নিজস্ব প্রতিবেদক
সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রিন্ট ১২৯ বার পঠিত
সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ প্রিমিয়ামের অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, কথিত ভুয়া বীমা পলিসি, গ্রুপ বীমা থেকে কমিশনের নামে অর্থ আত্মসাৎ, শাখার নামে ভুয়া বকেয়া দেখানো এবং কর-ভ্যাট পরিশোধে অনিয়মের অভিযোগে যমুনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান বদরুল আলম খান ও প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মোজাম্মেল হক সারমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কাছে অভিযোগ করা হয়েছে।
গত ২১ সেপ্টেম্বর দুদক ও আইডিআরএর চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া পৃথক লিখিত অভিযোগে এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ আর্থিক তদন্ত এবং তদন্তে অর্থ আত্মসাৎ, জালিয়াতি, দুর্নীতি বা অর্থপাচারের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত বীমা গ্রাহক এসোসিয়েশনের পক্ষে কামরুল ইসলাম খন্দকার এসব অভিযোগ করেন। কোম্পানিটির অভ্যন্তরীণ বিশেষ নিরীক্ষাতেও গ্রুপ ইন্স্যুরেন্সের কমিশনের নামে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার প্রাথমিক প্রমাণ উঠে আসার কথাও অভিযোগে বলা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১৪ সাল থেকে প্রায় ১২ বছরে যমুনা লাইফ দেশের প্রায় ১০ লাখ শ্রমজীবী ও সাধারণ গ্রাহকের কাছ থেকে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা প্রিমিয়াম সংগ্রহ করেছে।
তবে দীর্ঘ সময় ধরে বিপুল অর্থ সংগ্রহের পরও কোম্পানির বর্তমান আর্থিক সক্ষমতা ও তহবিলের অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিভিন্ন মেয়াদপূর্তির পর গ্রাহকদের প্রাপ্য অর্থ যথাসময়ে পরিশোধ না করার অভিযোগও করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, চেয়ারম্যান বদরুল আলম খান, হিসাব বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক সারমান এবং সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকজন কর্মকর্তার যোগসাজশে কোম্পানির অর্থ বিভিন্ন অনিয়মপূর্ণ খাতে ব্যয় দেখিয়ে আত্মসাৎ করা হয়ে থাকতে পারে। অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে।
কথিত ভুয়া পলিসির মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ:
অভিযোগে বলা হয়েছে, সাবেক মন্ত্রী দস্তগীর গাজীর মালিকানাধীন গাজী গ্রুপের বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের নামে যমুনা লাইফে বীমা পলিসি খোলা হয়েছিল। এসব পলিসির ক্ষেত্রে শুধু প্রথম কিস্তির অর্থ জমা দিয়ে পরবর্তী কয়েক বছর নিয়মিত প্রিমিয়াম পরিশোধ না করার অভিযোগ রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে মেয়াদপূর্তির সময় এসব পলিসির বিপরীতে ভুয়া বা অসঙ্গতিপূর্ণ হিসাবের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন করা হয়ে থাকতে পারে। এমনকি সংশ্লিষ্ট অনেক শ্রমিক তাদের নামে বীমা পলিসি খোলার বিষয়টি জানতেন না বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে পলিসির আবেদনপত্র, গ্রাহকের সম্মতি, প্রিমিয়াম জমার রেকর্ড, পলিসির মেয়াদপূর্তির হিসাব এবং অর্থ পরিশোধের ব্যাংক রেকর্ড পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রুপ বীমায় কমিশনের অর্থ নিয়ে প্রশ্ন:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক ও কর্মচারীদের জন্য গ্রুপ স্বাস্থ্যবীমা সংক্রান্ত যমুনা লাইফের সঙ্গে একটি চুক্তির কথা অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, গত প্রায় ছয় বছরে এ খাতে প্রায় ৫০ কোটি টাকা প্রিমিয়াম হিসেবে কোম্পানির কাছে জমা হয়েছে।
এই অর্থের বিপরীতে কমিশন ও অন্যান্য খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ অনিয়মের মাধ্যমে উত্তোলন ও আত্মসাৎ করা হয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, কোম্পানির চেয়ারম্যান বদরুল আলম খান, হিসাব বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক সারমান এবং কোম্পানির সেক্রেটারি মোসাঃ সাজেদা পারভীনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতায় বিভিন্ন ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে অর্থ লেনদেন করা হয়ে থাকতে পারে।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, বিষয়টি কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে উত্থাপিত হলে তদন্তের জন্য অডিট বিভাগকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে অডিট প্রতিবেদনে কমিশন খাতে আর্থিক অনিয়মের বিষয়টি উঠে আসে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন। একই সঙ্গে সাবেক গ্রুপ বীমা ইনচার্জ হারুনুর রশিদ ও মোজাম্মেল হক সারমানের বিরুদ্ধেও অনিয়মে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। তবে পরিচালনা পর্ষদ থেকে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
