সজল সরকার
শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রিন্ট ১০ বার পঠিত
একটি সাধারণ ক্রেডিট কার্ড দিয়ে কেনাকাটা করলে আমরা ভাবি—কত টাকা খরচ হলো, কত পয়েন্ট পাওয়া গেল, আর মাস শেষে বিল কীভাবে পরিশোধ করা হবে। কিন্তু বিশ্বের অতি ধনী মানুষের কাছে কিছু ক্রেডিট কার্ডের হিসাব সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে কার্ডটি শুধু অর্থ পরিশোধের মাধ্যম নয়; বরং এটি হয়ে ওঠে সম্পদ, সামাজিক মর্যাদা, ব্যক্তিগত সেবা এবং অভিজাত জীবনযাপনের এক ধরনের পরিচয়পত্র।
নিম্নে বিশ্বের সেরা ১০ ক্রেডিট কার্ডের বিবরণ তুলে ধরা হলো:
১. আমেরিকান এক্সপ্রেস সেঞ্চুরিয়ন কার্ড:
বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত অভিজাত ক্রেডিট কার্ডের কথা উঠলে প্রথমেই আসে আমেরিকান এক্সপ্রেস সেঞ্চুরিয়ন, যা সাধারণভাবে ‘অ্যামেক্স ব্ল্যাক কার্ড’ নামে পরিচিত।
এই কার্ডের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এটির জন্য সাধারণভাবে আবেদন করা যায় না; আমেরিকান এক্সপ্রেসের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ পেতে হয়। বিভিন্ন প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে কার্ডটির যোগদানের ফি ১০ হাজার ডলার এবং বার্ষিক ফি ৫ হাজার ডলার। তবে দেশভেদে ফি আলাদা হতে পারে। আমেরিকান এক্সপ্রেসের প্রকাশিত কার্ড সদস্য চুক্তিতেও সেঞ্চুরিয়ন কার্ডের বার্ষিক সদস্য ফি এবং অতিরিক্ত সেঞ্চুরিয়ন কার্ডের জন্য আলাদা ফি থাকার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।
এই কার্ডের আসল আকর্ষণ শুধু এর কালো রঙ বা ধাতব নির্মাণ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে অত্যন্ত ব্যক্তিগতকৃত সেবা, ভ্রমণ সুবিধা, বিলাসবহুল হোটেল ও রেস্তোরাঁ-সংক্রান্ত বিশেষ সুযোগ এবং ব্যক্তিগত সহায়তা।
কার্ডটির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ‘ক্রেডিট লিমিট’ না থাকার কথাও বহুল আলোচিত। তবে এর অর্থ এই নয় যে সীমাহীন অর্থ খরচ করা যায়; গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা, লেনদেনের ধরন ও পরিশোধের ইতিহাস বিবেচনা করে অনুমোদিত ক্রয়ক্ষমতা নির্ধারিত হয়।
২. দুবাই ফার্স্ট রয়্যাল মাস্টারকার্ড:
দুবাইয়ের রাজপরিবার ও অতি ধনী ব্যক্তিদের ঘিরে যে বিলাসী জীবনযাপনের গল্প প্রচলিত, এই কার্ড যেন তারই আর্থিক সংস্করণ।
দুবাই ফার্স্ট রয়্যাল মাস্টারকার্ড আমন্ত্রণের মাধ্যমে দেওয়া হয় এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজপরিবার ও অতি উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তিদের জন্য এটি তৈরি করা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কার্ডটির সবচেয়ে আলোচিত বৈশিষ্ট্য হলো এর নকশা—সোনার অলংকরণ এবং মাঝখানে বসানো হীরার উপস্থিতি।
বিভিন্ন প্রকাশিত প্রতিবেদনে কার্ডটিতে প্রায় ০.২৩৫ ক্যারেটের হীরা ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। এর যোগদানের খরচ প্রায় ৭ হাজার দিরহাম বা প্রায় ১ হাজার ৯০০ মার্কিন ডলার বলে পুরোনো প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তবে বর্তমান ফি প্রকাশ্য নয়।
কার্ডটির আরেকটি আলোচিত বিষয় হলো নির্দিষ্ট ঋণসীমার অনুপস্থিতি বা অত্যন্ত নমনীয় ক্রয়ক্ষমতা। এর সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ব্যবস্থাপক এবং ‘রয়্যাল লাইফস্টাইল ম্যানেজমেন্ট’ ধরনের সেবা যুক্ত থাকার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
৩. জেপি মরগ্যান রিজার্ভ কার্ড:
বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী বেসরকারি ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান জেপি মরগ্যানের এই কার্ড সাধারণ ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকদের জন্য নয়।
