অনলাইন ডেস্ক
বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রিন্ট ১২ বার পঠিত
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের খাদ্যতালিকায় তুলনামূলক সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য প্রোটিনের একটি প্রধান উৎস ডিম।
কিন্তু ২০২৬ সালে সেই ডিমের বাজারে দেখা গেছে উল্লেখযোগ্য মূল্য পরিবর্তন। ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে উৎপাদক পর্যায়ে একটি ডিমের গড় বিক্রয়মূল্য ছিল ৭ টাকা ৯১ পয়সা। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১ টাকা ৩০ পয়সায়। অর্থাৎ আট-নয় মাসের ব্যবধানে উৎপাদক পর্যায়ের দাম বেড়েছে প্রায় ৩ টাকা ৩৯ পয়সা বা প্রায় ৪৩ শতাংশ।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। আপনার দেওয়া শিরোনামে সেপ্টেম্বরের দাম ১১ টাকা ৫০ পয়সা বলা হয়েছে। সাম্প্রতিক বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভায় ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য এবং একাধিক প্রতিবেদনে সেপ্টেম্বরের গড় উৎপাদক পর্যায়ের দাম প্রায় ১১ টাকা ৩০ পয়সা বলা হয়েছে। তাই প্রকাশনার ক্ষেত্রে ১১.৩০ টাকা ব্যবহার করাই অধিক নির্ভরযোগ্য।
ডিমের দাম বাড়ার পেছনে সবচেয়ে আলোচিত কারণ এখন পোলট্রি খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ভুট্টা, ডিওআরবি ও সয়াবিন মিলের মতো খাদ্য উপকরণের দাম দ্রুত বেড়েছে। আগস্টের শুরুতে প্রতি কেজি পশুখাদ্যের দাম যেখানে প্রায় ৬৮ টাকা ছিল, সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে তা বেড়ে সর্বোচ্চ ৭২ টাকা ৫০ পয়সায় পৌঁছায়। একই সময়ে ভুট্টার দাম প্রায় ২৪ শতাংশ, ডিওআরবির দাম ২৭ শতাংশ এবং সয়াবিন মিলের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে বলে শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
ফলে একটি ডিম উৎপাদনে খামারিদের ব্যয় প্রায় ১১ টাকায় পৌঁছেছে বলে সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে ব্যবসায়ীরা জানান। অর্থাৎ ডিমের বর্তমান বাজারদরকে শুধু ব্যবসায়ীদের মুনাফা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে উৎপাদন ব্যয়ের বড় পরিবর্তনটি বাদ পড়ে যায়।
২০২৬ সালের প্রথমার্ধে চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। অতিরিক্ত উৎপাদন ও তুলনামূলক দুর্বল চাহিদার কারণে বছরের বড় একটি সময় খামারিরা উৎপাদন খরচের নিচে ডিম বিক্রি করেছেন বলে শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
জুলাইয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত প্রায় সাত মাসে খামারিরা মাত্র এক মাস লাভে ডিম বিক্রি করতে পেরেছিলেন। একজন খামারি তখন প্রায় ১০ টাকা উৎপাদন খরচের বিপরীতে ৮ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ৯ টাকা দরে ডিম বিক্রি করছিলেন।
এখানেই ডিমের বাজারের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য সামনে আসে—দাম কম থাকলে উৎপাদক ক্ষতিগ্রস্ত হন, আর উৎপাদন কমে সরবরাহে চাপ তৈরি হলে পরে ভোক্তার ওপর দাম বাড়ার প্রভাব পড়ে।
বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে প্রতিদিন প্রায় ৫ কোটি ডিম উৎপাদনের হিসাব দেওয়া হয়েছে। ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ডিমের চাহিদা রয়েছে বলে খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য। ডিম দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকির কারণে খামারিরা সাধারণত দীর্ঘ সময় মজুত করে রাখতে পারেন না; ফলে প্রতিদিনের উৎপাদন ও চাহিদার ভারসাম্য বাজারদরে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
সেপ্টেম্বরে এসে এই ভারসাম্যে আরও চাপ তৈরি হয়। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে এক ডজন ডিমের দাম ১৫০-১৬০ টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। পরে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যায়, যার প্রভাব ডিমসহ নিত্যপণ্যের বাজারে পড়ে।
ডিমের দামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত কতটা মূল্য সংযোজন হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, খামারি পর্যায় থেকে খুচরা বাজারে পৌঁছাতে বিভিন্ন ধাপে সাধারণত একটি ডিমের দাম আরও ১ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ২ টাকা পর্যন্ত বাড়ে। পরিবহন, শ্রম, বাছাই, প্যাকেজিং, আড়তদারি ও খুচরা পর্যায়ের ব্যয় এর মধ্যে রয়েছে।