১৫০ শাখার নামে ২০ কোটি টাকা বকেয়ার অভিযোগ:
অভিযোগে যমুনা লাইফের প্রায় ১৫০টি শাখার ক্যাশিয়ার ও অফিস ইনচার্জদের নামে মোট প্রায় ২০ কোটি টাকা বকেয়া দেখানোর অভিযোগও করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব বকেয়ার বড় একটি অংশ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রকৃত দায় নয়; বরং কোম্পানির হিসাব ব্যবস্থাপনার অনিয়মের কারণে এসব বকেয়া সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। এ জন্য শাখাভিত্তিক ক্যাশবুক, ব্যাংক জমা, প্রিমিয়াম সংগ্রহের হিসাব, রসিদ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায় নির্ধারণের নথি পরীক্ষা করে প্রকৃত বকেয়া নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে।
কর-ভ্যাট পরিশোধেও অনিয়মের অভিযোগ:
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর ও ভ্যাট পরিশোধ নিয়েও অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, জীবনবীমা কোম্পানির বিভিন্ন ব্যয়, কমিশন ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কর ও ভ্যাট যথাযথভাবে পরিশোধ করা হয়নি। গত প্রায় সাত বছর ধরে কর ও ভ্যাট পরিশোধে অনিয়ম ও বকেয়া থাকার অভিযোগও করা হয়েছে।
কোম্পানির বিরুদ্ধে জরিমানা ও বকেয়সহ বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধের জন্য আইনগত নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, এনবিআর-সংক্রান্ত বিভিন্ন ব্যয়ের নামে প্রতি মাসে অর্থ উত্তোলন করে তা অনিয়মের মাধ্যমে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। এ ক্ষেত্রেও মোজাম্মেল হক সারমান ও সেক্রেটারি সাজেদা পারভীনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ করা হয়েছে।
গ্রাহকের অর্থ ফেরত নিয়ে উদ্বেগ:
এসব আর্থিক অনিয়মের কারণে সাধারণ গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের সঞ্চিত বীমার অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কোম্পানির বিপুলসংখ্যক কর্মচারীর কয়েক মাসের বেতন বকেয়া থাকার অভিযোগও করা হয়েছে। এ ছাড়া কোম্পানির মালিকানাধীন কিছু যানবাহন বিক্রি করে গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
কোম্পানিটির উদ্যোক্তা পরিবারের পরিচালকদের ভূমিকা নিয়েও অভিযোগপত্রে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বিশেষ করে কোম্পানিটির উদ্যোক্তাদের মধ্যে অন্যতম মুসা মিয়া ও মোশাররফ হোসেনের পরিবারের পরিচালকদের নিষ্ক্রিয় ভূমিকার কারণে কোম্পানিটির এ অবস্থা দাঁড়িয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
১২ বছরের আর্থিক হিসাব তদন্তের দাবি:
দুদক ও আইডিআরএর কাছে দেওয়া অভিযোগে যমুনা লাইফের গত ১২ বছরের আয়-ব্যয়, সম্পদ, দায়, ব্যাংক হিসাব, বিনিয়োগ, গ্রাহকের প্রিমিয়াম, বীমা দাবি ও দাবি পরিশোধের পূর্ণাঙ্গ হিসাব নিরীক্ষার আবেদন করা হয়েছে।
একই সঙ্গে চেয়ারম্যান, সিএফও, কোম্পানি সেক্রেটারি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর কোম্পানি ও ব্যক্তিগত নামে পরিচালিত ব্যাংক হিসাব, সম্পদ এবং আর্থিক লেনদেন তদন্তের আবেদন করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, কথিত ভুয়া পলিসি, গ্রুপ বীমা, কমিশন, শাখার নামে বকেয়া এবং কর-ভ্যাটসংক্রান্ত অনিয়ম পৃথকভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
প্রয়োজনে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট , এনবিআর, আইডিআরএ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার সহযোগিতায় বিশেষ আর্থিক তদন্ত বা নিরীক্ষার আবেদনও জানানো হয়েছে।
অর্থপাচারের অভিযোগও তদন্তের দাবি:
অভিযোগে তদন্তে অর্থ আত্মসাৎ, জালিয়াতি, দুর্নীতি, মানিলন্ডারিং বা অর্থপাচারের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেছেন।
একই সঙ্গে অনিয়মের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ ও সম্পদের সন্ধান, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে তা উদ্ধার বা জব্দ এবং আইনানুগ প্রক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ নথি, হিসাবপত্র, ব্যাংক রেকর্ড ও অন্যান্য আর্থিক দলিল সংরক্ষণ এবং প্রয়োজন হলে জব্দ করার আবেদনও করা হয়েছে।
Posted ০৪:৪৫ অপরাহ্ণ | সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | rina sristy
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com