জেপি মরগ্যান রিজার্ভ কার্ড মূলত ব্যাংকটির অতি ধনী ব্যক্তিগত ব্যাংকিং গ্রাহকদের জন্য। বিভিন্ন প্রকাশিত তথ্যে এই কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রায় ১ কোটি মার্কিন ডলার বা তার বেশি সম্পদ জেপি মরগ্যানের ব্যবস্থাপনায় থাকার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কার্ডটি আমন্ত্রণের ভিত্তিতে দেওয়া হয়।
কার্ডটির সঙ্গে বিলাসবহুল ভ্রমণ, বিমানবন্দর সুবিধা, বিশেষ গ্রাহকসেবা এবং ব্যাংকের বিশেষায়িত সম্পদ ব্যবস্থাপনা সেবার সঙ্গে সংযোগ অন্যতম আকর্ষণ।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কার্ডটির মূল্য শুধু এর বার্ষিক ফিতে নয়; বরং এটি এমন একটি ব্যাংকিং সম্পর্কের অংশ, যেখানে গ্রাহকের কোটি কোটি ডলারের সম্পদ ব্যবস্থাপনা করা হয়।
৪. কুটস সিল্ক কার্ড:
ব্রিটেনের ঐতিহ্যবাহী বেসরকারি ব্যাংক কুটস দীর্ঘদিন ধরে রাজপরিবার ও অতি ধনী ব্যক্তিদের ব্যাংকিং সেবার সঙ্গে যুক্ত। সেই ব্যাংকের সিল্ক কার্ডও সাধারণ গ্রাহকের নাগালের বাইরে।
কার্ডটি কুটসের ব্যক্তিগত ব্যাংকিং গ্রাহকদের জন্য। বিভিন্ন প্রকাশিত তথ্যে কুটসের গ্রাহক হতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগযোগ্য সম্পদের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। একটি প্রতিবেদনে অন্তত ১০ লাখ পাউন্ড বিনিয়োগযোগ্য সম্পদের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে।
কার্ডটির বৈশিষ্ট্য অন্য অনেক ‘ব্ল্যাক কার্ড’-এর মতো চমকপ্রদ নকশা নয়। বরং এর শক্তি হলো ব্যাংকের ব্যক্তিগত সেবা, বিশেষ অনুষ্ঠান ও অভিজ্ঞতায় প্রবেশাধিকার, বিমানবন্দর লাউঞ্জ সুবিধা এবং ব্যক্তিগত সহায়তা।
এই কার্ড প্রমাণ করে, অতি ধনীদের কাছে বিলাসিতা সব সময় চকচকে ধাতু বা হীরা দিয়ে প্রকাশ পায় না; কখনো কখনো নিঃশব্দ এক্সক্লুসিভিটিই সবচেয়ে বড় বিলাসিতা।
৫. সবারব্যাংক ভিসা ইনফিনিট গোল্ড কার্ড:
সোনার তৈরি কার্ড—শুনতেই যেন অস্বাভাবিক। কিন্তু বিশ্বের অভিজাত কার্ডের তালিকায় এমন কার্ডও রয়েছে।
সবারব্যাংক ভিসা ইনফিনিট গোল্ড কার্ড নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে কার্ডটির সোনার নির্মাণ এবং হীরা ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। পুরোনো প্রকাশিত তথ্যে এর প্রাথমিক খরচ প্রায় ১ লাখ মার্কিন ডলার পর্যন্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং সীমিতসংখ্যক অতি ধনী গ্রাহকের জন্য এটি দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
৬. ইউরেশিয়ান ডায়মন্ড ভিসা ইনফিনিট:
নামেই রয়েছে ‘ডায়মন্ড’। এই কার্ডটি বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও অলংকৃত কার্ডগুলোর আলোচিত উদাহরণ।
ইউরেশিয়ান ডায়মন্ড কার্ড ভিসা ইনফিনিট সম্পর্কে বিভিন্ন প্রকাশিত তথ্যে প্রায় ৩৯ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত যোগদানের খরচের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বার্ষিক খরচও কার্ডধারীর প্যাকেজ ও ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।
কার্ডটির মূল আকর্ষণ হলো এর বিরলতা এবং অভিজাত জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত সুবিধা। ব্যক্তিগত ভ্রমণ, বিশেষ সেবা ও বিলাসী অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে কার্ডটি তার গ্রাহকদের আলাদা মর্যাদা দেওয়ার লক্ষ্যেই তৈরি।
৭. স্ট্র্যাটাস রিওয়ার্ডস ভিসা:
নামটিই বলে দেয়—এখানে পুরস্কারের পাশাপাশি ‘স্ট্যাটাস’ও গুরুত্বপূর্ণ।