এ কারণেই উৎপাদক পর্যায়ে ১১ টাকার কিছু বেশি দামের ডিম ভোক্তার হাতে গিয়ে ১৩ টাকা বা তারও বেশি হতে পারে। সেপ্টেম্বরের বিভিন্ন সময়ে ঢাকার বাজারে ডজনপ্রতি ১৫৫-১৬০ টাকা এবং পরবর্তী সময়ে ১৬০-১৭০ টাকা পর্যন্ত দাম দেখা গেছে।
দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারও পদক্ষেপ নিয়েছে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ১৬ সেপ্টেম্বর উৎপাদক পর্যায়ে একটি ডিমের দাম ১০ টাকা ৫৮ পয়সা, পাইকারিতে ১১ টাকা ১ পয়সা এবং খুচরা পর্যায়ে ১১ টাকা ৮৭ পয়সা নির্ধারণ করে। অর্থাৎ খুচরা পর্যায়ে এক ডজনের নির্ধারিত দাম দাঁড়ায় প্রায় ১৪২ টাকা।
কিন্তু বাজারে এর চেয়ে বেশি দামে ডিম বিক্রির ঘটনা ঘটেছে। এক পর্যায়ে ঢাকার কয়েকটি বাজারে বাদামি ডিমের ডজন ১৭০-১৮০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এ নিয়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানও হয়েছে।
তবে বাজারের এই ব্যবধানের কারণ শুধু খুচরা ব্যবসায়ীদের মুনাফা কি না, সেটি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, তারা নিজেরাই সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে খামারিদের কাছ থেকে ডিম কিনছেন। অন্যদিকে সরকার বলছে, সরবরাহ ব্যবস্থার কোন পর্যায়ে অস্বাভাবিক মূল্য সংযোজন বা অতিরিক্ত মুনাফা হচ্ছে, তা চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
ডিমের বাজারে মৌসুমি মূল্য ওঠানামা কমাতে ব্যবসায়ীরা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দিয়েছেন—অতিরিক্ত উৎপাদনের সময়ে ডিম এক থেকে দেড় মাস সংরক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
এর ফলে উৎপাদন বেশি থাকার সময়ে দাম অস্বাভাবিকভাবে পড়ে গেলে খামারিদের ক্ষতি কিছুটা কমানো এবং পরবর্তী সময়ে সরবরাহ কমে গেলে বাজারে ডিম ছাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ ধরনের ব্যবস্থার জন্য উপযুক্ত সংরক্ষণ প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও ব্যয় কাঠামো প্রয়োজন।
ডিমের বর্তমান মূল্যবৃদ্ধি আসলে একটি বড় অর্থনৈতিক প্রশ্ন সামনে এনেছে—ভোক্তার জন্য সাশ্রয়ী দাম এবং খামারির জন্য টেকসই উৎপাদনমূল্যের মধ্যে ভারসাম্য কোথায়?
একদিকে খাদ্য উপকরণ, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়ছে। অন্যদিকে বছরের একটি বড় সময়ে খামারিরা উৎপাদন খরচের নিচে ডিম বিক্রি করছেন বলে দাবি করছেন। আবার সরবরাহ সংকট তৈরি হলে ভোক্তাকে বেশি দাম দিতে হচ্ছে।
তাই শুধু বাজারে অভিযান চালিয়ে দীর্ঘমেয়াদে ডিমের দাম স্থিতিশীল রাখা কঠিন হতে পারে। প্রয়োজন খাদ্য উপকরণের বাজার, উৎপাদন, সরবরাহ, পরিবহন ও খুচরা মূল্য—পুরো চেইনটির সমন্বিত নজরদারি।
ব্যবসায়ীরা পোলট্রি খাদ্যের উপকরণের দাম নিয়ন্ত্রণ, করভার যৌক্তিক করা, পরিবহন বাধা কমানো এবং ডিমের উৎপাদন ও বাজারদরের দৈনিক তথ্য প্রকাশের প্রস্তাব দিয়েছেন। সরকারও উৎপাদন খরচ ও উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে মূল্য সংযোজন ও মুনাফা পর্যালোচনার কথা জানিয়েছে।
জানুয়ারির ৭ টাকা ৯১ পয়সা থেকে সেপ্টেম্বরে প্রায় ১১ টাকা ৩০ পয়সা—এই ব্যবধান শুধু একটি পণ্যের দাম বাড়ার গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পোলট্রি খাদ্যের আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বাজার, কৃষকের ঝুঁকি, উৎপাদন ও চাহিদার ভারসাম্য, পরিবহন ব্যয়, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের খাদ্য ব্যয়।
ডিমের বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে তাই একদিকে উৎপাদককে টেকসই দাম দিতে হবে, অন্যদিকে ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার কথাও বিবেচনায় রাখতে হবে। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই এখন বাংলাদেশের ডিমের বাজারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
Posted ০১:০০ অপরাহ্ণ | বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | Animator Alif
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com