অনলাইন ডেস্ক
সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬ প্রিন্ট ২৯ বার পঠিত
ভালো ফলন, অনুকূল আবহাওয়া আর বাজারে বাড়তি দাম—এই তিনের সমন্বয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাট চাষিদের মধ্যে ফিরতে শুরু করেছে স্বস্তি। কোথাও উৎপাদন ছাড়িয়েছে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা, কোথাও মানসম্মত আঁশের চাহিদায় চাঙা হয়েছে বাজার। গোপালগঞ্জ, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে পাটের দাম বাড়ায় কৃষকের মুখে ফুটেছে সন্তুষ্টির হাসি। উৎপাদন খরচ বাদ দিয়েও মিলছে উল্লেখযোগ্য মুনাফা। ফলে দীর্ঘদিনের মন্দাভাব কাটিয়ে পাট চাষে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। তবে এই ইতিবাচক পরিস্থিতি ধরে রাখতে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, সরকারি সহায়তা বাড়ানো এবং পাটজাত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণকে জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গোপালগঞ্জে চলতি মৌসুমে পাটের উৎপাদন যেমন বেড়েছে, তেমনি বাজারদরও রয়েছে কৃষকের অনুকূলে। জেলার বিভিন্ন হাটবাজারে জাত ও মানভেদে প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার ৭০০ থেকে ৫ হাজার ৩০০ টাকায়। গত বছরের তুলনায় মণপ্রতি দাম বেড়েছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা। পাটকল ও মজুতদারদের কেনাকাটা বাড়ায় বাজারেও বেড়েছে বেচাকেনার গতি। উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে প্রতি মণে কৃষকের নিট আয় হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের গোপালগঞ্জ খামারবাড়ির উপপরিচালক ড. মো. মামুনুর রহমান জানান, চলতি মৌসুমে জেলার পাঁচ উপজেলায় ২৪ হাজার ৮৫৯ হেক্টর জমিতে পাট আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে কৃষকরা আবাদ করেছেন ২৫ হাজার ৬৮৬ হেক্টর জমিতে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮২৭ হেক্টর বেশি জমিতে পাট চাষ হয়েছে। এ মৌসুমে মোট উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৫২ হাজার ৬৫৬ মেট্রিক টন, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ হাজার ৬৯৬ টন বেশি।
তাঁর দেওয়া তথ্যমতে, প্রতি মণ পাট উৎপাদনে কৃষকের ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৮০০ টাকা। বর্তমান বাজারদর অব্যাহত থাকলে আগামী মৌসুমে জেলায় পাটের আবাদ আরও বাড়তে পারে।
জেলার কাশিয়ানী উপজেলার ভাটিয়াপাড়া বাজার এখন পাট কেনাবেচার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। প্রতি শুক্রবার ও সোমবার বসে এ হাট। বাজারের পাট ও ভুসিমাল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি নিয়ামুল হক শরীফ জানান, বাজারটিতে প্রায় ১২০টি পাটের আড়ত এবং ছোট-বড় অন্তত ১০০টি গুদাম রয়েছে। প্রতি হাটে ১ হাজার থেকে ২ হাজার মণ পাট কেনাবেচা হয়। গোপালগঞ্জ ছাড়াও ফরিদপুর ও নড়াইলের কৃষকরা এখানে পাট বিক্রি করতে আসেন।
আড়তদার শামীম শেখ জানান, মৌসুমের শুরুতে পাটকলগুলো কেনাকাটা ও মূল্য পরিশোধ বন্ধ রাখায় বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। একই সময়ে মজুতদারদের আগ্রহ কমে যাওয়ায় তিন দফায় কমে যায় পাটের দাম। তখন প্রতি মণ পাট বিক্রি হয়েছে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৮০০ টাকায়। তবে বর্তমানে মিল ও মজুতদারদের কেনাকাটা বাড়ায় বাজারে আবারও গতি ফিরেছে। বেড়েছে পাটের সরবরাহ ও বেচাকেনা।
বাজারের এই পরিবর্তনে সন্তুষ্ট কৃষকরাও। কাশিয়ানীর বরাশুর গ্রামের কৃষক মফিজুর রহমান শেখ ১৮০ শতাংশ জমিতে পাট চাষ করে পেয়েছেন ৫২ মণ পাট। এতে তাঁর মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। তিনি জানান, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের কারণে পাট জাগ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বড় সমস্যা হয়নি। গত বছরের তুলনায় মণপ্রতি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা বেশি দাম পাওয়ায় তিনি লাভবান হয়েছেন। এ দাম অব্যাহত থাকলে আগামী বছর আরও বেশি জমিতে পাট চাষের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
পাটের ভালো ফলনের পেছনে অনুকূল আবহাওয়ারও ভূমিকা রয়েছে। গোপালগঞ্জ আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবু সুফিয়ান জানান, জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলায় মোট ১ হাজার ৩৫১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত পাটের আঁশ ছাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় জাগ দেওয়ার কাজে সহায়ক হয়েছে।