স্ট্র্যাটাস রিওয়ার্ডস ভিসা অত্যন্ত সীমিত ও আমন্ত্রণনির্ভর কার্ড হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন প্রকাশিত তথ্যে এর বার্ষিক ফি প্রায় ১ হাজার ৫০০ ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সাধারণ আবেদনকারীর জন্য এটি উন্মুক্ত নয়; বিদ্যমান কার্ডধারী বা অংশীদার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সুপারিশ প্রয়োজন হতে পারে।
এর সঙ্গে ব্যক্তিগত ভ্রমণ, বিমান চলাচল ও বিলাসবহুল জীবনযাত্রার সুবিধা যুক্ত। কার্ডটির লক্ষ্য সাধারণ পুরস্কার নয়; বরং এমন একটি গ্রাহকগোষ্ঠী তৈরি করা, যারা অর্থের চেয়ে সুবিধা ও ব্যক্তিগত সেবাকে বেশি মূল্য দেন।
৮. মেরিল লিঞ্চ অক্টেভ ব্ল্যাক কার্ড:
অতি ধনী বিনিয়োগকারীদের জন্য আরেকটি আলোচিত কার্ড হলো মেরিল লিঞ্চ অক্টেভ ব্ল্যাক কার্ড।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই কার্ডের জন্য মেরিল লিঞ্চের কাছে বিপুল পরিমাণ সম্পদ থাকা প্রয়োজন হতে পারে। পুরোনো প্রকাশিত তথ্যে প্রায় ১ কোটি মার্কিন ডলার সম্পদ ব্যবস্থাপনার অধীনে রাখার শর্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বার্ষিক ফি প্রায় ৯৫০ ডলার বলে বিভিন্ন তালিকায় উল্লেখ রয়েছে।
অন্য কার্ডগুলোর মতো এখানেও মূল আকর্ষণ শুধু কেনাকাটায় নয়। বরং সম্পদ ব্যবস্থাপনা, ব্যক্তিগত ব্যাংকিং এবং বিশেষ গ্রাহকসেবার সঙ্গে কার্ডটি একটি বৃহত্তর আর্থিক সম্পর্কের অংশ।
৯. স্যান্টান্ডার আনলিমিটেড ব্ল্যাক কার্ড:
ইউরোপের অন্যতম বড় ব্যাংকিং গোষ্ঠী স্যান্টান্ডারের অভিজাত গ্রাহকদের জন্য রয়েছে স্যান্টান্ডার আনলিমিটেড ব্ল্যাক কার্ড।
এটি সাধারণ আবেদনকারীদের জন্য নয়। প্রকাশিত তথ্যে স্যান্টান্ডারের ব্যক্তিগত ব্যাংকিং গ্রাহক হওয়া এবং ব্যাংকের আমন্ত্রণ পাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। বার্ষিক ফি কয়েকশ ডলার পর্যায়ে বলে বিভিন্ন পুরোনো তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এই কার্ডের বিশেষত্ব হলো ব্যক্তিগত ব্যাংকিং সেবার সঙ্গে এর সমন্বয়। ফলে কার্ডটি একা কোনো বিলাসবহুল পণ্য নয়; বরং অতি ধনী গ্রাহকের পুরো ব্যাংকিং সম্পর্কের একটি অংশ।
১০. লাক্সারি কার্ড মাস্টারকার্ড গোল্ড কার্ড:
তালিকার শেষ নামটি অন্যদের থেকে কিছুটা আলাদা। কারণ এটি পুরোপুরি গোপন আমন্ত্রণভিত্তিক কার্ড নয়।
লাক্সারি কার্ড মাস্টারকার্ড গোল্ড কার্ড উচ্চ বার্ষিক ফি নেওয়া উন্মুক্ত আবেদনযোগ্য কার্ডগুলোর মধ্যে অন্যতম। বিভিন্ন সাম্প্রতিক তালিকায় এর বার্ষিক ফি প্রায় ১ হাজার ১৯৫ থেকে ১ হাজার ১৯৯ ডলার পর্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো ২৪ ক্যারেট সোনার আবরণযুক্ত ধাতব নির্মাণ এবং বিলাসবহুল ভ্রমণকেন্দ্রিক সুবিধা।
অর্থাৎ, প্রথম নয়টি কার্ডের অনেকগুলো যেখানে ‘আপনাকে আমরা নির্বাচন করব’ ধরনের ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে, সেখানে এই কার্ডে অর্থ খরচ করার সক্ষমতা থাকলে আবেদন করার সুযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি।
কার্ডগুলোর আসল দাম কোথায়?
এই কার্ডগুলোর দিকে তাকালে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়—সবচেয়ে দামি কার্ড মানেই সবচেয়ে বেশি বার্ষিক ফি নয়।
কোনো কার্ডের বার্ষিক ফি ৫ হাজার ডলার হতে পারে, কিন্তু সেটি পেতে গ্রাহকের কয়েক মিলিয়ন ডলারের সম্পদ প্রয়োজন হতে পারে। আবার কোনো কার্ডের যোগদানের খরচই কয়েক হাজার বা কয়েক দশ হাজার ডলার। কোথাও কার্ডের গায়ে হীরা বা সোনা বসানো, কোথাও আবার কার্ডের প্রকৃত মূল্য লুকিয়ে আছে ব্যক্তিগত ব্যাংকার, ভ্রমণ ব্যবস্থাপনা ও দরজারক্ষী সেবায়।
Posted ০৮:৩১ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com