায়সঙ্গত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত। কর, শুধু যে দরিদ্র দেশের মানুষ যাদের কর প্রদানের সামর্থ্য নেই অথবা করের অর্থনৈতিক অপরিহার্যতা সম্পর্কে যাদের কোনো ধারণা নেই তারাই যে কেবল কর ব্যবস্থা পছন্দ করেন না তা নয়। বরং ধনী-দরিদ্র শিক্ষিত-অশিক্ষিত সকল ধরনের মানুষের করের প্রতি বেশ বিতৃষ্ণা ভাব পরিলক্ষিত হয়। মনে করা হচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মুদ্রাস্ফীতি, কর্মসংস্থান, পরিকাঠামো, সামাজিক কল্যাণ ও আর্থিক শৃঙ্খলার মতো মুল ক্ষেত্রগুলোতে মনোযোগ দেয়া হবে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ওপর কড়া নজর রেখেই ছকে ফেলা হবে এবারের বাজেট।

বাংলাদেশের বাজেটের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, এর পরিমাণ প্রতি বছর বেড়েই চলছে। এটা কোন খারাপ লক্ষণ নয় কেননা জিডিপির পরিমাণ বৃদ্ধি ফেলে বাজেটের আকার ও বাড়বে। কিন্তু বাজেটের গঠন কাঠামো এবং গুণগত মানে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি।

প্রশ্ন হচ্ছে বড় বাজেটের ঝুঁকি কোথায় ? বড় বাজেট সব সময় উন্নয়নের প্রতীক নয়। যদি আয় ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য না থাকে, তাহলে বড় ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশই বড় বাজেট ও কম রাজস্বের সংকটে পড়েছে। শ্রীলঙ্কা দীর্ঘদিন ঋণ নির্ভর ব্যয় বাড়িয়েছিল, কিন্তু রাজস্ব সংস্কার করেনি। ফলে অর্থনীতি ভয়াবহ সংকটে পড়ে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম রপ্তানি, শিল্পায়ন ও কর সংস্কারের মাধ্যমে ধীরে ধীরে রাজস্ব বাড়িয়েছে। ফলে তারা বড় বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা অর্জন করেছে।

১৯৬০-এর দশকে দক্ষিণ কোরিয়া ছিল বাংলাদেশের কাছাকাছি অবস্থানে, কিন্তু তারা বাজেটের বড় অংশ ব্যয় করেছে শিক্ষা, প্রযুক্তি ও শিল্পায়নে। সরকার বেসরকারি শিল্পকে ঋণ প্রদান করেছে, রপ্তানিকারকদের কর সুবিধা দেয়া হয়েছে এবং বিশ্ব বাজারে পোশাক শিল্প প্রতিযোগিতার সক্ষমতা তৈরি করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে যদি দক্ষ মানব সম্পদ তৈরি না হয়, তাহলে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই আসন্ন বাজেটে শুধু অবকাঠামো নয়, মানব সম্পদ উন্নয়নেও নজর দিতে হবে।

প্রতি বছরই দেখা যায় যে, উন্নয়ন বাজেটের তুলনায় রাজস্ব বাজেটের পরিমাণ অনেক বেশি হয়। উন্নয়ন বাজেটের সাথে রাজস্ব বাজেটের যে ব্যবধান তার অনুপাত একই থাকছে। এর মানে দাঁড়ায় এখনও আমাদের দেশে পাবলিক সেক্টরে বিপুল পরিমাণ লোক কর্মসংস্থান আছে। তবে অর্থনীতিবিদগণের মতে, আমাদের ব্যুরোক্রেসির সাইজ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বড়। তাই আমাদের উন্নয়ন বাজেট বরাদ্দের পরিমাণ ধীরে ধীরে বাড়ানো প্রয়োজন। আবার প্রতি বছরই দেখা যায় যে, এডিপি অবাস্তবায়িত থাকছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ধরা হয়েছিল প্রায় ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৫৬ কোটি টাকা। এই অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে ৭৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ বাস্তবায়নের হার শতকরা ৩৬ দশমিক ১৯ ভাগ। এটা কি এডিপি বাস্তবায়নে আমাদের অক্ষমতার প্রকাশ !