গোপালগঞ্জের পাশাপাশি নওগাঁতেও পাটের বাজারে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ভালো ফলন ও উন্নত মানের আঁশের কারণে জেলার বিভিন্ন বাজারে বেড়েছে পাটের চাহিদা। বর্তমানে প্রতি মণ শুকনা পাট বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকায়। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দাম বেড়েছে অন্তত ৬০০ টাকা।
জেলার বৃহত্তম পাটের হাট মান্দার সতীহাটে ভালো মানের পাটের সর্বোচ্চ দাম উঠছে প্রতি মণ ৪ হাজার ৫০০ টাকা। কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বিঘা জমিতে পাটের আবাদ, কাটা, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো ও শুকানো পর্যন্ত মোট খরচ হচ্ছে ১৬ হাজার থেকে ১৭ হাজার টাকা। বর্তমান বাজারদরে সব খরচ বাদ দিয়ে বিঘাপ্রতি নিট লাভ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৩০ হাজার থেকে ৩২ হাজার টাকা।
তবে বাজারে স্বস্তি ফিরলেও নওগাঁয় পাট চাষের জমি ক্রমেই কমছে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ মৌসুমে জেলায় ৫ হাজার ৭২৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছিল। ২০২৪-২৫ মৌসুমে তা কমে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৫৫০ হেক্টরে। চলতি ২০২৫-২৬ মৌসুমে আবাদ আরও কমে হয়েছে ৩ হাজার ১৭০ হেক্টর। এ পরিমাণ জমি থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৮ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজুর রহমান জানান, পাট চাষে উৎসাহ দিতে জেলার ৮০০ কৃষককে বিনামূল্যে বীজ, সার, পরিবহন খরচ ও আনুষঙ্গিক ব্যয়ের জন্য নগদ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, পাট ও পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো গেলে কৃষক পর্যায়ে চাহিদা ও দাম—দুটিই বাড়ার সুযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, চাঁপাইনবাবগঞ্জেও পাটের দামে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। চলতি মৌসুমে গত বছরের তুলনায় প্রতি মণে দাম বেড়েছে ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা। বর্তমানে জাত ও মানভেদে প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকায়। ভালো ফলন ও বাড়তি দামের প্রত্যাশায় শিবগঞ্জ ও সদর উপজেলার কৃষকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন পাট ঘরে তোলার কাজে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে প্রায় ৬ হাজার কৃষক ২ হাজার ৪০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ করেছেন। এ জমি থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন। কৃষকদের উৎসাহিত করতে ইতোমধ্যে ১ হাজারের বেশি কৃষককে বীজ ও সারসহ বিভিন্ন ধরনের কৃষি প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে দেশের কয়েকটি অঞ্চলে পাটের ভালো ফলন ও বাড়তি দাম কৃষি অর্থনীতিতে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। বিশেষ করে গোপালগঞ্জে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি উৎপাদন এবং নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাজারদরের ঊর্ধ্বগতি পাট চাষের সম্ভাবনাকে নতুন করে সামনে এনেছে। তবে নওগাঁয় ধারাবাহিকভাবে আবাদি জমি কমে যাওয়ার চিত্র মনে করিয়ে দিচ্ছে, শুধু মৌসুমি মূল্যবৃদ্ধি দিয়ে পাট চাষের দীর্ঘমেয়াদি সংকট দূর করা সম্ভব নয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বিবেচনায় ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, সময়মতো সরকারি প্রণোদনা ও উন্নত কৃষি পরামর্শ দেওয়া এবং পাটের বহুমুখী ব্যবহার বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব পাটজাত পণ্যের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে তৈরি হতে পারে স্থায়ী চাহিদা।
সোনালি আঁশের এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে কৃষকের লাভ নিশ্চিত করার পাশাপাশি পাটের বাজারকে করতে হবে আরও স্থিতিশীল ও সম্প্রসারিত। তাহলেই সাময়িক স্বস্তি পেরিয়ে পাট চাষ আবারও দেশের কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ফিরে পেতে পারে।
Posted ১১:০৪ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬
bankbimaarthonity.com | Animator Alif
পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।
ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫
ই-মেইল: bankbima1@gmail.com
✎ মন্তব্য করুন