নুরুল আমিন, সভাপতি ফুলপুর সাংবাদিক সমিতি, ময়মনসিংহ
মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬ প্রিন্ট ২২ বার পঠিত
শহরে সামাজিক বন্ধন কোনো কালেই তেমন একটা সুদৃঢ় ছিল না, তবে পারিবারিক বন্ধন গুলো ছিল অটুট। একসময় পাশের ফ্ল্যাটে কে এলো, কে গেল বা কারা থাকছে—তা নিয়ে শহরের মানুষের মাথাব্যথা না থাকলেও, নিজের পরিবারের মানুষগুলোর প্রতি টান ছিল অকৃত্রিম। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, ইদানিং আমাদের সেই পারিবারিক সম্পর্কগুলোও ভেঙে যাচ্ছে। মানুষ কেমন যেন চরম আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে! কেউ কারো ভালো চায় না, কেউ কারো সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়ায় না।
সম্প্রতি ঢাকায় এক রত্নগর্ভা মায়ের অবহেলা ও অযত্নে মর্মান্তিক মৃত্যু আমাদের এই ভেঙে পড়া পরিবারতন্ত্রের এক নির্মম বাস্তবতাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। যে মায়ের এক সন্তান বন্দর কর্তৃপক্ষের সহকারী সচিব, এক সন্তান বুয়েটের শিক্ষক, এক সন্তান প্রবাসী এবং কন্যারাও উচ্চশিক্ষিত—সেই মায়ের এই পরিণতি ভাবা যায়? ছেলেদের অবহেলার শিকার হয়ে বৃদ্ধা মা আশ্রয় নিয়েছিলেন এক মেয়ের কাছে। কিন্তু সেখানেও সময় বাড়ার সাথে সাথে বেড়েছে অবহেলা আর নির্মমতা। নিজের ঘরে তিনি কখন যে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন, সেই খবরটুকু নেওয়ার প্রয়োজনবোধ করেনি কেউ। অবশেষে তার পচা-গলা লাশ উদ্ধার হওয়ার খবরটি গত দুদিন ধরে সারা দেশে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। এত অভিজাত ও উচ্চশিক্ষিত একটি পরিবারের রত্নগর্ভা মায়ের এমন পরিণতি কোনো বিবেকবান মানুষ মেনে নিতে পারছে না। এই কু-সন্তানদের যদি আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়, তবে তা সমাজের অন্য পরিবারগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা হবে বলে আমি মনে করি।
পিতা-মাতার প্রতি অবহেলার এই চিত্র কালের বিবর্তনে আজ বাংলার ঘরে ঘরে কমবেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জীবনের প্রথম ও প্রধান আশ্রয় হলেন পিতা-মাতা। অথচ তারা যখন বৃদ্ধ হয়ে পড়েন, যখন তাদের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যায় এবং নানা রোগে-শোকে শরীর অচল হয়ে আসে—ঠিক তখনই তাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় একটু সেবা, আশ্রয় আর ভালোবাসার। দুর্ভাগ্যবশত, তখনই তারা সবচেয়ে বেশি অবহেলার শিকার হন।
অনেক সময় দেখা যায়, কোনো কোনো সন্তান কেবল কর্তব্য বা বিবেকের তাড়নায় বৃদ্ধ বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়ায়। অসহায় পিতা-মাতা তখন স্বাভাবিকভাবেই সেই সন্তানের প্রতি অতিরিক্ত মমত্ববোধ ও নির্ভরতা খুঁজে পান এবং বাকি সন্তানদের প্রতি তাদের মনের টান কিছুটা কমে যায়। এই পরিস্থিতিতে অনেক পিতা-মাতা তাদের স্থায়ী সম্পদের একটা অংশ সেই সেবা করা সন্তানটিকে মৃত্যুর আগেই লিখে দিতে চান। অনেক সন্তানও তা সাদরে গ্রহণ করে। আর এখানেই বাঁধে মূল বিপত্তি! এর ফলে অন্য সন্তানরা বাবা-মায়ের থেকে আরও দূরে সরে যায়।
এরপর একটা পর্যায়ে যখন পিতা-মাতা অতি বৃদ্ধ হয়ে পড়েন, নিজে চলাফেরা করা বা প্রাকৃতিক কাজ সারার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেন, তখন দেখা দেয় নতুন সংকট। সেবা করতে থাকা সন্তানের স্ত্রী (পুত্রবধূ) হয়তো ভাবতে শুরু করেন—”অন্য ভাইয়েরা তো কিছুই করছে না, আমি একাই কেন সব দেখব?” এই মানসিকতা থেকে একসময় সেই সেবা-যত্নের মাত্রাও কমতে থাকে।
মা-বাবা বৃদ্ধ হলে সমস্ত অহংকার, হিসাব-নিকাশ এবং ভাই-বোনের মধ্যকার দূরত্ব ভুলে যাওয়া উচিত। সকল ভাই-বোনের বসে আলোচনা ও পরামর্শের মাধ্যমে দায়িত্ব বণ্টন করে এই অসুস্থ, অচল ও অসহায় বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সেবা করা উচিত।
শৈশবে আমাদের মা-বাবা যেভাবে নিজেদের সুখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে আমাদের মানুষ করেছেন, বৃদ্ধকালে ঠিক একইভাবে তাদের সেবা করা প্রতিটি সন্তানের পবিত্র ও অন্যতম প্রধান কর্তব্য। আসুন, আমরা আমাদের বিবেককে জাগ্রত করি। আর কোনো মায়ের যেন এমন অবহেলিত ও মর্মান্তিক পরিণতি না হয়।
Posted ০৭:৫৮ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com