দীর্ঘদিন থেকে আয়-ব্যয় বিপুল ঘাটতি রেখে বাজেট দিতে হচ্ছে সরকারকে, যার প্রভাব পড়ছে দেশের সাধারণ মানুষের ওপর। কেননা বাজেটের বড় একটা অংশ আসে নাগরিকদের দেয়া কর থেকে। বিবিএস এর তথ্য মোতাবেক, দেশের চলতি বছরের এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে। যা মার্চ মাসে ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়লেও মানুষের বেতন সে অনুপাতে বাড়ছে না, কিন্তু মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির ফলে নতুন করে দারিদ্রতা আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সাধারণ একজন মানুষকে ও কিন্তু আয় ও ব্যয়ের হিসাব করে জীবন-জীবিকা চালাতে হয়। তবে ব্যক্তির সঙ্গে রাষ্ট্রের বাজেটের একটি মৌলিক পার্থক্য আছে। সাধারণত ব্যক্তি আগে আয় কত হবে সেটি ঠিক করেন, তারপর ব্যয়ের খাতগুলো নির্ধারণ করেন। অন্যদিকে রাষ্ট্রের নীতি উল্টো। রাষ্ট্র আগে ব্যয়ের খাতগুলো নির্ধারণ করে এবং কোন কোন খাত থেকে আয় করা যায় সেটি ঠিক করে থাকে। প্রতি বার বাজেটকে ঘিরে করের দিকেই বেশি নজর থাকে সাধারণ মানুষের। কেননা যা ব্যক্তি পর্যায়ে সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে, এমন পরিস্থিতিতে কর আরোপে সরকারকে আরোও কৌশলী হতে হবে। এই মুহূর্তে সরকারের জন্য সবচেয়ে চ্যালেঞ্জ হিসাবে দেখা দিয়েছে জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করে মানুষকে স্বস্তি দেয়া। উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো, ব্যাংক খাতের অচলাবস্থা কাটিয়ে এখানে গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনা। ব্যবসা বাণিজ্যে অস্থিরতা ও মন্দাবস্থা কাটিয়ে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ সামাল দেয়া।

আমাদের সম্পদ সীমিত, সে কারণে ব্যয় সাশ্রয়ী বাজেট হতে হবে। বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে প্রচুর ঋণ নেয়, শুধু বাণিজ্যিক ব্যাংক নয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেও সরকার ঋণ নেয়, যা অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী। বর্তমান বৈশ্বিক অস্থির পিরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতি একটি কঠিন সময় পার করছে। করোনা মহামারির ধাক্কা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতি, জ্বালানি সংকট, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের নিম্নহার কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, উচ্চ ঋণখেলাপি সহ বৈদেশিক ঋণের চাপ রয়েছে।

বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মোতাবেক জুন ২০২৫ পর্যন্ত আমাদের বিদেশী ঋণ মোট ১১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মাইল ফলক অতিক্রম করেছে। এই ঋণ পরিশোধ করার পন্থা হলো রাজস্ব আদায়, রপ্তানি ও রেমিটেন্স আয় বাড়ানো।

বর্তমানে বৈশ্বিক সংকট, পরিবর্তিত বাণিজ্যনীতি এবং ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয়ের কারণে দেশের তৈরি পোশাক খাত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। অর্থনীতিবিদগণ সতর্ক করেছেন যে, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও কাঠামোগত দুর্বলতা শিল্প খাতে আর্থিক চাপ আরোও বাড়াবে যা, প্রধান রপ্তানি বাজারগুলো থেকে ভবিষ্যতে অর্ডার হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাজার বৈচিত্র্যকরণ, দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন এবং জ্বালানি ও আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ জোর দিতে হবে। সবমিলিয়ে বাজেট মানে শুধু অর্থনৈতিক নথি নয়, এটি জনগণের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন যাত্রার দিকনির্দেশনা। যদি উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো যায়। তাহলে এই বড় বাজেট দেশে অর্থনীতিকে নতুন গতি দিতে পারে।

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক
ই-মেইল: pkroyrajat2016@gmail.com

 

Facebook Comments Box
বিষয় :

Posted ০৩:০১ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

আর্কাইভ ক্য

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০  
সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com